শেষ কথাটা আর বলা হলো না
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬
বিকেলের আলো জানালার কাঁচে আটকে ছিল। ঘরের ভেতর আধা অন্ধকার।
অভিক টেবিলে বসে পুরোনো খাতার পাতায় আঙুল বোলাচ্ছিল। খাতাটা নিশির। শেষ পাতায় তার হাতের লেখা—
“সব কথা না বললেও চলে, তাই না?”
তখন সে হেসেছিল।
আজ উত্তরটা গলায় কাঁটার মতো আটকে আছে।
নিশির চলে যাওয়াটা নাটকীয় ছিল না। কোনো ঝগড়া, কান্না বা প্রতিশ্রুতি ভাঙা নয়।
শুধু এক বিকেলে সে বলেছিল,
“মাকে নিয়ে বাইরে যেতে হবে। চিকিৎসা দীর্ঘ হবে।”
অভিক মাথা নেড়েছিল। তার তখন ভবিষ্যতের হিসাব—মাসিক আয়, বাড়ির ঋণ, বাবার ওষুধ, মায়ের ইনসুলিন। ভালোবাসা তার কাছে তখন বিলাসিতা।
সে বলেছিল, “যাও। তোমার থাকা উচিত ওখানে।”
নিশি তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। তার চোখে কোনো আবেগ ছিল না, বরং স্থির জেদ।
যেন সে অভিকের মুখোমুখি নয়, নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে।
সে শেষবারের মতো প্রশ্ন করেছিল,
“তুমি একবারও বলবে না—থাকো?”
অভিক চুপ করে ছিল। জানত, যদি বলে ‘থাকো’, তার কাঁধে চেপে পড়বে আরেকটি পরিবারের দায়িত্ব। সে দায় নেওয়ার মতো সাহসী ছিল না।
নিশি আর কিছু বলেনি। অভিকের নীরবতাকে অনুমতি না ভেবে, সে এটাকে অবহেলা বুঝেছিল।
প্রথমে নিয়মিত কথা হতো। তারপর কমতে কমতে একদিন বন্ধ।
শেষ বার্তাটা ছিল খুব ছোট—
“এখানেই কাজ পেয়েছি। ফিরতে দেরি হবে। ভালো থেকো।”
অভিক উত্তর লিখেছিল—
“থাকো।”
তারপর মুছে দিয়েছিল। শব্দটার ভেতর তখন আর কোনো আবেগ ছিল না, ছিল শুধু নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্তির চেষ্টা।
দিনগুলো ধীরে ধীরে চলে গেল। অভিক কলেজে, বাসায়, খাতা-পত্রের মাঝে আটকা পড়েছিল। কিন্তু নিশির অভাব তার চারপাশের সবকিছুকে ঢেকে রাখছিল—হাওয়ার নরম দোলা, টেবিলের শাঁস, এমনকি ঘরের আলোও।
প্রতিদিন দুপুরে অভিক জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাত, যেন কোনো ইঙ্গিত খুঁজে পাচ্ছিল। মানুষের পদচারণা, গাড়ির শব্দ, শিশুদের হাসি—সবই নিশির অনুপস্থিতি মনে করিয়ে দিত।
এক বিকেল, বাতাসে মাটির নরম গন্ধ। অভিক রাস্তার পাশের লম্বা গাছের ছায়া লক্ষ্য করল। বাতাসে লুপ্ত শব্দের মতো—কেউ বলছে না, কেউ ডাকছে না—কিন্তু মনে হচ্ছে, নিশি এখনও কিছুটা এখানে আছে। সে হাত বাড়াল, যেন নিঃশব্দ কাঁচের দেয়ালকে স্পর্শ করতে চাচ্ছে, কিন্তু খালি হাওয়ায় হাতটা পড়ে।
ছয় মাস পর এক সন্ধ্যায় কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে অভিক বুঝল—পৃথিবী থেমে থাকে না। বেঞ্চে নতুন নাম, নতুন মুখ।
তার ফোনে নিশির পুরোনো নম্বরটি সেভ ছিল। একদিন ইচ্ছে হলো ফোন করার। কিন্তু রিং হওয়ার আগেই লাইন কেটে দিল।
অভিক মনে করল, নিশি হয়তো ফোনটা ধরবে না। আর ধরলেও কী বলবে? যে মানুষটা সংকটের মুখে তাকে একলা পাঠিয়েছিল, সে কি এখন তার শূন্যতা পূরণ করতে এসেছে?
