১৭ আশ্বিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ১৫ জুন, ২০২৬
চিঠিটা কেউ খুঁজছিল না।
অভিকও কারও পড়ার জন্য লিখেনি।
পুরোনো একটা খাতার ভেতরে ভাঁজ করে রাখা ছিল। খাতাটা বিছানার নিচে পড়ে ছিল কতদিন কে জানে। ধুলো জমে মলাটের রংও বোঝা যাচ্ছিল না।
ঘর গুছাতে গিয়ে অভিকের মা খাতাটা পেলেন।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে মাঝখান থেকে একটা কাগজ বেরিয়ে এল।
উপরে লেখা— ১৭ আশ্বিন
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন ডায়েরির পাতা হবে।
অভিক আগে লিখত। স্কুলে পড়ার সময় একটা গল্প স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল।
কিন্তু কয়েক লাইন পড়েই বুঝলেন, এটা গল্প না। এটা এমন কিছু কথা, যা সে কাউকে বলতে পারেনি।
কাগজে লেখা—
"আজ ডাক্তার বলল রাতে যে দুইটা সাদা বড়ি খাই, ওগুলো বন্ধ করা যাবে না। আমি হেসেছিলাম। উনি বুঝতে পারেননি কেন।"
"আমি কখনো কখনো এমন কিছু শুনি, যা আসলে থাকে না। এটা আমি জানি। কিন্তু ওই সময় মনে হয় থাকে। তখন কাকে বোঝাব?"
"সবাই ভাবে আমি ইচ্ছা করে করি। কেউ কি ইচ্ছা করে নিজের মাথাকে বিশ্বাস করতে পারে না?"
মা থেমে গেলেন। চোখ আটকে রইল একটা লাইনে। আবার পড়লেন ধীরে ধীরে।
"সেদিন বাজারে গিয়েছিলাম। দুইটা ছেলে হাসছিল। মনে হলো আমাকে দেখে। হয়তো না। কিন্তু আমি আর দাঁড়াইনি। বাসায় চলে এসেছিলাম।"
"এখন প্রায়ই এমন হয়। কেউ তাকালেই মনে হয় কিছু একটা আছে। কিছু একটা সমস্যা। আমার সঙ্গে।"
"হয়তো সত্যি না। কিন্তু ওই মুহূর্তে সত্যি মনে হয়।"
এক জায়গায় কালি ছড়িয়ে গেছে। একটা লাইন কেটে আবার লেখা হয়েছে।
"আমি ক্লান্ত।"
কাটা। নিচে আবার লেখা—"না, ক্লান্ত না। আসলে ভয় পাই।"
"তিন বছর আগে যেদিন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলে, আমি রাগ করেছিলাম। এখন বুঝি তুমি ভয় পেয়েছিলে।"
"মা মাঝে মাঝে ভাবে আমি বুঝি না। আমি সব বুঝি।"
"রাতে তুমি কাঁদো। দরজা বন্ধ করে। আমি শুনি।"
"বাবা আত্মীয়দের সামনে আমার কথা এড়িয়ে যায়। এটাও দেখি।"
"তোমাদের জন্য খারাপ লাগে।"
"তবু আমি বাঁচতে চাই।"
"চাকরি করতে চাই। নিজের টাকা দিয়ে তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দিতে চাই।"
"বন্ধুদের সঙ্গে বসে চা খেতে চাই।"
"ওরা আগে ওই রোগটাই দেখে। আমি যে আছি, সেটা পরে।"
মায়ের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
হঠাৎ মনে পড়ল, কয়েক মাস আগে অভিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিল—
"মা, আমি যদি পুরোপুরি ভালো না হই, তখনও কি তুমি আমার ওপর বিরক্ত হবে?"
তিনি কী উত্তর দিয়েছিলেন—মনে পড়ল না।
"আমি জানি না আমি কোনোদিন পুরোপুরি ভালো হব কি না।"
"ডাক্তার? সেও জানে না।"
"আমিও জানি না।"
"শুধু চেষ্টা করি। প্রতিদিন।"
"সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন মানুষ ভয় পায়। আমি কিছু বলার আগেই ভয় পায়।"
"আমি খারাপ মানুষ না। অসুস্থ মানুষ। এই দুইটা এক জিনিস না।"
"কষ্ট হয়।"
"তুমি বুঝবে না।"
নিচে আবার লেখা—
"আবার হয়তো বুঝবেও। যদি একটু সময় নিয়ে শোনো।"
নিচে আর কিছু নেই।
শুধু নাম।
অভিক
চিঠি শেষ।
মা কাগজটা নামিয়ে রাখলেন।
সঙ্গে সঙ্গে উঠলেন না।
অনেকক্ষণ বসে রইলেন।
রাগ হয়েছিল নিজের ওপর। লজ্জাও।
কতবার তিনি শুধু জিজ্ঞেস করেছেন ওষুধ খেয়েছিস কি না।
কেমন আছিস—সেটা না।
পাশের ঘরে গিয়ে দেখলেন অভিক ঘুমাচ্ছে।
মুখে দাড়ি উঠেছে।
ঘুমের মধ্যে ওকে অসুস্থ লাগে না।
শুধু খুব ক্লান্ত লাগে।
মা বিছানার পাশে বসে রইলেন কিছুক্ষণ।
তারপর আস্তে করে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
অভিক একটু নড়ল। চোখ খুলল না।
মা কিছু বললেন না।
শুধু খাতাটা বুকের কাছে চেপে ধরলেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।