যে ছেলেটি প্রতিদিন স্কুলের সামনে দাঁড়াত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
শিশুর জীবনসংগ্রাম।
১৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রতিদিন স্কুল ছুটির সময় ছেলেটি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত।
কাঁধে পুরোনো একটা ব্যাগ। চেইন নষ্ট, এক পাশের সেলাই খুলে গেছে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে এলে সে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াত, যেন কারও পথ আটকে না যায়। কেউ দৌড়ে মায়ের কাছে যেত, কেউ বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে গলির মোড়ে হারিয়ে যেত। ছেলেটি তাদের চলে যাওয়া দেখত।
একদিন বাংলা ক্লাস শেষে শিক্ষক মিজানুর রহমান তাকে ডাকলেন।
“এই যে, তুমি প্রতিদিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকো কেন?”
ছেলেটি ব্যাগের ফাটা মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরল।
“এমনিই।”
“ভেতরে আসো না কেন?”
সে গেটের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর বলল, “আমার নাম লেখানো নেই, স্যার।”
“তোমার নাম কী?”
“সজীব।”
“পড়তে ইচ্ছা করে?”
সজীব মাথা নাড়ল।
“তাহলে ভর্তি হও না কেন?”
ছেলেটি এবার উত্তর দিল না। গেটের পাশ থেকে একটা শুকনো পাতা সরিয়ে জুতোর নিচে চাপা দিল। তারপর বলল, “সকালে কাজে যেতে হয়।”
মিজানুর রহমান জানতে চাইলেন, কী কাজ করে সে। সজীব জানাল, সকালে কয়েকটা বাসায় পানি পৌঁছে দেয়, বাজারের ব্যাগ টানে। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। বাবা নেই। কাজের টাকা থেকে সংসারের জন্য কিছু দেয়, বাকিটা ছোট বোনের পড়ার খরচে লাগে।
“তোমার বোন পড়ে?”
“দুইয়ে পড়ে, স্যার।”
“তোমার খাতা নেই?”
সজীব একটু হেসে বলল, “আমার তো খাতা লাগে না, স্যার।”
কথাটা বলে সে চলে গেল।
সেদিন কথাটা মিজানুর রহমানের মাথায় থেকে গেল। পরদিনও সজীবকে গেটের বাইরে দেখলেন। তার পরদিনও। একদিন স্কুল ছুটির পর তিনি ছেলেটিকে অনুসরণ করে গলির ভেতর গেলেন।
সজীব একটা বাড়ির সামনে বালতি নামিয়ে পানি খাচ্ছিল। শিক্ষককে দেখে সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।
“তোমাদের বাড়ি কোথায়?”
সজীব গলির শেষ মাথার টিনের ঘরটা দেখিয়ে দিল।
ঘরের ভেতর ঢুকে মিজানুর রহমান দেখলেন, এক পাশে চুলা, অন্য পাশে বিছানা। দেয়ালের পেরেকে দুটো জামা ঝুলছে। মেঝেতে বসে একটা মেয়ে খাতায় লিখছে। খাতার মলাটে ফুল আঁকা, কিন্তু পাতাগুলো এক রকম নয়। কোথাও সাদা, কোথাও নীল দাগের পুরোনো পাতা। মাঝখানে সুতো দিয়ে বাঁধা।
মেয়েটির নাম মিতু।
শিক্ষককে দেখে সে খাতা বন্ধ করতে গেল। সজীব বলল, “লুকাস কেন? স্যার তো পড়া দেখতে এসেছেন।”
মিতু খাতাটা আবার খুলল।
মিজানুর রহমান মেঝেতে বসে পাতাগুলো দেখতে লাগলেন। একেক পাতার ওপর একেক রকম লেখা। কোথাও বড় বড় অক্ষর, কোথাও ছোট। কিছু পাতায় আগের লেখার দাগ রয়ে গেছে। তার ওপর নতুন করে পেনসিল চালানো হয়েছে।
“এভাবে খাতা বানিয়েছ?”
সজীব মাথা নাড়ল।
“পুরোনো খাতার ফাঁকা পাতাগুলো সেলাই করে দিই।”
মিতু তখন নতুন একটা পাতায় নিজের নাম লিখছিল। প্রথম অক্ষরটা বাঁকা হয়ে গেল। সে ঠোঁট কামড়ে পাতা ছিঁড়তে হাত বাড়াল।
সজীব সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ছিঁড়িস না। পেছনের পাতায় আবার লিখিস।”
মিতু হাত থামাল।
শিক্ষক দেখলেন, সজীবের নিজের কাঁধের ব্যাগটা ঘরের দরজার পাশে পড়ে আছে। ব্যাগের ভেতর থেকে একটা ছেঁড়া কাগজ বেরিয়ে আছে। তাতে পেনসিলে কয়েকটা অক্ষর লেখা—‘অ আ ক খ’। কিছু অক্ষর কেটে আবার লেখা হয়েছে। নিচের দিকে জায়গা ফুরিয়ে গেছে।
মিজানুর রহমান কাগজটা হাতে নিলেন না।
মিতু পাতাটা উল্টে দিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।