যে প্রেম শব্দে ধরা পড়ে না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০৩, ২০২৬
রাতটা শুরু থেকেই অস্বাভাবিকভাবে স্থির ছিল, যেন কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু প্রতিবারই মাঝপথে থেমে যাচ্ছে। সেই থেমে যাওয়াটাই পুরো রাতটার ভাষা হয়ে উঠেছিল।
গ্রামের শেষ প্রান্তে পুরোনো নদীর বাঁধে অর্ণব বসেছিল। সময় নিয়ে তার কোনো তাড়া ছিল না। আশপাশে শব্দ নেই, তবু জায়গাটা শূন্য মনে হচ্ছিল না—বাতাস চলছিল খুব ধীরে, প্রায় নিজের উপস্থিতি লুকিয়ে রাখার মতো করে। শান্তি বললে ঠিক বলা হয় না; বরং শান্তির ভেতরে যে অস্বস্তি লুকিয়ে থাকে, সেটাই সেখানে বেশি স্পষ্ট ছিল।
আকাশ নীলচে কালো, পুরোপুরি অন্ধকারও নয়, আবার পরিষ্কার আলোও নয়। চাঁদ ছিল আড়াল-আবছায়ায়। তার আলো এসে অর্ণবের মুখে পড়ছিল, কিন্তু ভেতরের অংশটাকে ছুঁতে পারছিল না। এটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল, যদিও সে সেটা ভাষায় আনতে পারছিল না।
সে কারও জন্য অপেক্ষা করছিল কি না, এই প্রশ্নের উত্তর তার নিজের কাছেও পরিষ্কার ছিল না। তবু একটা অনুভূতি বারবার ফিরে আসছিল—কিছু একটা হারিয়ে গেছে, আর সেই হারিয়ে যাওয়ার কোনো নাম নেই। আশ্চর্যভাবে, সেই অনিশ্চয়তাই এখন পরিচিত হয়ে গেছে।
বাতাস হঠাৎ একটু বদলে গেল। খুব সামান্য, কিন্তু অনুভব বদলে দেওয়ার মতো।
তার মনে হলো, প্রেম কখনো সরাসরি আসে না। এটা থাকে, কিন্তু ধরা যায় না—বাতাসের মতো। সেই উপস্থিতির ভেতরেই এক ধরনের অস্বস্তিকর টান থাকে, যেটা পুরোপুরি ব্যথা না হলেও শান্তিও না।
সে চোখ বন্ধ করল। তবু ভেতরের দিকটা আরও স্পষ্ট হলো।
চোখে চোখ রাখার কোনো দৃশ্য তৈরি হয়নি, কিন্তু মনে হলো কেউ একবার তাকিয়েছিল। সেই একবারের ভেতরেই একটা টান তৈরি হয়েছে, যেটা সহজে ছিঁড়ে ফেলা যায় না। অর্ণব নিজেই বুঝতে পারছিল না, কীভাবে এমন কিছু এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে।
তার মনে পড়ল, কিছু মুহূর্ত বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হয়। কোনো বড় ঘটনা না, কোনো ঘোষণা না, তবু ভেতরের মানুষটাকে বদলে দেয়—শ্রাবণের বৃষ্টির মতো, শব্দহীন কিন্তু ভিজিয়ে দেওয়া।
নিশা।
নামটা মনে পড়তেই বাতাস যেন একটু ভারী হয়ে গেল। এটা হয়তো কল্পনা, আবার হয়তো কাকতালীয় কিছু।
নিশা খুব কম কথা বলত। অর্ণবও খুব বেশি বলত না। তাদের মধ্যে যা ছিল, সেটাকে সম্পর্ক বলা যায় কি না, সে নিয়ে নিজেই দ্বিধায় থাকত। তবু কিছু একটা ছিল—অস্বীকার করা যেত না, আবার নামও দেওয়া যেত না।
একদিন সে চলে গিয়েছিল, খুব সাধারণভাবে। কোনো বিদায় ছিল না, কোনো দৃশ্যও না। শুধু একটা অনুপস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেটা সময়ের সঙ্গে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
অর্ণব তখন বুঝেছিল, কিছু মানুষ চলে গিয়ে সবচেয়ে বেশি থেকে যায়।
বাঁধের ওপর বসে থাকতে থাকতে সে চোখ খুলল। দূরের আলো কাঁপছিল। মনে হলো আলোও এখন স্থির কোনো জিনিস নয়।
তার ভেতরে একটা টান তৈরি হচ্ছিল—জীবনকে ধরে রাখার চেষ্টা, কিন্তু কীভাবে তা সে জানে না। কখনো মনে হয় সব ঠিক আছে, আবার পরক্ষণেই মনে হয় কিছুই ঠিক নেই।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
বাতাস তখন এক অদ্ভুত সময়ের অনুভূতি নিয়ে এসেছিল—না রাত, না ভোর। এই অস্পষ্টতার ভেতরে বাস্তব আর স্মৃতি আলাদা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ নিশার একটা কথা মনে পড়ল—“কিছু অনুভূতি থাকে যেগুলো বলা যায় না, শুধু বহন করতে হয়।”
তখন কথাটা খুব গুরুত্ব পায়নি। এখন মনে হচ্ছে, সেটাই হয়তো সত্য ছিল।
বাঁধের পাশের গাছটা হালকা নড়ছিল। পাতার ফাঁক দিয়ে আলো ভেঙে পড়ছিল অসমভাবে। অর্ণব খেয়াল করল, আলো সব জায়গায় একরকম নয়—কোথাও স্পষ্ট, কোথাও প্রায় নেই।
তার মনে হলো, প্রেমও ঠিক এমনই। কখনো স্পষ্ট, কখনো পুরোপুরি অদৃশ্য।
সে আবার বসে পড়ল।
সময় যেন একটু পিছিয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তগুলো স্থির হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু থেমে নেই। মনে পড়ছে কীভাবে কিছু কথা কখনো বলা হয়নি।
ধীরে ধীরে একটা উপলব্ধি হলো—হারিয়ে যাওয়া জিনিস সবসময় দূরে যায় না। কিছু জিনিস ভেতরে থেকে যায়, শুধু রূপ বদলায়।
বাতাস আবার বদলাল। এবার কিছু পরিচিত ভার নিয়ে এলো।
মনে হলো, খুব পুরোনো একটা শব্দ ভেসে এসেছে—হাসি নয়, নীরবতার মতো কিছু।
অর্ণব বুঝতে পারল, সে আসলে কাউকে খুঁজছে না। সে খুঁজছে সেই মুহূর্তগুলো, যেগুলো একসময় সাধারণ ছিল, কিন্তু এখন ভারী হয়ে গেছে।
তার ভেতরে একটা প্রশ্ন উঠল—এই অনুভূতির নাম কী?
উত্তর এলো না।
শুধু একটা ধারণা তৈরি হলো—যা বলা যায় না, সেটাই সবচেয়ে গভীরভাবে থেকে যায়।
আকাশে আলো বাড়ছে। রাত শেষ হচ্ছে, কিন্তু ভেতরের রাতটা শেষ হচ্ছে না।
অর্ণব উঠে দাঁড়াল।
তার মনে হলো, সে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি, কিন্তু কিছু একটা বদলেছে—হয়তো বোঝার ভঙ্গি।
বাতাস তখনও বইছে।
আর সেই বাতাসের ভেতরেই প্রেম ছিল—নিঃশব্দ, অস্পষ্ট, কিন্তু অস্বীকার করা যায় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।