যে কান্না শোনার কথা ছিল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০১, ২০২৬
ডাইরির পাতা খুললেই কেমন একটা চুপচাপ ভাব নেমে আসে। একেবারে নিঃশব্দ না—বরং মনে হয়, কথাগুলো বাইরে বের না হয়ে ভেতরেই ঘুরপাক খায়। আজকের তারিখ লিখতে গিয়ে একটু থামলাম। মে মাসের ১ তারিখ। শ্রমিক দিবস। ক্যালেন্ডারে লাল চিহ্ন। কিন্তু দিনটার ভেতরে যে রঙটা থাকার কথা, সেটা চোখে পড়ে না—হয়তো আছে, আমি ধরতে পারছি না।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। সন্ধ্যা নামছে, ধীরে। বাতাসে হালকা ঠান্ডা, তবু আরাম লাগছে না ঠিক। সন্ধ্যামালতী ফুলগুলো দুলছে। ওদের দিকে তাকালে মনে হয়, সবকিছু ঠিকঠাক আছে। আবার একটু পরে মনে হয়—এটা কি শুধু ওপরের দিকটা?
ফুলগুলো নিশ্চিন্ত। তারা ক্ষুধা বোঝে না। অপমানও না। এই না-জানাটা তাদের বাঁচিয়ে রাখে—এমনটা ভাবা যায়।
রাস্তার দিকে তাকাই। শহরটা বদলেছে—কমপক্ষে আমরা তাই বলি। আলো বেড়েছে, শব্দ বেড়েছে, গতি বেড়েছে। কিন্তু আজ রাস্তা ফাঁকা। অস্বাভাবিকভাবে। কয়েকটা কুকুর ঘুরছে। চুপচাপ। তাদের হাঁটার ভঙ্গিতে অদ্ভুত একটা নির্লিপ্তি—যেন কোনো কিছুরই তাড়া নেই, আবার কোথাও পৌঁছানোর দরকারও নেই।
পাশের ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে। ভেতরে মানুষের নড়াচড়া বোঝা যায়। বাইরে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক। তবু মনে হয়, ভেতরে কিছু চাপা পড়ে আছে। কেউ চাকরি নিয়ে চিন্তায়, কেউ অসুখ নিয়ে, কেউ হয়তো কাল কী খাবে সেটা নিয়ে—অনিশ্চয়তা আলাদা আলাদা, কিন্তু অনুভূতিটা প্রায় এক।
দূরে মাইকের শব্দ এল, “শ্রমিকের অধিকার চাই।”
কিছুক্ষণ ভেসে থাকল, তারপর মিলিয়ে গেল। খুব স্বাভাবিকভাবেই। যেন থাকার কথা ছিল না।
তাপদাহ চলছে অনেকদিন। রোদে দাঁড়ালে মাথা ঝিমঝিম করে। রাস্তার পিচ নরম হয়ে গেছে—চোখে পড়ার মতো। মানুষের ভেতরেও কি এমন কিছু নরম হয়ে যাচ্ছে? বোঝা মুশকিল। শহরের অন্য পাশে তখনো কিছু মানুষ ঠান্ডা ঘরে বসে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাদের কথায় উদ্বেগ আছে—কিন্তু সেটা যেন দূর থেকে বলা উদ্বেগ। কাছ থেকে না।
ঠিক তখনই থামলাম।
একটা শব্দ,খুব ক্ষীণ, ভাঙা।
পেছনের গলি থেকে আসছে। অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে জায়গা। একটা শিশুর কান্না।
প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। শহরে এমন শব্দ নতুন কিছু না। কিন্তু আবার এল। এবার একটু পরিষ্কার। তারপর আরও একটা। কয়েকটা কণ্ঠ মিশে গেল একসাথে—একটা থেকে আলাদা করা যায়, তবু পুরোটা আলাদা করা যায় না।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি।
নড়ি না।
কান্নাগুলো কেমন করে যেন ভেতরে ঢুকে পড়ে।
মনে হলো—কেউ কি শুনছে?
