ভোরের আগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৪ আগস্ট ২০২৬
রাত দুটো পেরিয়ে গেছে।
নিশি বিছানার এক পাশে শুয়ে আছে। পাশের বালিশটা খালি। হাত বাড়ালেই অভিকের জায়গাটা ছোঁয়া যায়, কিন্তু সেখানে এখন শুধু ঠান্ডা চাদর। জানালাটা আধখোলা। বাইরে মাঝেমধ্যে কুকুর ডাকছে। দূরের কোনো বাড়িতে জেনারেটর চলছে, তার একটানা গুনগুন শব্দ ঘরের নীরবতার সঙ্গে মিশে আছে।
মোবাইলটা বালিশের পাশে পড়ে আছে। নিশি আবার স্ক্রিন জ্বালাল। কোনো নতুন বার্তা নেই।
শেষ কথা হয়েছিল রাত দশটা তেরো মিনিটে। অভিক লিখেছিল, “পৌঁছালে জানাব।”
তারপর আর কিছু নেই।
বিকেলে হঠাৎ একটা ফোন এসেছিল অভিকের কাছে। কথা বলার সময় সে বারান্দায় চলে গিয়েছিল। ফিরে এসে নিশির দিকে না তাকিয়েই বলেছিল, “একটু যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“বেশি দূরে না।”
“কখন ফিরবে?”
“রাতের মধ্যেই।”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, “তুমি না ফেরা পর্যন্ত ঘুমাব না।”
অভিক জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতে হেসেছিল। “আমার জন্য এত রাত জেগে থেকো না।”
নিশি তখন আর কিছু বলেনি। দরজাটা বন্ধ হওয়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ সে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে অভিকের জন্য রাখা রাতের খাবারটা ঢেকে রেখেছিল।
এখন সেই খাবারও ঠান্ডা হয়ে গেছে।
নিশি চাদরটা টেনে ঠিক করল। কুঁচকে থাকা জায়গাটা হাত দিয়ে মসৃণ করল। একটু পর আবার সেখানে ভাঁজ পড়ে গেল।
মোবাইলটা হাতে নিল সে। অভিকের নম্বর খুলল। কল করবে কি না, বুঝতে পারল না। রাত অনেক হয়েছে। হয়তো কোনো কাজে আছে। হয়তো ফোন ধরার মতো অবস্থায় নেই। তবু বুকের ভেতর একটা অস্থিরতা তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না।
নিশি ফোনটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করল।
সঙ্গে সঙ্গে অভিকের মুখটা মনে পড়ল। সকালের ঘুমজড়ানো মুখ। চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মুখ। দাড়ি কাটতে ভুলে যাওয়া মুখ। হাসলে ডান গালে যে ছোট্ট ভাঁজটা পড়ে। রাগ করলে একেবারে চুপ হয়ে যাওয়ার অভ্যাস। আর ঘুমানোর আগে প্রায় প্রতিদিনের সেই কথাটা—
“লাইটটা নিভিয়ে দাও তো।”
নিশির বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
একজন মানুষ পাশে থাকলে তার কত ছোট ছোট অভ্যাস যে চোখে পড়ে না। দরজা বন্ধ করার আগে দুবার টেনে দেখা, চায়ের কাপটা টেবিলের একেবারে কিনারায় রেখে দেওয়া, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে পাশে কাউকে খোঁজা—এসব তখন খুব সাধারণ ব্যাপার। কখনো কখনো বিরক্তিও লাগে। মানুষটা একটু দূরে গেলেই সেই সাধারণ জিনিসগুলোর কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
রাত তিনটা বাজল।
নিশি উঠে রান্নাঘরে গেল। এক গ্লাস পানি খেল। তারপর কোনো কাজ না থাকলেও চুলার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। অভিক থাকলে এতক্ষণে বলত, “এই রাতে রান্নাঘরে কী করছ?”
নিশি অকারণে হেসে ফেলল। তারপর হাসিটা মিলিয়ে গেল।
ঘরে ফিরে এসে মোবাইলটা হাতে নিল। এবার কল করল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
ফোন বাজল। কেউ ধরল না।
চতুর্থবার কল করতে গিয়ে নিশির হাত থেমে গেল।
অভিক একদিন বলেছিল, “এতবার ফোন করলে মানুষ বিরক্ত হয়।”
নিশি বলেছিল, “তুমি ধরো না বলেই তো করি।”
অভিক হেসে বলেছিল, “একদিন এমন হবে, ফোন করার আগেই তোমার ফোন ধরে ফেলব।”
“কীভাবে?”
