ভাড়ার বাসা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ০২, জুন ২০২৬
মাসের শেষ সপ্তাহ এলেই বাসার ভেতর কেমন যেন একটা চুপচাপ ভাব নেমে আসত।
ছোটবেলায় অভিক ব্যাপারটার মানে বুঝত না। শুধু দেখত, বাবা এই সময়টায় একটু কম কথা বলেন। মা বাজার থেকে ফিরে প্লাস্টিকের ব্যাগগুলো মেঝেতে রেখে বসে থাকেন। মাঝে মাঝে একটা কাগজ বের করে আবার ভাঁজ করে রাখেন। ডাইনিং টেবিলের ওপর একটা পুরোনো খাতাও দেখা যেত।
খাতাটার পাতায় সারি সারি হিসাব—চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল, স্কুলের বেতন, বাসা ভাড়া। অভিক সংখ্যাগুলো বুঝত না। কিন্তু এটুকু বুঝত, খাতাটা টেবিলে এলেই বাসার হাসি-গল্প একটু কমে যায়।
তাদের বাসাটা খুব বড় ছিল না। দুইটা ঘর, ছোট্ট একটা বারান্দা। অতিথি এলে প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে আনতে হতো। সবাই একটু সরে বসলে আরেকজনের জায়গা হতো। কিন্তু অভিকের কাছে বাসাটা কখনও ছোট লাগেনি।
ওখানেই তার প্রথম সাইকেলের চাকায় পা রাখা, পরীক্ষার আগের রাত জেগে পড়া। জ্বর এলে মা ভেজা কাপড় কপালে চেপে ধরে বসে থাকতেন।
এক বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে অভিক শুনল, মা আস্তে করে বলছেন,
“আরেক সপ্তাহ পরে দিলে হয় না?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর শুধু বললেন,
“হুম।”
আর কিছু না।
অনেক পরে অভিক বুঝেছিল, কথাটা বাসা ভাড়া নিয়ে ছিল।
সেদিন রাতে বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। রাস্তার দিকে তাকিয়ে। অভিক কয়েকবার দেখেছে। বাবা প্রায় নড়েননি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু জিনিস আলাদা করে চোখে পড়তে শুরু করল। বাবার একটা নীল শার্ট ছিল। বছরের পর বছর সেটাই পরতেন। একসময় কলারটা একটু ছিঁড়ে গিয়েছিল। মা সেলাই করে দিয়েছিলেন।
মা বাজার থেকে ফিরতেন হাতে অনেক ব্যাগ নিয়ে। কিন্তু সেগুলোর ভেতর তার নিজের জন্য কিছু থাকত না।
একবার অভিক জিজ্ঞেস করেছিল,
“মা, তুমি কিছু নাওনি?”
মা হেসে বলেছিলেন,
“আমার তো সব আছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় প্রথমবার অভিকের মনে হলো, সংসারের হিসাবগুলো বোধহয় এত সহজ না। ভর্তি ফি, বই, যাতায়াত—সব মিলিয়ে অনেক টাকা।
এক রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে সে বলেছিল,
“না হলে আমি এক বছর পরে ভর্তি হই?”
বাবা ভাত মাখা থামিয়ে তার দিকে তাকিয়েছিলেন।
“কেন?”
“এমনি...”
“এসব নিয়ে ভাবিস না।”
বিষয়টা সেখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
কয়েক মাস পরে এক আত্মীয়ের কাছে অভিক শুনেছিল, ভর্তি ফি দেওয়ার জন্য বাবা কিছু সঞ্চয় ভেঙেছিলেন। বাসায় এ নিয়ে কখনও কোনো কথা হয়নি।
বছর কয়েক পরে অভিক চাকরি পেল। প্রথম বেতন হাতে পেয়ে মনে হয়েছিল, এবার সবকিছু একটু সহজ হবে। কিন্তু মাস শেষে হিসাব মিলাতে বসে সে দেখল, টাকা হাতের ফাঁক দিয়ে গলে যায়।
বাজার, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস, বাসা ভাড়া—হিসাবের খাতায় একটার পর একটা খরচ জমতে থাকে।
খাতা-কলম নিয়ে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার বাবার সেই নীল শার্টটার কথা মনে পড়ল।
কলারটা ছিঁড়ে গিয়েছিল।
মা সেলাই করে দিয়েছিলেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।