রাতের পর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প | ৪ অক্টোবর ২০২৬
রাত প্রায় দুটো। ঘরের সবাই ঘুমিয়ে গেছে। শুধু অভিকের চোখে ঘুম নেই।
কয়েক দিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। সিঁড়ি ভাঙলে বুকের ভেতর চাপ লাগে, একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে মাথা ঘোরে। ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছেন, কিছু পরীক্ষা করাতে বলেছেন।
কিন্তু সংসারে বিশ্রাম বলে আলাদা কোনো জায়গা নেই।
দুপুরে মেয়ের পড়াশোনা, বিকেলে বাজার, রাতে ওষুধের হিসাব। তার ওপর সংসারের আরও কত ছোটখাটো কাজ। সবকিছু শেষ করতে করতে নিজের শরীরটার কথাই ভুলে যায় অভিক।
রাত ২টা ৭ মিনিট।
হঠাৎ বুকের ভেতর চাপটা একটু বেড়ে গেল।
অভিক ধীরে ধীরে উঠে বসল। বিছানার পাশে রাখা পানির বোতলটা হাতে নিতে গিয়ে হাতটা কেঁপে গেল। কয়েক সেকেন্ড বোতলটা ধরে বসে রইল।
নিশি পাশে ঘুমাচ্ছে।
অভিক তাকাল তার দিকে। ডাকবে কি না ভাবল। শেষ পর্যন্ত ডাকল না।
সারাদিন মানুষটা কত কিছু সামলায়। মেয়েদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে, ঘরের কাজ করে, তার ওষুধের সময় মনে করিয়ে দেয়। এই সামান্য রাতটুকুও যদি তার ঘুম থেকে কেড়ে নেয়?
অভিক পানি খেল।
তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
একসময় অফিস থেকে ফিরলেই দরজা খুলে দুই মেয়ে দৌড়ে এসে বলত, “বাবা!”
সেই সময়গুলো খুব দূরের মনে হয় এখন।
এক রাতে ছোট মেয়েটা ঘুমানোর আগে তার বুকের ওপর মাথা রেখে বলেছিল, “বাবা, তুমি কাল তাড়াতাড়ি আসবে?”
অভিক বলেছিল, “আসব।”
কত সহজ ছিল তখন একটা কথা রাখা।
এখন একটা দিন শেষ করাই যেন অনেক বড় কাজ।
বুকের চাপটা আবার বাড়ল।
অভিক এবার চোখ বন্ধ করল। ভয় পেল।
মৃত্যুর ভয়টা আসলে মৃত্যুর চেয়ে আলাদা। মানুষ তখন নিজের চলে যাওয়ার কথা যতটা ভাবে, তার চেয়ে বেশি ভাবে—তার চলে যাওয়ার পর ঘরের মানুষগুলো কীভাবে থাকবে।
মেয়েদের কথা মনে হলো। নিশির কথা মনে হলো।
তারপর নিজের অজান্তেই চোখের কোণে পানি জমল।
অভিক মুখ ঘুরিয়ে নিল।
পুরুষ মানুষ অনেক সময় কাঁদে না বলে কাঁদে না। বরং কোথায় কাঁদবে, কার সামনে কাঁদবে, সেই জায়গাটা খুঁজে পায় না।
হঠাৎ পাশে নিশির ঘুম ভেঙে গেল।
“অভিক?”
অভিক চমকে তাকাল।
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
নিশি উঠে বসল। অন্ধকারে তার মুখটা ভালো দেখা যাচ্ছিল না।
“বুক ধরেছে?”
অভিক কিছু বলল না।
নিশি হাত বাড়িয়ে তার কপালে হাত রাখল। কপাল ঘামে ভেজা।
“এত ঘামছো কেন?”
“একটু চাপ লাগছে।”
নিশি আর কোনো প্রশ্ন করল না। পানির বোতলটা এগিয়ে দিল। তারপর বিছানার পাশে রাখা ওষুধের বাক্সটা টেনে নিল।
“কাল আবার ডাক্তারকে ফোন করব।”
অভিক ধীরে বলল, “তোমার ঘুমটা নষ্ট করে দিলাম।”
নিশি ওষুধটা তার হাতে দিয়ে বলল, “তাতে কী?”
মাত্র দুটি শব্দ।
অভিক নিশির হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই হাতটা কত বছর ধরে তার সঙ্গে আছে। কখনো বাজারের ব্যাগ ধরেছে, কখনো মেয়ের স্কুলের খাতা, কখনো তার ওষুধ। আজ রাতে শুধু তার কপালের ঘাম মুছে দিচ্ছে।
অভিক হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নিল।
চোখের পানি এবার আর লুকাতে পারল না।
নিশি দেখেও কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর অভিক খুব আস্তে বলল, “নিশি।”
“হুম?”
“আমি মাঝে মাঝে খুব ভয় পাই।”
নিশি তার দিকে তাকাল।
“কীসের?”
অভিক উত্তর দিল না।
নিশিও আর জিজ্ঞেস করল না।
শুধু বিছানার ওপর হাত বাড়িয়ে অভিকের হাতটা ধরে রাখল।
রাত তখনও শেষ হয়নি।
নিশি পাশেই বসে ছিল।
কিছু বলল না।
শুধু তার হাতটা ধরে রাখল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।