চার লাখ টাকার শোক
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প।২৬ অক্টোবর ২০২৬
বাবা মারা যাওয়ার তিন দিন পর জানলাম, আমার মায়ের চার লাখ টাকা ঋণ।
কথাটা শোনার পর মায়ের দিকে তাকিয়েছিলাম। তিনি তখন বাবার পাঞ্জাবিগুলো ভাঁজ করছিলেন।
“কাকে কত টাকা দিতে হবে, মা?”
মায়ের হাত থেমে গেল। “এখন এসব কথা থাক। তোর বাবা মাত্র তিন দিন হলো...”
বাকিটা শেষ করলেন না।
বাবার মৃত্যুর পর বাড়িতে লোকজনের আসা-যাওয়া তখনো কমেনি। কেউ মায়ের মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিচ্ছে, কেউ বাবার ভালো মানুষ হওয়ার গল্প বলছে। বাবার ঘরে এখনো তাঁর চশমাটা টেবিলের ওপর পড়ে আছে। বিছানার পাশে স্যান্ডেলজোড়া পাশাপাশি রাখা।
সেদিন বিকেলে একজন লোক এলেন। বাবার কাছে টাকা পেতেন।
“এক লাখ বিশ হাজার টাকা। তোমার বাবা বলেছিলেন, সময় হলে দিয়ে দেবেন।”
আমি তাঁকে কাগজপত্র দেখে জানাব বলে বিদায় দিলাম।
লোকটা চলে যাওয়ার পর মাকে বললাম, “বাবা কখন টাকা নিয়েছিলেন?”
“তোর বাবার চিকিৎসার সময়।”
“আমাকে বলোনি কেন?”
মা কাপড় গোছাতে গোছাতে বললেন, “তুই নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত ছিলি। আর হাসপাতালে টাকা তো সঙ্গে সঙ্গে লাগে। কেউ কি অপেক্ষা করে?”
সেদিন রাতে বাবার আলমারিতে একটা ছোট খাতা পেলাম। পাতায় পাতায় নাম, তারিখ, টাকার অঙ্ক। কোথাও সুদের হিসাব, কোথাও কত টাকা শোধ হয়েছে তার বিবরণ। শেষ পাতায় মায়ের হাতের লেখায় মোট হিসাব—চার লাখের কিছু বেশি।
খাতাটা নিয়ে মায়ের সামনে রাখলাম।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তোর বাবার চিকিৎসা, ওষুধ, সংসারের খরচ—সব মিলিয়ে হয়েছে।”
বাবার শেষ কয়েক মাসের কথা মনে পড়ল। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটা, পরীক্ষা, ওষুধ, রাত জেগে অপেক্ষা। আমি টাকা পাঠালে মা বলতেন, “হয়ে গেছে, আর লাগবে না।”
আমি ভেবেছিলাম, সত্যিই আর লাগছে না।
পরদিন পাশের ঘরে দুই আত্মীয়ের কথা শুনলাম।
একজন বললেন, “ভাইয়ের চিকিৎসায় তো অনেক খরচ হয়েছে।”
অন্যজন উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, এখন ভাবির একটু বিশ্রাম দরকার।”
আমি জানতাম, তাঁরা ঋণের কথা জানেন না। জানলে হয়তো বলতেন, স্বামী মারা যাওয়ার তিন দিন পরেই টাকার হিসাব কেন! শোকের বাড়িতে এসব কথা মানায় না।
কিন্তু পাওনাদারদের কাছে শোকের দিন গুনে টাকা চাওয়ার নিয়ম নেই।
মা কাউকে কিছু বললেন না।
একদিন দুপুরে দেখলাম, নিজের আলমারি খুলে বিয়ের সময় পাওয়া সোনার চুড়ি বের করেছেন। হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন।
“চুড়িটা বিক্রি করবে?”
মা চমকে উঠলেন। “দেখি, কত পাওয়া যায়।”
“আমাকে বলোনি কেন?”
মা চুড়িটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে বললেন, “তোর বাবার লাশ ঘর থেকে বের হওয়ার পরদিনই কি বলতাম, আমার এত টাকা দেনা? মানুষ কী বলত?”
আমি মায়ের পাশে বসলাম।
তিনি চুড়ির গায়ে আঙুল বোলাতে বোলাতে বললেন, “তোর বাবা বলেছিল, সুস্থ হয়ে উঠলে সব শোধ করে দেবে। আমি ভেবেছিলাম, সময় আছে।”
বাইরে তখন ফেরিওয়ালা হাঁক দিচ্ছিল। দূরে মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছিল। মা চুড়িটা পুরোনো কাপড়ে মুড়ে আবার আলমারিতে রেখে দিলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় আরেকজন পাওনাদার এলেন। আমি তাঁকে বসতে বললাম।
মা পাশের ঘরে ছিলেন। লোকটা টাকা চাওয়ার সময় তিনি দরজার আড়াল থেকে একবার আমার দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে রান্নাঘরে চলে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে চায়ের কাপ রাখার শব্দ এল।
মা দুজনের জন্য চা বানাচ্ছিলেন।
এক কাপ আমার, আরেক কাপ বাবার পুরোনো কাপটা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।