কয়েকদিন পর এক পরিচিত সিনিয়রের কাছ থেকে সে শুনল, নিশি ওই শহরেই আছে, একটি ছোট ফার্মে চাকরি করছে। সিনিয়র বলেছিলেন,
“ও খুব পরিবর্তন হয়ে গেছে। চুপচাপ, কাজে মনোযোগী। মায়ের সঙ্গে থাকে। তবে… মনে হয়, ও নিজেকে এখানকার জীবন থেকে আলাদা করতে চেয়েছিল।”
অভিকের বুক ভেঙে গেল। সত্যিই কি তাই? নাকি তার হিসাব-নিকাশ, বাস্তববাদী উদাসীনতা নিশিকে তাড়িয়ে দিয়েছে?
নিশি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দেয় না। প্রোফাইল পিকচারটি মাস ছয়েক আগের। সেখানে সে হাসছে, কিন্তু চোখের কোণে রেখা পড়েছে—ছায়ার মতো, অদৃশ্য কিন্তু ভারী। অভিক ছবিটা বড় করে দেখল না। ফোনটি উল্টে রেখে দিল।
সেদিন রাতে অভিক প্রথমবার বুঝল—ভালোবাসা হঠাৎ হারিয়ে যায় না। এটি ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, শ্বাসরুদ্ধ করে মরে যায়। কিছু মানুষের চলে যাওয়া হয়তো হারানো নয়; এটি নিজেকে ফিরে পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। নিশি হয়তো ঠিক তাই করেছে।
অভিকের মনে হলো—শুধু ভালোবাসার অভাব নয়, অভাবিত স্পর্শ, অভাবিত শব্দ, অভাবিত হেসে ওঠা—সবই তাকে ঘিরে রাখছে। রাতের নীরবতা, ঘরের ছায়া, বাতাসের কণ্ঠে যেন নিশির উপস্থিতি আছে, কিন্তু কখনো স্পর্শ করা যায় না।
পরদিন ক্লাসে সে বোর্ডে লিখল—
“যদি আমি বলতাম…”
শিক্ষার্থীরা তাকিয়ে রইল। অভিক চক ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে জানত, সেই এক শব্দই—‘থাকো’—হয়তো নিশিকে থামিয়ে দিতে পারত। কিন্তু থামলেও, তারা কি সত্যিই একে অপরকে ঠিক রাখতে পারত? না।
তারা দুজনেই জানত, একে অপরকে ঘিরে ধরে হতাশার বৃত্ত তৈরি হতো, যা ভাঙার ক্ষমতা তাদের নেই। তাই নিশি নিজেই পা বাড়িয়ে চলে গিয়েছিল।
অভিক চক নামিয়ে রাখল। কিন্তু বুকের ভেতরে যে জায়গায় নিশির উপস্থিতি লুকিয়ে ছিল, সেটি এখনও শূন্য।
ভালোবাসা হারানো হয় নীরবতায়, নিঃশব্দে। হঠাৎ না, বরং ধীরে ধীরে—শ্বাসরুদ্ধ করে, অবচেতনভাবে মরে যায়।
এটি কোনো বড় ট্র্যাজেডি নয়; এটি হয়তো শুধু একটি শব্দ না বলা, বা বলার সময় না পাওয়া।
সেই রাতের বাতাসে অভিক জানল—কিছু মানুষ চলে যায় এমনভাবে, যেন কখনও ছিলই না। কিন্তু তাদের স্মৃতি, তাদের অব্যক্ত ভালোবাসা, এবং তাদের ধীর নিঃশ্বাস—সবই বেঁচে থাকে।
অভিক জানত, এই নিঃশব্দ ইতিহাস তার সঙ্গে চিরকাল থাকবে। কখনও পূর্ণ হবে না, কখনও ধীরে ধীরে মুছে যাবে না।
বাইরের হালকা বাতাসে, আকাশে সূর্যাস্তের রঙ মিশে আছে। অভিক জানল, কিছু হারানো ভালোবাসা হয়তো তার নিঃশব্দ উপাদান হবে—চোখে অশ্রু নিয়ে, বুকের কোণে ভারী অনুভূতি রেখে। কিন্তু সেই অভাবিত ভালোলাগার স্থিরতা তাকে শেখায়—মানুষ চলে যায়, কিন্তু স্মৃতি, অনুভূতি এবং ধীর নিঃশ্বাস বেঁচে থাকে।
#প্রেম #দুর্দশা #মনস্তাত্ত্বিক #ট্র্যাজেডি #অভিকওনিশি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।