বালিশ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আমার আট বছরের ছেলে আরাফ কখন কাঁদতে হয়, সেটা শব্দ না করে শিখে গেছে।
ব্যাপারটা টের পেলাম এক মঙ্গলবার রাতে।
আমি আর ওর মা তখন রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। কথা বলছিলাম বললে ভুল হবে, গলা চড়ছিল। মাসের বাজার, ইলেকট্রিক বিল, আমার ফিরতে দেরি হওয়া - এসব নিয়ে রোজকার মতোই। ও বলল, আমি কোনোদিন সময় দিই না। আমি বললাম, ও সবকিছুতে খুঁত ধরে।
আমাদের গলা যখন বেশ চড়ে গেছে, তখন খেয়াল করলাম পাশের ঘরের দরজাটা আধভেজানো। ভেতরে আলো জ্বলছে। আরাফের ঘুমানোর কথা।
ওর মা বলল, "আস্তে বলো, ছেলেটা জেগে যাবে।"
আমি আরো জোরে বললাম, "জাগলে জাগবে। ওকে সবকিছুর মধ্যে টানছ কেন? তুমি বলেছিলে, ও নাকি আমার মতো হবে।"
কথাটা বলে নিজেরই খারাপ লাগল। কিন্তু তখন থামতে পারিনি।
রাত সাড়ে এগারোটার দিকে সব চুপচাপ হয়ে গেল। ওর মা অন্য ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি বারান্দায় একটা সিগারেট ধরিয়ে নিভিয়ে ফেললাম। তারপর পানি খেতে আরাফের ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি, ও উপুড় হয়ে শুয়ে আছে।
ঘুমায়নি।
বালিশে মুখ গুঁজে আছে। পিঠটা অল্প অল্প কাঁপছে।
আমি কাছে গিয়ে মাথায় হাত রাখলাম।
"বাবা?"
ও চমকে মুখ তুলল। চোখ ভেজা, নাক লাল। তাড়াতাড়ি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখ মুছল।
"কিছু হয়নি।"
"তাহলে কাঁপছিস কেন?"
ও বালিশটা বুকের মধ্যে আরো শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর ফিসফিস করে বলল, "আস্তে কাঁদছিলাম। জোরে কাঁদলে তোমরা শুনে ফেলবে তো।"
আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। আট বছরের একটা বাচ্চা কবে থেকে শিখল কান্নার আওয়াজও লুকাতে হয়?
আমি ওকে টেনে তুলতে গেলাম। ও নিজেই উঠে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। ওর গালটা ভেজা, গরম।
"তুমি কেঁদো না, বাবা।"
আমি হাসার চেষ্টা করলাম। "আমি কাঁদছি না তো।"
"তোমার চোখ লাল।"
ওর ছোট্ট আঙুল দিয়ে আমার চোখের কোণটা ছুঁল। আমি আর তাকিয়ে থাকতে পারলাম না।
পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে ওর মা বলল, "জানো, ও অনেকদিন ধরেই এমন করে।"
আমি চমকে তাকালাম। "মানে?"
"ঝগড়া শুরু হলেই ও ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, বালিশে মুখ গুঁজে থাকিস কেন? বলে, কান্নার শব্দ পেলে তোমরা আরও রাগ করবে।"
ওর মা কথাটা বলে ডিম ভাজতে চলে গেল। যেন খুব সাধারণ একটা কথা।
আমার সামনে তখন আরাফের স্কুলের ব্যাগ। পানির বোতলটা খালি। খাতা খোলা। খাতার মধ্যে পেনসিল দিয়ে আঁকা একটা বাড়ি। বাড়িটার তিনটে জানালা, একটা দরজা। সামনে তিনজন মানুষ হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। একজন বড়, একজন একটু ছোট, মাঝখানে আরো ছোট। মাঝখানের জনের মাথায় ও লিখেছে - আমি।
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কাগজের ওই তিনজন মানুষ কী সুন্দর একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
দুপুরে ওকে স্কুল থেকে আনতে গেলাম। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখে দৌড়ে এল না, আস্তে হাঁটল। হাত ধরল।
রিকশায় উঠে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর হঠাৎ বলল, "বাবা, আজ রাতে ঝগড়া করবে?"
আমি বললাম, "না।"
ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বিশ্বাস করল কি না বুঝতে পারলাম না। আট বছরের বাচ্চাও এখন মানুষের মুখ দেখে মিথ্যা ধরতে পারে।
বাসায় ফিরে দরজার বাইরে জুতা খুলতে খুলতে শুনলাম, ওর মা রান্নাঘরে বাসন নামাচ্ছে। শব্দ হচ্ছে। আমি ভেতরে গিয়ে বললাম, "শোনো, আজ থেকে ওর সামনে না। যা বলার পরে বলব।"
ওর মা আমার দিকে তাকাল। চোখের নিচে কালি। অনেক রাত না ঘুমালে যেমন হয়।
বলল, "শুধু আজ?"
আমি কিছু বলতে পারলাম না। "শুধু আজ" কথাটার উত্তর আমার কাছে ছিল না।
রাতে আমরা তিনজন একসঙ্গে খেতে বসলাম। ভাত, ডাল, ডিম ভাজি। কেউ বেশি কথা বললাম না। টিভি বন্ধ। শুধু চামচের শব্দ।
খাওয়ার মাঝখানে আরাফ হঠাৎ বলল, "জানো মা, আজ আমাদের ক্লাসে একটা ছেলে পড়া পারেনি। স্যার বকেছে।"
ওর মা বলল, "তাই?"
"হ্যাঁ। ও কাঁদছিল। কিন্তু শব্দ করেনি।"
আমি আর ওর মা একে অপরের দিকে তাকালাম।
আরাফ আবার ভাত নাড়তে নাড়তে বলল, "আমার মতো।"
কেউ কিছু বললাম না।
রাত সাড়ে দশটায় ও ঘুমাতে গেল। আমি দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, আজ ও উপুড় হয়ে শোয়নি। চিত হয়ে শুয়েছে। বালিশটা মাথার নিচে, মুখটা বাইরে। একটা হাত বুকের ওপর।
আমি আস্তে করে দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম।
করিডরে এসে লাইটটা নিভিয়ে দিলাম। অন্ধকারে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভেতর থেকে ওর মায়ের গলা ভেসে এল, "আরাফ ঘুমালো?"
আমি উত্তর দিলাম না।
চোখটা ভিজে উঠেছিল। মুখের সামনে কোনো বালিশ ছিল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।