বেতন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১৪, জুন ২০২৬
বাবা ফোন করেছিলেন বিকেলের দিকে। খুব বেশি কথা না। যেন আগে থেকে কিছু ভেবে রাখা নেই।
“একটু টাকা লাগবে,” তিনি বললেন। থামলেন। “হাসপাতালে যেতে হবে।”
ছেলেটা কিছুক্ষণ কিছু বলতে পারল না। ফোনটা কানে ধরে রেখেই বসে রইল।
বাবা জীবনে এই প্রথম তার কাছে কিছু চাইলেন। আর সেটাও টাকা।
“কত?” সে শেষে জিজ্ঞেস করল।
বাবা একটা অঙ্ক বললেন।
অঙ্কটা খুব বড় না। কিন্তু তার অ্যাকাউন্টের জন্য বড়ই ছিল।
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। শরীরটা ভারী লাগছিল, কিন্তু ঠিক কোথায় ভারী লাগছে বোঝা যাচ্ছিল না।
বাবা এমন মানুষ ছিলেন না যিনি চাইতেন। বরং উল্টো। সারাজীবন দিয়ে এসেছেন—কখনো সময়, কখনো শরীর, কখনো নিজেরই ক্লান্তি যেটার নাম কেউ আলাদা করে রাখে না।
ছেলেটার ছোটবেলার একটা কথা মনে পড়ে। বাবা ক্লান্ত হন না—এটাই তার ধারণা ছিল।
বাবা তখন ভোরে বের হতেন। রিকশা বা কোনো কাজ। সন্ধ্যায় ফিরতেন। হাতে অল্প কিছু টাকা। মুখে কম কথা।
অনেক সময় শুধু জিজ্ঞেস করতেন, “খাওয়া হয়েছে?”
এখন সেই প্রশ্নটার মানে সে বুঝে।
কিন্তু বোঝা আর কিছু করতে পারা এক জিনিস না।
ছেলেটা শহরে চাকরি করে। মাসের বেতন আসে, কিন্তু মাস শেষ হওয়ার আগেই হিসাব বদলে যায়। ভাড়া, কিস্তি, আর কিছু এমন খরচ—যেগুলো না দিলেও চলে না, আবার দিলেও কমে না।
বিকাশ খোলে। ব্যালেন্স দেখে। আবার লক করে দেয়।
ফোনটা টেবিলে রাখে। আবার হাতে নেয়।
পরদিন সে টাকা পাঠাতে পারে না।
বাবা আর ফোন করেন না।
এটাই বেশি লাগে।
কয়েকদিন পর সে গ্রামে যায়।
বাড়িটা আগের মতোই। কিন্তু তবু কিছু বদলে গেছে—এই অনুভূতিটা সে দরজার সামনে দাঁড়িয়েই টের পায়।
বারান্দায় বাবা বসে আছেন। একটু কুঁজো হয়ে। হাতে পুরোনো কাপ।
ছেলেটা কিছু বলতে যায়, কিন্তু থেমে যায়।
“টাকা দিতে পারিসনি?” বাবা জিজ্ঞেস করেন।
গলায় অভিযোগ নেই। শুধু একটা সোজা প্রশ্ন।
ছেলেটা মাথা নিচু করে। “পারিনি।”
বাবা একটু চুপ থাকেন। তারপর বলেন, “ঠিক আছে।”
এই “ঠিক আছে” খুব সাধারণ শোনায়। কিন্তু ছেলেটার কাছে সেটা অস্বাভাবিক ভারী লাগে।
সেদিন রাতে ঘুম আসে না।
মনে হয়, বাবা এখন আর দেওয়ার জায়গায় নেই।
সকালে উঠে সে কিছু টাকা জোগাড় করে—যতটা পারে। পুরোটা না, কিন্তু কিছুটা।
সে বাবার হাতে দেয়।
বাবা গুনে দেখেন না। হাতে নেন শুধু।
তারপর হঠাৎ বলেন, “তুই ঠিক আছিস তো?”
প্রশ্নটা টাকার না।
ছেলেটা উত্তর দেয় না।
কারণ “ঠিক থাকা” এখন আর সহজ কিছু না।
ফিরে আসার সময় বাসে বসে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
মনে হয়, বাবা সারাজীবন যে দিয়েছেন, তার কোনো হিসাব হয় না। আর এখন সে যা ফিরিয়ে দিচ্ছে, সেটাও আসলে শোধ না—শুধু দেরিতে আসা কিছু একটা।
বাসটা এগিয়ে যায়।
রাস্তাটা বদলায়।
কিন্তু প্রশ্নটা একই থাকে—
একজন সন্তানের পক্ষে কি সত্যিই তার বাবার “বেতন” মেটানো যায়?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।