“তোমার কথা ভাবব।”
সেদিন কথাটা শুনে নিশি হেসেছিল। আজ সেই কথাটাই মনে পড়ে চোখ জ্বালা করছে।
ভোর চারটার দিকে বাতাস একটু বাড়ল। জানালার পর্দা নড়তে লাগল। দূরে কোথাও মোরগ ডেকেছে। তারপর আবার সব চুপ।
নিশি বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। একটা রিকশা ধীরে ধীরে চলে গেল। পেছনের ছোট্ট লাল বাতিটা কিছুক্ষণ দেখা গেল, তারপর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
নিশি রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল।
অভিক কোথায়? কেন ফোন ধরছে না? কিছু হয়েছে?
প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরছিল। কোনো উত্তর নেই।
হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল।
নিশি প্রায় ছুটে ঘরে ঢুকল।
স্ক্রিনে অভিকের নাম।
“হ্যালো?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা নেই।
“হ্যালো? অভিক?”
তারপর সেই পরিচিত, একটু ক্লান্ত গলা—
“ঘুমাওনি?”
নিশি চোখ বন্ধ করল। “তুমি কোথায়?”
“হাসপাতালে।”
নিশির বুকটা ধক করে উঠল। “হাসপাতালে কেন?”
“একজনকে নিয়ে এসেছিলাম। একটু সমস্যা হয়েছিল।”
“তুমি ঠিক আছ?”
“হ্যাঁ।”
“সত্যি?”
“সত্যি।”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “একটা ফোন করতে পারতে।”
“জানি।”
নিশি ঠোঁট কামড়ে চোখের পানি সামলানোর চেষ্টা করল।
“আমি কতবার ফোন করেছি জানো?”
“দেখেছি।”
“তাহলে ধরোনি কেন?”
ওপাশে একটু নীরবতা।
তারপর অভিক খুব আস্তে বলল, “ভাবছিলাম, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ।”
নিশির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। এতক্ষণ ধরে জমে থাকা কথাগুলো হঠাৎ গলায় এসে আটকে গেল।
“তুমি...”
বাকিটা আর বলতে পারল না।
ওপাশে অভিক চুপ করে রইল।
নিশি চোখ মুছে বলল, “আর কখনো এমন করবে না।”
“ঠিক আছে।”
“কথা দাও।”
অভিক একটু থেমে বলল, “কথা দিলাম।”
নিশি এবার খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “কখন আসবে?”
“আর একটু পর।”
“আমি দরজা খোলা রাখব।”
“দরজা বন্ধ করে ঘুমাও।”
“ঘুমাব না।”
ওপাশে অভিক হেসে ফেলল।
“আবার?”
“হ্যাঁ, আবার।”
“ঠিক আছে।”
ফোন কেটে গেল।
নিশি কিছুক্ষণ মোবাইলটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বাইরে তখন আকাশের রং বদলাতে শুরু করেছে। কালচে অন্ধকারের ভেতর খুব হালকা নীল একটা রেখা।
সে বিছানায় ফিরে এল। চাদরের কুঁচকে থাকা জায়গাটা আবার হাত দিয়ে মসৃণ করল। তারপর অভিকের বালিশটা নিজের দিকে টেনে নিল।
বালিশে খুব হালকা একটা পরিচিত গন্ধ।
নিশি চোখ বন্ধ করল।
ঘুম এল না।
তবু বুকের ভেতরের অস্থিরতাটা আর আগের মতো নেই।
দূরের কোনো এক রাস্তা দিয়ে অভিক ফিরছে।
এইটুকু জানাই যেন রাতটার জন্য যথেষ্ট।
নিশি চাদরের ওপর হাত রেখে শুয়ে রইল। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে আলো বাড়ছে।
ভোর আসছে।
আর নিশি জানে, কিছু রাত ঘুমিয়ে শেষ করতে হয় না।
শুধু অপেক্ষা করতে হয়—যতক্ষণ না প্রিয় মানুষটির ফেরার শব্দ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।