চারপাশে তাকাই। কেউ জানালা বন্ধ করছে। কেউ টিভির শব্দ বাড়াচ্ছে। কেউ ফোনে কথা বলছে, একদম স্বাভাবিকভাবে। এই স্বাভাবিকতাই একটু অস্বস্তিকর লাগে।
আর আমি? আমি দাঁড়িয়ে আছি। শুনছি।
কিন্তু করছি না কিছুই।
পেটের ভেতর তখন খালি। সারাদিন ঠিকমতো খাওয়া হয়নি। পকেটেও তেমন কিছু নেই। আমি জানি—যদি এখন ওই গলিতে যাই, কিছু দিতে পারব না। এই জানাটাই আটকে দেয়। অদ্ভুতভাবে।
তবু এবার পুরোটা এড়িয়ে যেতে পারলাম না।
দরজা খুলে বের হলাম। সিঁড়ি দিয়ে নামলাম ধীরে। গলির মুখ পর্যন্ত গেলাম।
ভেতরে ঢুকিনি।
অন্ধকারটা ঘন। ভেতরে নড়াচড়া আছে—শব্দে বোঝা যায়। কান্না তখনো চলছে।
আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ।
তারপর ফিরে এলাম।
কেন এলাম—ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। ভয় ছিল? লজ্জা? নাকি শুধু অভ্যাস?
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম।
শব্দটা কমে না।
তাই আরেকটা কাজ করলাম—নিজের ভেতরে একটা দেয়াল তুললাম। ইচ্ছা করে।
ডাইরি খুলে বসি, কলম হাতে নিই।
লিখতে শুরু করি। শব্দ আসে—সমাজ, অবস্থা, দায়—এই ধরনের কথা। লিখতে লিখতে মনে হয়, আমি যেন একটু দূরে সরে যাচ্ছি। ঘটনাটা থেকে, নিজের থেকেও।
কিন্তু বেশিক্ষণ টেকে না।
হঠাৎ মনে হলো—আমি লিখছি না, আমি এড়িয়ে যাচ্ছি।
জানালার বাইরে তাকাই। চাঁদ উঠেছে। পুরো গোল না, তবু আলো আছে। বৈশাখের রাত—গরম, সঙ্গে ধুলার গন্ধ, কোথাও পাকা ফলের হালকা মিষ্টি গন্ধ। কৃষ্ণচূড়া গাছটা স্থির দাঁড়িয়ে। লাল ফুলগুলো চোখে লাগে—অতিরিক্ত না, আবার অদৃশ্যও না।
মনে হয়, আকাশ আর গাছের মধ্যে কিছু একটা চলছে। কথা না, তবু যোগাযোগ।
হিংসা হয়—কিছুটা। হয়তো অদ্ভুত শোনাবে।
কারণ তারা অন্তত প্রতিক্রিয়া পায়।
আমরা পাই কিনা, সেটা নিশ্চিত না।
ডাইরির দিকে আবার তাকাই। হাত একটু কাঁপে।
লিখি—“আজ নিজেকে এড়িয়ে গেছি। শুনেছি, কিন্তু যাইনি পুরোটা। দেখেছি, কিন্তু চোখ সরিয়েছি।”
এর বেশি এগোয় না।
চোখ ভিজে আসে—কারণটা পরিষ্কার না।
হয়তো ক্লান্তি। হয়তো অন্য কিছু।
মনে হয়, সমস্যা শুধু তাপ না। ক্ষুধাও না। এগুলো চোখে পড়ে।
আরও ভেতরে কিছু আছে—একটা অভ্যাস, নিজেকে গুটিয়ে রাখার। অন্যের কষ্টকে দূরে রাখার।
বাইরে কান্নাটা থেমেছে কিনা—জানি না। জানতে চাই না।
শেষে লিখি—
“বেঁচে আছি। আর এই বেঁচে থাকাটা ঠিক কী, সেটা এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। তবু লিখে রাখছি—হয়তো পরে দরকার হবে।”
ডাইরিটা বন্ধ করি।
কিন্তু একটা শব্দ থেকে যায়।
শুরুতে যেটা এসেছিল—
সেটা থামে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।