ক্ষমা নয়… শুধু বিদায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প ⋄ ২০ নভেম্বর ২০২৫
রাতটা অস্বাভাবিক নীরব। মফস্বলের রাস্তাগুলোয় শুধু বাতির ফিকে আলো আর দূরে দূরে ঘুমন্ত মানুষের নিঃশব্দ ছায়া। অভিক দ্রুত হাঁটছে—হাত কাঁপছে, বুক ভারী।
সকালেই ফোন এসেছিল। এক অচেনা কণ্ঠ—
“আপনার বাবা… শেষ অবস্থায়।”
অভিক হঠাৎ থেমে গেল।
শিশুর মতো মনে হচ্ছিল—একটা ছোট্ট ভুলে যেন সারা জীবনের শাস্তি পেয়ে গেছে।
বাবা… কবে থেকে এত দূরে চলে গেছেন তিনি?
অভিক ছোট ছিল।
মা তার পাশে ছিলেন না, থাকলেও চোখে চোখ রেখে বলতেন, “চেষ্টা কর বাবা, তোর বাবা আছে।”
তার বাবা—একজন গরিব মানুষ। ইটভাটায় কাজ করে, কোমর ভেঙেছে, কাঠের দোকানে বসে হাতের কাঁপুনি লুকিয়েছে। রাত জেগে স্কুলের ফি জোগাড় করেছে, নিজে না খেয়ে ছেলের স্বপ্ন কিনেছে।
শাশুড়ি মাঝে মাঝে বিঁধে বলতেন—
“ছেলের বউ তো শুধু খায়-দায়, শাড়ি বদলায়। ঘরের কাজে হাত লাগে না একটুও।”
অভিক তখন রাগে ফেটে পড়ত—
“মা’কে নিয়ে এসব কথা বলার আগে নিজের জায়গাটা মনে রাখবেন। এ বাড়িতে মা যা করেন, তা আপনার চোখে পড়ে না।”
কিন্তু মা শুধু মৃদু হেসে চুপ করে থাকতেন। যেন জানতেন—এই কটু কথাগুলো একদিন ছেলের কানেও পৌঁছাবে না, কারণ তিনি নিজেই সব আগলে রাখবেন।
বছর গড়াল। অভিক বড় হলো। বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ এল। মা কাগজগুলো হাতে নিয়ে চোখ মুছে বললেন,
“তুই পারবি বাবা। আমি পাশে আছি।”
বিদায়ের দিন বিমানবন্দরে মা কাঁপা গলায় বলেছিলেন,
“তুই মানুষের মতো মানুষ হবি, টাকা রোজগার হবে, না না—ভালো মানুষ হবি।”
অভিক তখন বুঝত না—মা কতটা নিঃশব্দ যুদ্ধ করেছেন তার জন্য।
বিদেশে জীবন ফুলে উঠল। সাফল্য, টাকা, সম্মান—সব এল। কিন্তু বাড়ি থেকে ফোন কমে গেল।
যদি কখনো মায়ের ফোন আসত, অভিক তাড়াহুড়ো করে কেটে দিত।
দিনের পর দিন অভিক ব্যস্ত। মা চেষ্টা করতেন ফোন করে—
“খেয়েছিস বাবা?”
“ক্লান্ত হয়ে পড়িস না।”
কিন্তু অভিক ধরত না। মা কখনো অভিযোগ করেননি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় দরজার সামনে চুপ করে বসে থাকতেন—যেন ছেলে হঠাৎ ফিরে আসবে।
সুখী ছেলে, দুঃখী মা-বাবা—এই দূরত্ব সময়ের সাথে আরও গভীর হতে লাগল।
পাঁচ বছর পর অভিক দেশে ফিরল। বাড়ি নতুন লাগছিল, কিন্তু ভেতরটা নিঃশব্দ শূন্য।
বাবা কোথায়?
মা কিছু বললেন না। শুধু চোখে সেই চেনা শূন্যতা।
এক কোণে বাবা—শীর্ণ, শুকিয়ে যাওয়া, তবু ঠোঁটে নীরব হাসি।
অভিক কাঁপা গলায় বলল,
“বাবা… আমি দেরি করে ফেলেছি। ক্ষমা করে দাও।”
বাবা ধীরে বললেন—
“ক্ষমা? আমি কারো ওপর রাগ করিনি বাবা।”
শুধু নিঃশব্দ ত্যাগ। এই নীরবতার মধ্যেই পুরো ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
“যেদিন তুই নতুন নম্বর করলি, আমি আর তোর মা ফোন করতাম। রিং বাজত, তুই ধরতিস না।
আমরা ক্লান্তি উপেক্ষা করে কল্পনা করতাম—তোর মুখের হাসি, তোর সাফল্য।”
অভিক কেঁদে ফেলল।
“বাবা, তোমরা বললে কেন না? একবার বললেই—”
মা তখন প্রথম কথা বললেন। গলা ভারী, চোখে অন্ধকার—
“একবার বললে কি তুই ফিরে আসতিস?
নাকি শুধু দোষবোধ নিয়ে আরও দূরে চলে যেতিস?”
এই প্রশ্নটা গলা চেপে ধরল, হৃদয় ছিঁড়ে ফেলল।
সাফল্য, টাকা, সম্মান—সব যেন ধুলো হয়ে গেল।
ভোর হওয়ার আগে বাবা চলে গেলেন। কোনো চিৎকার নয়, কোনো অভিযোগ নয়।
শুধু একটা কাগজ রেখে গেলেন—
“তুই সুখে থাক। আমি থাকলে তোর কষ্ট হত।”
অভিক সেই কাগজ বুকে চেপে ধরল।
মা পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিলেন।
বুঝল—শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা কখনো ক্ষমা চায় না, শুধু বিদায় দেয়।
সম্পর্কের মূল্য টাকার চেয়ে বড়। কিন্তু যখন সম্পর্ক নিঃশব্দে ভেঙে যায়—তখন সবচেয়ে বড় সম্পদও অসহায় হয়ে পড়ে।
পাঠকের জন্য প্রশ্ন
আপনি কি মনে করেন—
সন্তানের সাফল্যের জন্য বাবা-মা নিজেদের অদৃশ্য করে ফেলা ঠিক?
নাকি সত্যিটা বলে, একটু কষ্ট দিয়েও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা উচিত?
আপনার মতামত কমেন্টে জানান।
#বাবার_ত্যাগ #মায়ের_নীরবতা #নীরব_ভালোবাসা #MoneyVsMorality #শেষ_বিদায় #পরিবারের_মূল্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।