আষাঢ়ের শেষ ঠিকানা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০২, ২০২৬
আষাঢ় এলে আকাশটা এমনিতেই ভারী হয়। কিন্তু এবার ভারের মধ্যে এক ধরনের দীর্ঘায়িত নীরবতা আছে, যেন মেঘগুলোও ঠিক করে উঠতে পারছে না—কীভাবে ঝরবে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ পড়ছে অনবরত, একঘেয়ে নয়, বরং ভাঙা ভাঙা ছন্দে। মনে হয় সময় নিজেই কোথাও থেমে থেমে হাঁটছে। চারপাশে সবুজ আছে, তবে সেটা স্থির নয়—ভেজা, চাপা, একটু ক্লান্ত।
নদীর দিকে তাকালে মনে হয় সে আর নিজের সীমার ভেতরে থাকতে চাইছে না। জল উপচে পড়ছে, কিন্তু সেই উপচে পড়া শুধু পানির নয়—একটা ধীর পরিবর্তনের মতো, যা ধরা যায় না কিন্তু দেখা যায়। ডোবা, খাল, মাঠ একে অন্যের ভেতর মিশে যাচ্ছে। আলাদা করে চেনার চেষ্টা করলেও গুলিয়ে যায়। কোথাও হেলেঞ্চা, কোথাও কলমিলতা—এরা ভেসে আছে ঠিকই, কিন্তু মনে হয় তারা পরিস্থিতিটাকেই মেনে নিয়েছে। কেয়া, কদম, কামিনী, জুঁই, গন্ধরাজ—সব গন্ধ একসঙ্গে বাতাসে জমে গিয়ে এক অচেনা ভার তৈরি করছে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পারুল। গ্রিলটা কপালে ঠেকানো, কিন্তু তার মন কোথায় দাঁড়িয়ে—ঘরের ভেতরে নাকি অন্য কোনো সময়ের ভেতরে—তা আলাদা করে বোঝা যায় না। বাইরে বৃষ্টি চলছে, কিন্তু তার দৃষ্টির ভেতরেও যেন অন্য এক আষাঢ় নামছে।
পারুল আর শিমুল—দুই ভাইবোন। পারুল এখন উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী, শিমুল ছিল ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।
গত বছরের এই আষাঢ়েই শিমুল আর ফিরে আসেনি।
শিমুল ছিল অস্থির, দৌড়ঝাঁপে ভরা এক শিশু। তার উপস্থিতি ঘরে কোনো ভার তৈরি করত না, বরং অদ্ভুতভাবে হালকা করে দিত। পারুল তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছে—ঝগড়া, হাসি, খুনসুটি—সব মিলিয়ে এক ধরনের সহজ সম্পর্ক ছিল তাদের।
সেই দিন সকালে শিমুল বলেছিল,
“বুবু, আজ স্কুল থেকে এসে তোমাকে নিয়ে মোহনপুরের মেলায় যাব।”
কথাটা তখন খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। পরে বুঝতে কষ্ট হয়—কোনো কোনো সাধারণ বাক্য আসলে আর সাধারণ থাকে না।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। শিমুলের ফেরার সময় হয়ে এসেছে। পারুলের ভেতরে অকারণ এক অস্থিরতা জমছিল, যেটার কোনো যুক্তি সে তখন খুঁজে পায়নি।
এরপরই সেই দৃশ্য, যা মনে থেকে যায়।
বাড়ির সামনে কিছু মানুষ। প্রথমে অস্পষ্ট, পরে স্পষ্ট। তারা শিমুলকে ধরে নিয়ে আসছে। সে তখনও হাসছে। বলছে,
“আমার কিছু হয়নি, কুকুরে একটু কামড় দিয়েছে।”
কিন্তু পায়ে রক্ত।
পারুল ছুটে গিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করে, স্যাভলন দেয়। রক্ত কিছুটা থামে, কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা থামে না। এর মধ্যেই খবর পৌঁছে যায় বাবার কাছে।
পরদিন বাবা আসে। শিমুলকে নিয়ে যাওয়া হয় গঞ্জের হাসপাতালে। প্রায় ছাব্বিশ ঘণ্টা দেরি হয়ে গেছে। ডাক্তার প্রথম ইনজেকশন দেন, কিন্তু কণ্ঠে একটা দ্বিধা ছিল—সবকিছু ঠিকমতো এগোচ্ছে কি না, সেটা যেন তিনিও নিশ্চিত নন।
বাড়ি ফেরার দিনও আষাঢ় ছিল। বৃষ্টি থামেনি। বরং আরও ঘন হয়েছে। আকাশটাকে তখন শোকের মতো মনে হচ্ছিল, যদিও সেটা বলা কঠিন।
এরপর শিমুলের শরীর বদলাতে শুরু করে।
দুই-তিন দিনের মধ্যে জ্বর আসে। শুরুতে সাধারণ মনে হলেও দ্রুত পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। শিমুল অস্বস্তি বোধ করে, মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে। পারুল তার পাশে থাকে সবসময়। হাত ধরে রাখা, মাথায় জল দেওয়া—সবকিছুই সে করছে, যেন এতে কিছুটা হলেও স্থিরতা ফিরে আসে।
