টেবিলের দূরত্ব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
পঁচিশ বছরের সংসারে এই প্রথম স্বামী-স্ত্রী একই টেবিলে বসে খায়নি।
ঘটনাটা গত শুক্রবারের।
খুব বড় কিছু না। কোনো চিৎকার হয়নি। দরজা বন্ধ করে চলে যাওয়ার মতো কিছু হয়নি।
শুধু একটা কথার পর দুজন মানুষ চুপ হয়ে গিয়েছিল। আর সেই নীরবতা সাত দিন ধরে ঘরের ভেতর বসে ছিল।
রাতের খাবার টেবিলে রাহাত আর মিম বসে আছে। রুবিনা রান্নাঘর থেকে খাবার এনে রাখছে। আরিফ টেবিলের অন্য পাশে বসে মোবাইল দেখছে।
দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব। কিন্তু পঁচিশ বছরের সংসারে এই দূরত্বটাই যেন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
"মা, তুমি বসবে না?"
মিম জিজ্ঞেস করল।
রুবিনা একটু থেমে বলল, "তোমরা খাও। আমার খিদে নেই।"
আরিফ একবার তাকাল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
শুরুটা হয়েছিল রুবিনার বাবার পুরোনো বাড়ি নিয়ে। বাড়িটা অনেক বছর ধরে খালি পড়ে আছে, নারায়ণগঞ্জের দিকে।
রুবিনার ভাইয়েরা চাচ্ছে বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নিতে। রুবিনা চেয়েছিল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরিফের সঙ্গে কথা বলতে।
সেদিন রাতে আরিফ অফিস থেকে ফিরেছিল ক্লান্ত হয়ে। হাতে ছিল কিছু কাজের কাগজ।
রুবিনা বলেছিল, "বাড়িটার ব্যাপারে তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।"
আরিফ তখন হিসাবের খাতা দেখছিল। অন্যমনস্কভাবে বলেছিল, "তোমাদের ভাইদের সঙ্গে কথা বলে নাও। এসব নিয়ে আমাকে এখন টেনো না।"
কথাটা বলার সময় আরিফ হয়তো বুঝতে পারেনি। কিন্তু রুবিনা শুনেছিল অন্যভাবে।
পঁচিশ বছর ধরে যে মানুষটার সঙ্গে জীবনের সব সিদ্ধান্ত ভাগ করেছে, তার মুখে "আমাকে এখন টেনো না" কথাটা খুব অপরিচিত লেগেছিল।
সেই রাত থেকে রুবিনা চুপ। আরিফও ভেবেছিল, কয়েকদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিছু নীরবতা সময়ের সঙ্গে কমে না। বরং আরও জমে।
পঁচিশ বছর আগে তাদের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ। ছোট একটা ভাড়া বাসা, মিরপুরের দিকে। দুটো কাঠের চেয়ার। একটা পুরোনো ফর্মিকার টেবিল। আর অনেক স্বপ্ন।
বিয়ের পর একদিন আরিফ বলেছিল, "দেখো, আমাদের হয়তো সবকিছু থাকবে না।"
রুবিনা হেসে বলেছিল, "তাহলে?"
আরিফ বলেছিল, "খাওয়ার টেবিলে যেন দুজনের জায়গা থাকে।"
সেদিনের কথাটা রুবিনার মনে ছিল। হয়তো সে কারণেই এই কয়েক দিনের দূরত্বটা তার এত বেশি কষ্ট দিচ্ছিল।
রাহাত আর মিমও বুঝতে পারছিল। বাবা-মায়ের মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে।
আগে বাবা অফিস থেকে ফিরলে মা চা দিত। মা অসুস্থ হলে বাবা নিজের কাজ ফেলে পাশে বসত। এখন প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা হয় না।
এক রাতে রাহাত মিমকে বলল, "আগে কখনো এমন হয়েছে?"
মিম মাথা নাড়ল। "না।"
"তাহলে এবার কেন হলো?"
মিম উত্তর দিল না। বড়দের সম্পর্কের কিছু প্রশ্নের উত্তর সন্তানদের কাছেও থাকে না, সম্ভবত।
একদিন বিকেলে মিম পুরোনো অ্যালবাম দেখছিল। হঠাৎ একটা ছবিতে তার চোখ আটকে গেল।
ছোট একটা ঘর। সামনে প্লাস্টিকের টেবিল। এক প্লেটে খাবার। আর পাশে বসে আছে তরুণ বয়সের আরিফ আর রুবিনা।
মিম ছবিটা নিয়ে মায়ের কাছে গেল। "মা, এটা দেখো।"
রুবিনা ছবিটা হাতে নিল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
"তখন তো আমাদের কিছুই ছিল না।"
মিম মৃদু হেসে বলল, "কিন্তু তোমরা একসঙ্গে ছিলে।"
রুবিনা আর কিছু বলল না। শুধু ছবিটা হাতে ধরে বসে রইল।
সেদিন রাতে আরিফও আলমারি গোছাতে গিয়ে পুরোনো একটা ডায়েরি পেল। প্রথম পাতায় রুবিনার হাতের লেখা। বিয়ের পরের কিছু দিনের কথা।
এক জায়গায় লেখা, "আজ আরিফ বলল, ঘর ছোট হলে সমস্যা নেই। শুধু যেন আমরা পাশাপাশি থাকি।"
আরিফ ডায়েরিটা বন্ধ করল। অনেক বছর পর সে বুঝল, কিছু কথা মানুষ ভুলে যায় না। শুধু ব্যস্ততার নিচে চাপা পড়ে যায়।
পরদিন রাতে রুবিনা খাবার সাজাচ্ছিল। আরিফ এসে দাঁড়াল।
"রুবিনা।"
সে তাকাল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর আরিফ বলল, "সেদিন তোমাকে ওইভাবে বলা ঠিক হয়নি।"
রুবিনা কিছু বলল না।
আরিফ ধীরে বলল, "বাড়িটার ব্যাপারে কাল তোমার ভাইদের সঙ্গে বসে কথা বলব। তুমি একা সিদ্ধান্ত নেবে না।"
রুবিনার চোখ একটু ভিজে উঠল। "আমিও হয়তো তোমাকে বুঝতে দিইনি যে কথাটা আমার এত খারাপ লেগেছে।"
আরিফ হালকা হাসল। "পঁচিশ বছর পরেও আমরা দুজনেই অভিমান লুকাতে শিখিনি।"
রুবিনা প্রথমবারের মতো একটু হাসল।
সেদিন রাতে পঁচিশ বছর পর আবার একই টেবিলে বসে খেয়েছিল তারা।
রুবিনা অভ্যাসবশত আরিফের প্লেটে একটু বেশি মাছ তুলে দিল।
আরিফ কিছু বলল না। শুধু প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিল।
রাহাত আর মিম দূর থেকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
টেবিলটা একই ছিল। শুধু মাঝখানের দূরত্বটা আর ছিল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।