অদৃশ্য মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। মার্চ ২০, ২০২৬
শহরের ভিড়ে সে হাঁটে। প্রতিদিন।
দেখা যায়—তবু চোখে লাগে না।
ভোর ঠিকমতো ফোটেনি তখন। আলোটা কেমন মলিন। ফুটপাতের ধুলো নড়ে উঠছে, চায়ের কেটলিতে পানি ফুটছে, ধোঁয়া উঠে এসে মুখে লাগে। এই সবকিছুর মাঝখানেই রফিক দাঁড়িয়ে থাকে—কখন যে দাঁড়িয়েছে, সে নিজেও বুঝতে পারে না।
তার নাম এখানে কেউ জিজ্ঞেস করে না। দরকারও পড়ে না।
“এই, মিস্ত্রি!”—এই ডাকেই কাজ চলে।
কখনো শুধু হাত নাড়ে কেউ—এদিকে আয়।
রফিক এগিয়ে যায়।
কথা কম বলে।
মাথা নাড়ে—হ্যাঁ, না, যেটা দরকার।
ঘুম তার চোখে আছে কি নেই—ওটা নিয়ে ভাবার সময় নেই। বরং মনে হয়, ঘুম অনেক আগেই শরীর ছেড়ে গেছে। থেকে গেছে শুধু অভ্যাস।
সকাল মানেই দাঁড়িয়ে থাকা।
কাজ মিললে দিন। না মিললে… থাক।
আজ কাজ মেলে।
একটা পিকআপ থামে।
—“যাবি?”
—“কী কাজ?”
—“উপর উঠাইতে হবে।”
এর বেশি কিছু জানার দরকার হয় না।
সে উঠে পড়ে।
দুপুরের দিকে রোদটা ধারালো হয়ে যায়। ছাদের সিমেন্ট গরম হয়ে ওঠে। পায়ের তলায় লাগে।
রফিক বালতি তোলে। নামায়। আবার তোলে।
একসময় হাতের তালুতে টান ধরে।
পুরনো ফোস্কার ওপর নতুন চামড়া উঠেছে—সাদা, নরম। সেখানে চাপ পড়লে জ্বালা করে।
সে থামে না।
পাশের লোকটা বলে—
“এই কাজ করতে করতে মরে যাবি দেখিস।”
রফিক হালকা হেসে ফেলে।
“মরলে তো আর কাজ করতে হবে না।”
লোকটা একটু চুপ থাকে। তারপর বলে—
“এই দালানটা শেষ হইলে কোথায় যাবি?”
রফিক নিচে তাকায়। রাস্তা। মানুষ। গাড়ি। সব চলছে।
“আরেকটা ধরমু।”
কথা শেষ।
বিকেলের দিকে তাকে অন্য একটা বিল্ডিংয়ে পাঠানো হয়।
নতুন বিল্ডিং। চকচকে। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে রফিক। ভেতরে ঢুকবে—কাজ আছে।
গার্ড হাত তুলে থামায়।
“এই এই—কোথায়?”
—“উপরে কাজ আছে।”
গার্ড তাকায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত। একটু বেশি সময় নিয়ে।
তারপর বলে—
“এইভাবে ঢোকা যাবে না।”
রফিক দাঁড়িয়ে থাকে।
“এইভাবে”—মানে কী?
সে নিজের জামার দিকে তাকায়। ধুলো। ঘাম।
হাত তুলে দেখে—আঙুলে সিমেন্ট শুকিয়ে সাদা হয়ে আছে।
সে হাত দুটো প্যান্টে ঘষে। একবার। আবার।
যেন মুছে ফেললে সব ঠিক হয়ে যাবে।
মুছে যায় না।
সে কিছু বলতে চায়। মুখ খুলে—
কোনো শব্দ বের হয় না।
গার্ড তখন আর তাকাচ্ছে না। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
রফিক সরে যায়।
ফিরে আসার পথে শহরটা বদলে যায়।
লাইট জ্বলে। কাঁচের ভেতরে জামা ঝুলে থাকে—ঝকঝকে। কেউ কিনছে, কেউ দেখছে। কেউ শুধু দাঁড়িয়ে।
একটা ছেলে কাঁচে হাত দিয়ে বলে—
“এইটা লাগবে।”
রফিক দাঁড়ায়।
তার ছেলের কথা মনে পড়ে। সজিব।
শেষবার ফোনে বলছিল—
“আব্বা, আমারে একটা ব্যাগ কিনে দিবা?”
সেদিন সে চুপ ছিল।
পকেটে টাকা ছিল—কিন্তু হিসাব মিলছিল না।
সে নিজেই কলটা কেটে দিয়েছিল।
আজ সে নিজে ফোন দিতে চায়।
ফোনটা বের করে। স্ক্রিন জ্বলে ওঠে।
নামটা ভেসে থাকে কিছুক্ষণ।
সে তাকিয়ে থাকে।
তারপর স্ক্রিন বন্ধ করে ফেলে।
হাঁটা শুরু করে।
রাতে সে ফিরে আসে তার ঘরে।
টিনের চাল। গরম জমে থাকে ভেতরে।
মাটির ওপর চাটাই। চারজন মানুষ।
ভাত। ডাল।
কেউ একজন বলে—“লবণ আছে?”
আরেকজন হাত বাড়িয়ে দেয়।
খাওয়া শেষ।
পাশের লোকটা বলে—
“শোন… আজ গার্ডটা কী কইল?”
রফিক কিছু বলে না।
তবু বোঝা যায়।
কিছুক্ষণ পর সে বলে—
“কইল, এইভাবে ঢোকা যাবে না।”
লোকটা হেসে ফেলে।
“এইভাবে মানে?”
রফিক হাতের দিকে তাকায়।
নখের ভেতর সিমেন্ট ঢুকে আছে। পুরো পরিষ্কার হয় না।
“এইভাবেই।”
আর কথা বাড়ে না।
রাতে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুম আসে না।
গরম। মশা। শরীরের ভেতরে একটা অস্বস্তি।
সে উঠে বাইরে যায়।
আকাশে তারা আছে—কিন্তু স্পষ্ট না। শহরের আলোয় ঝাপসা লাগে।
সে তাকিয়ে থাকে।
সে দাঁড়িয়ে আছে, না ভেসে আছে—বুঝতে পারে না।
প্রশ্নটা শব্দ পায় না।
কিছুক্ষণ পর সে হালকা হাসে।
ভোর আবার আসে।
একই জায়গা। একই ফুটপাত।
চায়ের ধোঁয়া। লোকজন। ডাক।
“এই, মিস্ত্রি!”
রফিক একটু দেরি করে।
যেন ডাকে সাড়া দেওয়ার আগে—ডাকটা তার জন্য কি না, সেটা বুঝে নিতে হয়।
তারপর এগিয়ে যায়।
এই শহরে তার নাম লাগে না।
তার মুখও না।
তবু কাজ চলে।
সে হাঁটে।
দেখা যায়—তবু ধরা পড়ে না।
সে জানে না—কতজন মানুষ তাকে দেখে।
চিনতে পারে কি না—সেটা কেউ বলে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।