একসময় শিমুল বলে ওঠে,
“বুবু… গলায় খুব ব্যথা করছে… পানি গিলতে পারছি না।”
পানি দিলে সে ভয় পায়, আবার পানি ছাড়া থাকতে পারে না। শরীরের ভেতরে একটা অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
ডাক্তার জানান, জলাতঙ্কের আশঙ্কা আছে। চিকিৎসা কতটা কাজ করবে—তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এরপর ঘরটা বদলে যায়।
শিমুলের মুখ দিয়ে লালা ঝরতে থাকে, শ্বাস দ্রুত হয়, চোখ স্থির। সেই চোখে ভয় নেই, আছে এক ধরনের বিভ্রান্তি। বাইরে বৃষ্টি চলছে, আর ভেতরে সময় যেন আলাদা করে ভেঙে পড়ছে।
রাত গভীর হলে শিমুল অস্থির হয়ে ওঠে। কখনো পানি চায়, কখনো পানির নাম শুনলেই ভয় পায়। বারবার শুধু একটাই শব্দ—
“পানি…”
শেষের দিকে শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসে। শব্দ কমে যায়। নড়াচড়া থেমে যায়। একসময় সবকিছু স্থির।
শিমুল আর নেই।
পরদিন সকালেও বৃষ্টি থামে না। যেন পৃথিবী জানেই না কী ঘটেছে। সাদা কাপড়ে মোড়ানো শরীর নিয়ে সবাই দাঁড়িয়ে থাকে। কবর দেওয়ার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত গ্রামের উঁচু ঢিবির মতো একটা জায়গায় তাকে রাখা হয়—যেখানে পানি থামে না, তবুও সেটাই শেষ ঠিকানা হয়ে যায়।
পারুল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
তার সামনে শুধু বৃষ্টি। আর ভেতরে একটা প্রশ্ন, যার কোনো সহজ উত্তর নেই—যে ছেলেটা পানিকে ভয় পেত, তার শেষ ঠিকানা কি তাহলে এটাই ছিল?
আজও আষাঢ় এলে পারুল জানালার পাশে দাঁড়ায়। বাইরে থেমে না-থাকা বৃষ্টি দেখে তার মনে হয়, শিমুল কোথাও নেই—আবার কোথাও আছেও। পানি, শব্দ, গন্ধ—সবকিছুই তাকে মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।
শুধু আষাঢ়ের বৃষ্টি নেমে যেতে থাকে—নিঃশব্দে, অবিরাম।
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০২, ২০২৬
আষাঢ় এলে আকাশটা এমনিতেই ভারী হয়। কিন্তু এবার ভারের মধ্যে এক ধরনের দীর্ঘায়িত নীরবতা আছে, যেন মেঘগুলোও ঠিক করে উঠতে পারছে না—কীভাবে ঝরবে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ পড়ছে অনবরত, একঘেয়ে নয়, বরং ভাঙা ভাঙা ছন্দে। মনে হয় সময় নিজেই কোথাও থেমে থেমে হাঁটছে। চারপাশে সবুজ আছে, তবে সেটা স্থির নয়—ভেজা, চাপা, একটু ক্লান্ত।
নদীর দিকে তাকালে মনে হয় সে আর নিজের সীমার ভেতরে থাকতে চাইছে না। জল উপচে পড়ছে, কিন্তু সেই উপচে পড়া শুধু পানির নয়—একটা ধীর পরিবর্তনের মতো, যা ধরা যায় না কিন্তু দেখা যায়। ডোবা, খাল, মাঠ একে অন্যের ভেতর মিশে যাচ্ছে। আলাদা করে চেনার চেষ্টা করলেও গুলিয়ে যায়। কোথাও হেলেঞ্চা, কোথাও কলমিলতা—এরা ভেসে আছে ঠিকই, কিন্তু মনে হয় তারা পরিস্থিতিটাকেই মেনে নিয়েছে। কেয়া, কদম, কামিনী, জুঁই, গন্ধরাজ—সব গন্ধ একসঙ্গে বাতাসে জমে গিয়ে এক অচেনা ভার তৈরি করছে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পারুল। গ্রিলটা কপালে ঠেকানো, কিন্তু তার মন কোথায় দাঁড়িয়ে—ঘরের ভেতরে নাকি অন্য কোনো সময়ের ভেতরে—তা আলাদা করে বোঝা যায় না। বাইরে বৃষ্টি চলছে, কিন্তু তার দৃষ্টির ভেতরেও যেন অন্য এক আষাঢ় নামছে।
পারুল আর শিমুল—দুই ভাইবোন। পারুল এখন উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী, শিমুল ছিল ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।
গত বছরের এই আষাঢ়েই শিমুল আর ফিরে আসেনি।
শিমুল ছিল অস্থির, দৌড়ঝাঁপে ভরা এক শিশু। তার উপস্থিতি ঘরে কোনো ভার তৈরি করত না, বরং অদ্ভুতভাবে হালকা করে দিত। পারুল তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছে—ঝগড়া, হাসি, খুনসুটি—সব মিলিয়ে এক ধরনের সহজ সম্পর্ক ছিল তাদের।
