অন্তহীন নীরবতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। জানুয়ারি ০১,২০২৬
ডিসেম্বরের শেষের রাত। শহরের বৃষ্টিতে রাস্তা ভেজা, হালকা কুয়াশা ঘেরা। ঘড়িতে রাত এগারো বাজে, এবং অভিক অফিস থেকে ফেরার পথে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। নিস্তব্ধতা তার চারপাশ জড়িয়ে ধরেছে। হাতে থার্মাল কাপে গরম চা, কিন্তু ঠান্ডা লাগছে শরীরের ভেতর।
অভিক জানে, আজকের রাত সহজ নয়। নিশির কথা ভেবে বুকটা কেমন যেন ভারী। দু’বছর ধরে সে ওর জীবনের বাইরে চলে গেছে, কিন্তু সেই দূরত্ব কোনোদিন সম্পূর্ণ হয় নি।
আজ এক অপ্রত্যাশিত বার্তা পেয়েছে—নিশি শহরে এসেছে। দুজনের মধ্যে কথা শেষ হয়েছে; শেষবারের মতো বিদায় হয়েছিল। অথচ অভিকের মধ্যে এক অদ্ভুত কাঁপন বেজে উঠেছে, যা নীরবতার মধ্যে গাছের মতো জন্ম নিয়েছে।
বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ একটি গাড়ি এসে দাঁড়ায়। চালকের আসনে নিশি। অভিক হঠাৎ হকচকিয়ে যায়।
নিশি জানল—“তুমি কি উঠছ?”। অভিক কিছু বলতে পারে না। মুখের ভেতরে শব্দ আটকে আছে। নিশি দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু সে কোনো জোর প্রয়োগ করছে না। এক মুহূর্তের জন্য কেবল স্থিরতা।
অভিক নিঃশ্বাস নিল। ছোট্ট চড়চড়ে হৃদয়টা যেন জানাচ্ছে—এটা ঠিক সময় নয়, কিন্তু কিছু করতেই হবে। সে দরজা ধরে বসে পড়ে। গাড়ি ছুটতে থাকে, ফাঁকা রাস্তায়। শহরের বাতাস, ভেজা গলিপথ, সব কিছু যেন তাদের চারপাশে জমাটবদ্ধ। নিশি প্রথমে কথা বলে—“কেমন আছো?”
অভিক হোঁচট খায়, তার ভেতরের চাপ আরেকবার স্পর্শ করে। “ভাল,” সে বলল, কিন্তু চোখের কোণে ভেজা দৃষ্টিটা নিশিকে আচ্ছন্ন করে। আবার নীরবতা। গাড়ির ভিতরে চুপচাপ থাকা ভেতরের ভাঙা স্মৃতিকে আরো তীক্ষ্ণ করছে।
“নিশি, তুমি শহরে থাকছো কি?”
“হ্যাঁ, কিন্তু কিছুদিনের জন্য। বাসা ঠিক হবে, তারপর চলে যাব। হয়তো চট্টগ্রামে।”
অভিক মৃদু মাথা নেড়ে শুধু শুনল। কথা বলতে চায়, কিন্তু সব শব্দ বুকে আটকে আছে।
গাড়ি ক্রসিং পেরোতে থাকে। অভিক মনে মনে ভেবে চলেছে—কেন এই মুহূর্ত এত দীর্ঘ, কেন নিশির নীরব দৃষ্টি এত জোরালো। পেছনের স্মৃতিগুলো একবারে চোখে ভেসে আসে—কলেজের দিন, প্রথম দেখা, হাসি-কান্নার সব ছোট ছোট মুহূর্ত। কিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু আজ সব স্মৃতি একসাথে জেগে উঠল।
“অভিক, মা কেমন আছে?”
অভিক গলা কাঁপতে লাগল। কেমন যেন ব্যথা ভেতরে গেঁথে আছে। “ভালই আছে,” সে বলল, কিন্তু ভেতরের এক টুকরো কষ্টকে থামাতে পারল না। নিশির দৃষ্টি মৃদু ভেজা হয়ে আছে, অথচ কোনো অভিযোগ নেই।
“আমার মা প্রায়ই তোমার কথা বলতেন,” নিশি বলল।
অভিক চুপ। দুই বছর ধরে সে যে দুঃখ জমিয়েছে, সব চোখের সামনে এসে দাঁড়াল। একাকিত্ব, বেদনার সমস্ত ক্ষুদ্র মুহূর্ত, নিঃশব্দ দ্বন্দ্ব। চোখের কোণ ভিজে গেল।
গাড়ি গলির মুখে এসে দাঁড়ালো। অভিক নেমে দাঁড়াল। নিশি হালকা হাসি, চোখে মৃদু জল। “ভাল থেকো,” সে বলল।
অভিক ফিরে তাকাল। নিশি চলে যাচ্ছে। রাস্তার অন্ধকারে নিঃশব্দ দৃষ্টি যেন তার শরীর ছুঁয়ে গেছে। ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি, কষ্টের সঙ্গে মিশে। সব কিছু ঠিক হয় নি, কিন্তু এক মুহূর্তের সত্যিকার সংযোগ, স্মৃতির স্পর্শ, এই রাতে তার হৃদয়কে শক্তি দিয়েছে।
অভিক বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকল। শীত, নিস্তব্ধতা, অন্ধকার—সব মিলিয়ে একটি অদ্ভুত শান্তি। স্মৃতির টুকরো, যন্ত্রণার ছায়া, ভাঙা সম্পর্কের আঘাত—সব কিছু একসাথে মিলিয়ে গেছে। নিশির চোখদুটি আজও তার ভেতর ছুঁয়েছে।
শুয়ে থাকলেও মন অস্থির। কিন্তু একটাই সত্য—যে সম্পর্ক শেষ হয়েছে, তার প্রতিটি মুহূর্ত এখনও জীবিত। এবং সেই জীবিত স্মৃতি, সেই ভিজা চোখদুটি, অভিকের হৃদয়ে ঝড় তুলেছে, কিন্তু জীবনের অগ্নিশিখাও জ্বালিয়েছে।
#অন্তহীন_নীরবতা #মনেরঝড় #ভিজাঅনুভূতি #অভিকওনিশি #স্মৃতিরস্পর্শ #ভালোবাসারছায়া #নষ্টহওয়াসময় #মানবিককাহিনী #হৃদয়েরঘূর্ণি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।