যেখানে ভাঙা মানুষও দাঁড়িয়ে থাকে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ১৪,২০২৬
(বাস্তব কাহিনির অবলম্বনে)
রাত তখন ঠিক কতটা—অভিক জানে না। ঘড়িটা দেয়ালে টিকটিক করছে, কিন্তু সে সময় ধরতে পারছে না। একটু আগে পর্যন্ত গুনছিলো—এক, দুই, তিন… তারপর ছেড়ে দিলো। গুনে কী হবে?
ঘরের ভেতর হালকা গরম। ফ্যানটা ঘুরছে, তবু বাতাস যেন পৌঁছায় না। পাশে মেয়ের পড়ার টেবিল। বইগুলো গুছানো। উপরে একটা খাতা খোলা—পাতার কোণ ভাঁজ করা। অভিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর চোখ সরিয়ে নেয়।
সবকিছু এমন ছিল না।
একসময় তার দিনগুলো ছিল খুব সোজা। সকালে বের হওয়া, সন্ধ্যায় ফেরা। ক্লান্তি থাকতো, কিন্তু দরজা খুললেই যে হাসিটা পেত—সেটা সব মুছে দিত। তার মেয়ে। ছোট্ট, চঞ্চল, সারাক্ষণ কথা বলে।
জন্মের দিনটা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলো সে। ভেতর থেকে কান্নার শব্দ এলো। প্রথমে বুক কেঁপে উঠেছিলো—তারপর নার্স এসে বললো, “মেয়ে হয়েছে।” অদ্ভুতভাবে তখন তার নিজের চোখেই পানি চলে এসেছিলো। মেয়েটা কাঁদছিলো, আর সে হাসছিলো।
সেই কান্নাটা ছিল শুরুর।
তারপর সময় গড়িয়েছে। মেয়েটা হাঁটতে শিখেছে, স্কুলে গেছে। প্রথম দিন ইউনিফর্ম পরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলো,
“আব্বা, আমি বড় হয়ে গেছি, না?”
অভিক হেসে বলেছিলো, “হ, অনেক বড়।”
সেদিন বিকেলে সে একটু তাড়াতাড়ি ফিরেছিলো—শুধু শুনবে বলে, মেয়ের প্রথম দিনের গল্প।
সব চলছিলো নিজের মতো।
তারপর সেই দিনটা।
সকালটা সাধারণই ছিল। মেয়ে তখন কলেজে পড়ে। টিউশনি থেকে ফিরে বললো,
“আব্বা, চা দিবা? খুব ক্লান্ত লাগতেছে।”
অভিক রান্নাঘরে গেলো। কেটলিতে পানি বসালো। ঠিক তখনই বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। প্রথমে পাত্তা দেয়নি। ভেবেছিলো গ্যাস। কিন্তু ব্যথাটা থামলো না। ছড়িয়ে পড়লো। হাত কাঁপতে লাগলো। কেটলির ঢাকনা পড়ে গিয়ে শব্দ হলো।
মেয়ে দৌড়ে এলো—“আব্বা?”
তারপর সব এলোমেলো। পাশের বাসার লোক, রিকশা, হাসপাতাল। সাদা আলো, ফিনাইলের গন্ধ, দূরে কারো কান্না। কেউ বলছে, “প্রেশার নামতেছে।” আরেকজন—“অ্যাটাক।”
সেই রাতে মেয়েটাকে সে দ্বিতীয়বার কাঁদতে দেখেছিলো। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। কোনো শব্দ নেই, শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। অভিক হাত তুলতে চেয়েছিলো—পারেনি।
সেখান থেকেই সব বদলে গেলো।
শরীর আর আগের মতো রইলো না। ডাক্তার বললো সাবধানে থাকতে। কিন্তু সাবধানে থাকলে কি সংসার চলে?
চাকরিটা বেশিদিন টিকলো না। একদিন ডেকে নিয়ে সোজা বললো,
“ভাই, আপনাকে আর রাখা যাইতেছে না।”
কথাটা ছোট ছিল, কিন্তু ভেতরে যা ভাঙার, সেখানেই ভাঙলো।
তারপর শুরু হলো দৌড়। এক অফিস থেকে আরেক অফিস। পরিচিতদের ফোন। “কিছু থাকলে জানাইও”—এই কথাটা বারবার শুনেছে। তারপর আর কিছু হয়নি।
একসময় তার নিজের কথাবার্তার ভঙ্গিও বদলে গেলো।
“চাকরি গেসে গা… একটু টানাটানিতে আছি… কোনো ব্যবস্থা করা যায় নাকি?”
সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। কেউ কেউ সাহায্য করেছে। কিন্তু তাতে কি পুরোটা সামলায়?
এদিকে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেছে। খরচ বাড়ছে। বই, ফি, যাতায়াত—সব মিলিয়ে একটা চাপা হিসাব। সেই হিসাবটা ধীরে ধীরে তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
দিনে সে হাসে। কারো সাথে দেখা হলে বলে, “ভালো আছি।”
রাতে উঠে বসে। শ্বাস নেয়। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এইভাবেই কেটে যাচ্ছিলো দিন।
তারপর এলো সেই সময়—সেমিস্টারের ফি। শেষ তারিখ সামনে। মেয়ে কিছু বলছিলো না, কিন্তু চুপচাপ খাতায় হিসাব করছিলো।
এক রাতে অভিক খাতাটা খুলে দেখলো। কত লাগবে, কোথা থেকে আসতে পারে—সব লেখা। শেষে ছোট করে একটা লাইন—“না পারলে থাক।”
সকালে সে মেয়েকে ডাকলো।
দু’জনেই বসে। মাঝখানে টেবিল। একটা কলম পড়ে আছে—কেউ ধরছে না।
অভিক প্রথমে কিছু বলতে পারছিলো না। গলা শুকিয়ে যাচ্ছিলো। শেষে খুব আস্তে বললো,
“তোর পড়াশোনা… কিছুদিন বন্ধ রাখতে হবে।”
ঘরটা চুপ হয়ে গেলো।
মেয়েটা তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে বললো,
“ঠিক আছে, আব্বা। আমি টিউশনি ধরমু।”
কিছুক্ষণ পর তার চোখ ভিজে উঠলো। মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
অভিক জানে—সে তিনবার মেয়েকে কাঁদতে দেখেছে।
প্রথমবার—সে হাসছিলো।
দ্বিতীয়বার—সে বাঁচতে চাইছিলো।
তৃতীয়বার—সে কিছুই করতে পারছিলো না।
সেই দিন থেকে তার ভেতরে কিছু একটা স্থায়ীভাবে ভেঙে গেছে।
রাতে সে এখন আর ঘুমায় না। উঠে বসে। কখনো মেয়ের টেবিলের কাছে যায়। বই ছোঁয়, কিন্তু খুলে না।
একদিন ভাঁজ করা পাতাটা খুলেছিলো। কোণায় লেখা—“আব্বা পারবে।”
অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলো। তারপর আবার আগের মতো ভাঁজ করে রেখে দিয়েছে।
কারণ সে জানে—এই কথাটার ভার তার বুকের ব্যথার চেয়েও বেশি।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, অভিক এখনও বেঁচে আছে,সে দাঁড়িয়ে আছে।
কেমন করে—সেটা সে নিজেও জানে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।