সেই দিন সকালে শিমুল বলেছিল,
“বুবু, আজ স্কুল থেকে এসে তোমাকে নিয়ে মোহনপুরের মেলায় যাব।”
কথাটা তখন খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। পরে বুঝতে কষ্ট হয়—কোনো কোনো সাধারণ বাক্য আসলে আর সাধারণ থাকে না।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। শিমুলের ফেরার সময় হয়ে এসেছে। পারুলের ভেতরে অকারণ এক অস্থিরতা জমছিল, যেটার কোনো যুক্তি সে তখন খুঁজে পায়নি।
এরপরই সেই দৃশ্য, যা মনে থেকে যায়।
বাড়ির সামনে কিছু মানুষ। প্রথমে অস্পষ্ট, পরে স্পষ্ট। তারা শিমুলকে ধরে নিয়ে আসছে। সে তখনও হাসছে। বলছে,
“আমার কিছু হয়নি, কুকুরে একটু কামড় দিয়েছে।”
কিন্তু পায়ে রক্ত।
পারুল ছুটে গিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করে, স্যাভলন দেয়। রক্ত কিছুটা থামে, কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা থামে না। এর মধ্যেই খবর পৌঁছে যায় বাবার কাছে।
পরদিন বাবা আসে। শিমুলকে নিয়ে যাওয়া হয় গঞ্জের হাসপাতালে। প্রায় ছাব্বিশ ঘণ্টা দেরি হয়ে গেছে। ডাক্তার প্রথম ইনজেকশন দেন, কিন্তু কণ্ঠে একটা দ্বিধা ছিল—সবকিছু ঠিকমতো এগোচ্ছে কি না, সেটা যেন তিনিও নিশ্চিত নন।
বাড়ি ফেরার দিনও আষাঢ় ছিল। বৃষ্টি থামেনি। বরং আরও ঘন হয়েছে। আকাশটাকে তখন শোকের মতো মনে হচ্ছিল, যদিও সেটা বলা কঠিন।
এরপর শিমুলের শরীর বদলাতে শুরু করে।
দুই-তিন দিনের মধ্যে জ্বর আসে। শুরুতে সাধারণ মনে হলেও দ্রুত পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। শিমুল অস্বস্তি বোধ করে, মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে। পারুল তার পাশে থাকে সবসময়। হাত ধরে রাখা, মাথায় জল দেওয়া—সবকিছুই সে করছে, যেন এতে কিছুটা হলেও স্থিরতা ফিরে আসে।
একসময় শিমুল বলে ওঠে,
“বুবু… গলায় খুব ব্যথা করছে… পানি গিলতে পারছি না।”
পানি দিলে সে ভয় পায়, আবার পানি ছাড়া থাকতে পারে না। শরীরের ভেতরে একটা অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
ডাক্তার জানান, জলাতঙ্কের আশঙ্কা আছে। চিকিৎসা কতটা কাজ করবে—তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এরপর ঘরটা বদলে যায়।
শিমুলের মুখ দিয়ে লালা ঝরতে থাকে, শ্বাস দ্রুত হয়, চোখ স্থির। সেই চোখে ভয় নেই, আছে এক ধরনের বিভ্রান্তি। বাইরে বৃষ্টি চলছে, আর ভেতরে সময় যেন আলাদা করে ভেঙে পড়ছে।
রাত গভীর হলে শিমুল অস্থির হয়ে ওঠে। কখনো পানি চায়, কখনো পানির নাম শুনলেই ভয় পায়। বারবার শুধু একটাই শব্দ—
“পানি…”
শেষের দিকে শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসে। শব্দ কমে যায়। নড়াচড়া থেমে যায়। একসময় সবকিছু স্থির।
শিমুল আর নেই।
পরদিন সকালেও বৃষ্টি থামে না। যেন পৃথিবী জানেই না কী ঘটেছে। সাদা কাপড়ে মোড়ানো শরীর নিয়ে সবাই দাঁড়িয়ে থাকে। কবর দেওয়ার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত গ্রামের উঁচু ঢিবির মতো একটা জায়গায় তাকে রাখা হয়—যেখানে পানি থামে না, তবুও সেটাই শেষ ঠিকানা হয়ে যায়।
পারুল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
তার সামনে শুধু বৃষ্টি। আর ভেতরে একটা প্রশ্ন, যার কোনো সহজ উত্তর নেই—যে ছেলেটা পানিকে ভয় পেত, তার শেষ ঠিকানা কি তাহলে এটাই ছিল?
আজও আষাঢ় এলে পারুল জানালার পাশে দাঁড়ায়। বাইরে থেমে না-থাকা বৃষ্টি দেখে তার মনে হয়, শিমুল কোথাও নেই—আবার কোথাও আছেও। পানি, শব্দ, গন্ধ—সবকিছুই তাকে মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।
শুধু আষাঢ়ের বৃষ্টি নেমে যেতে থাকে—নিঃশব্দে, অবিরাম।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।