শেষ প্রেসক্রিপশন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৭ জুন, ২০২৬
অভিক ফার্মেসি থেকে বের হলো। হাতে একটা ভাঁজ করা প্রেসক্রিপশন। ব্যস। ওষুধের প্যাকেট নেই।
কাউন্টারের লোকটা কাগজটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “মোট চার হাজার ছয়শো আশি টাকা।”
অভিক পকেট হাতড়ে টাকা বের করল। গুনল। আটশো চল্লিশ। আর কিছু বলল না সে। কাগজটা ভাঁজ করে রাস্তায় নামল।
রাস্তার ওপারে নিশি দাঁড়িয়ে ছিল। অভিককে দেখেই সে হয়তো আন্দাজ করেছিল, ব্যাগ খালি। জিজ্ঞেস করল না কিছুই। শুধু পাশে এসে হাঁটা ধরল।
অনেকটা পথ পেরিয়ে অভিক নিজে থেকেই বলল, “টাকা কম পড়ল।”
নিশি সংক্ষেপে উত্তর দিল, “চলো।”
বাড়ি ঢুকতেই বাবা কাশতে কাশতে উঠে বসলেন। বিছানার পাশের স্টিলের গ্লাসটা কাঁপছিল।
“ওষুধ আনলি?”
অভিক চোখ সরিয়ে নিল। “একটা ওষুধ ছিল না। বলল কাল দেবে।”
বাবা কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। দেয়ালে টাঙানো পুরনো ক্যালেন্ডারের তারিখটা মার্চ থেকে আর বদলায়নি। তারপর তিনি ধীরে আবার শুয়ে পড়লেন। চাদরটা বুক পর্যন্ত টেনে।
রাতে খেতে বসে নিশি নিজের থালায় ভাত নিল সামান্য। এক চামচ ডাল, এক টুকরো আলু।
অভিক তাকাল। “এত কম?”
“ক্ষুধা নেই।”
টেবিলের ওপরে মাছি উড়ছিল। অভিক আর কথা বাড়াল না।
পরদিন ভোরে সে আবার বের হলো। তিন মাস হলো চাকরিটা নেই। তারপর থেকে দিনগুলো প্রায় একই রকম কাটে। একটা অফিসের রিসেপশনে অপেক্ষা, একটা দোকানে ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা, কোথাও হয়তো ছোটখাটো ইন্টারভিউ। শেষে উত্তরটা ঘুরেফিরে একই—“এখন লোক লাগবে না।” কখনো কখনো মনে হয়, উত্তরটা তারা মুখস্থ বলছে।
সন্ধ্যায় ফিরে দরজায় টোকা দিতেই নিশি খুলে দিল। অভিকের শার্টের কলার ঘামে ভেজা, চোখ লাল। নিশির বুঝতে দেরি হলো না।
সে নিঃশব্দে আলমারি খুলল। ভেতর থেকে একটা লাল ভেলভেটের বাক্স বের করল। বিয়ের সময় পাওয়া সোনার দুলজোড়া। অভিক বাক্সটা খুলে দেখেই বন্ধ করে দিল।
“না।”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। জানালা দিয়ে তখন লোডশেডিংয়ের অন্ধকার। সে আস্তে বলল, “দুল পরে আমি কী করব?”
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর অভিকের জানা ছিল না।
পরদিন দুল বিক্রি হলো। নিউমার্কেটের একটা দোকানে, যেখানে সাইনবোর্ডে লেখা ‘পুরাতন সোনা ক্রয়’। ওষুধ কেনা হলো। চার পাতা ট্যাবলেট, একটা ইনহেলার, একটা সিরাপ।
বাবা প্যাকেটটা হাতে নিয়ে কেবল জিজ্ঞেস করলেন, “অনেক টাকা লাগল?”
অভিক হাসল। মিথ্যে হাসি হতে পারে। “না।”
বাবা আর ঘাঁটালেন না। ছেলের হাতটা একবার চেপে ধরলেন শুধু। তাঁর হাত ঠান্ডা, কাঁপছিল।
এরপর দুদিনে অবস্থা আরও খারাপ হলো। খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল প্রায়। কথা বলতেন কম। চোখ দুটো বেশিরভাগ সময় বোজা।
তৃতীয় দিনের ভোরে নিশি পানি খাওয়াতে গেল। গ্লাসটা বাবার ঠোঁটে ছোঁয়াল। তিনি আর চোখ খুললেন না।
ঘরটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। এমন নীরবতা যেখানে নিঃশ্বাসের শব্দও বেশি শোনায়। সব কাজ শেষ হতে হতে সন্ধ্যা।
আত্মীয়রা একে একে চলে গেল। কেউ কেউ বলে গেল, “ধৈর্য ধরো”। ঘরে তখন শুধু অভিক আর নিশি।
বিছানার পাশের ছোট টেবিলে প্রেসক্রিপশনটা পড়ে ছিল। কোণায় একটু ভাঁজ, ডাক্তারের সিলের কালিটা হালকা ছড়িয়ে গেছে। নিশি সেটা তুলে অভিকের হাতে দিল।
অভিক অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। এই কাগজটা নিয়েই সে প্রথম দিন ফার্মেসি থেকে ফিরেছিল—খালি হাতে। কাগজটা সে ধীরে ভাঁজ করল। তারপর বুকের কাছে চেপে ধরল।
নিশি পাশে এসে দাঁড়াল। কিছু বলল না। অভিকও না।
ঘরের ভেতর তখন শুধু দেয়ালঘড়ির শব্দ। টিক। টিক। টিক।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।