যে শব্দটা অভিক ভুলতে পারেনি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ৩০ মে , ২০২৬
দুর্ঘটনার পর অভিককে কেমন যেন অন্য মানুষ লাগত। পুরোপুরি বদলে গেছে, তা না। অফিসে যেত, কথা বলত, মেসেজের উত্তরও দিত। বাইরে থেকে দেখলে ঠিকই লাগত। কিন্তু কাছের মানুষ বুঝত, ওর ভেতরে কিছু একটা ঠিক জায়গায় নেই। সব সময় কেমন টেনশনে থাকা মানুষদের যেমন লাগে, তেমন। হঠাৎ একটু জোরে শব্দ হলেই চমকে উঠত।
ঘটনাটা হয়েছিল তিন মাস আগে।
সেদিন রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল হালকা। রাস্তা পিচ্ছিল ছিল। অভিক বাসায় ফিরছিল। একটা মোড় ঘোরার সময় হঠাৎ সামনে ট্রাকটা আসে। তারপর শুধু শব্দ। খুব বাজে একটা শব্দ। লোহা চাপা পড়ার মতো। কাঁচ একসঙ্গে ভাঙলে যেমন হয়।
অভিক পরে বলেছিল, পুরো জিনিসটা কয়েক সেকেন্ডের ছিল হয়তো, কিন্তু তার কাছে মনে হয়েছিল অনেকক্ষণ ধরে হচ্ছে সবকিছু।
জ্ঞান ফেরার পর সে হাসপাতালে। হাতে ব্যান্ডেজ, মাথায় সেলাই। ডাক্তার বলেছিলেন, “অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন।”
এরপর কয়েক দিন সবাই একই কথা বলেছে।
“ভাগ্য ভালো ছিল।”
“বেঁচে গেছিস, এটাই বড় কথা।”
অভিকও মাথা নেড়ে হাসত একটু। ওই ধরনের হাসি, মানুষ যখন বুঝতে পারে না কী বলা উচিত, তখন যেমন দেয়।
কারণ আসল সমস্যাটা অন্য জায়গায় ছিল।
বাসায় ফেরার পর থেকেই তার ঘুম কমে যায়। রাতে চোখ বন্ধ করলেই সেই শব্দটা মাথায় ফিরে আসত।
ধাম।
তারপর বুক ধড়ফড়। কয়েকবার এমনও হয়েছে, ঘুম থেকে উঠে সে কিছুক্ষণ বুঝতেই পারেনি সে হাসপাতালে না বাসায়।
একদিন রাতের দিকে তার মা উঠে দেখে, ড্রইংরুমের লাইট জ্বালানো। অভিক সোফায় বসে আছে। টিভি বন্ধ। ফোনও হাতে নেই। শুধু বসে ছিল।
মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ঘুমাসনি?”
সে বলেছিল, “ঘুম আসতেছে না।”
এইটুকুই।
বাকি কথাগুলো আর বলেনি। যে চোখ বন্ধ করলেই তার মনে হয় ট্রাকটা আবার সামনে চলে আসছে। যে এখন হঠাৎ ব্রেকের শব্দ শুনলে তার বুক কেঁপে ওঠে। যে সে এখন আর গাড়ির সামনে বসতে পারে না।
অফিসে যাওয়ার সময় একটা মোড় এলেই তার ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে যেত। নিজেও বুঝিয়ে বলতে পারত না ঠিক।
একদিন রিকশাওয়ালা হঠাৎ ব্রেক করেছিল। অভিক এমনভাবে চমকে উঠেছিল যে পাশের লোক তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। এই জিনিসটাই পরে তাকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলত। নিজের কাছেই নিজেকে অস্বাভাবিক লাগা। কারণ আশেপাশের সবাই স্বাভাবিক। শুধু সে না।
দুর্ঘটনার পর মানুষ শরীরের আঘাত দেখে। মাথার সেলাই দেখে। হাতে কাটা দাগ দেখে। কিন্তু কিছু ভয় ভেতরে থেকে যায়। ওগুলো কাউকে দেখানোও যায় না ঠিকমতো।
বন্ধুরা কয়েকবার তাকে রাতে বের হতে বলেছিল। সে যায়নি। আগে লং ড্রাইভ খুব পছন্দ করত। এখন সন্ধ্যার পর বের হলেই অস্বস্তি লাগত।
একদিন রাহাত বিরক্ত হয়েই বলেছিল, “তুই এখনও ওই জিনিসটা নিয়ে পড়ে আছিস?”
অভিক তখন একটু হেসেছিল। অস্বস্তির হাসি।
কারণ সে নিজেও বুঝতে পারছিল না, এত দিন পরও ভয়টা যাচ্ছে না কেন। দুর্ঘটনা তো শেষ হয়ে গেছে। তাহলে শরীর ঠিক হয়ে যাওয়ার পরও মাথার ভেতর ওই রাতটা আটকে আছে কেন?
একদিন অফিসে কাজ করার সময় নিচে হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। কী একটা পড়েছিল হয়তো। অভিক এত জোরে চমকে উঠল যে হাত থেকে মগ পড়ে ভেঙে যায়।
পুরো অফিস তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
ওর তখন মনে হচ্ছিল, সবাই ভাবছে সে বাড়াবাড়ি করছে। কিন্তু সত্যি বলতে, তার বুক তখন এমনভাবে কাঁপছিল যে কথা বলতেও অস্বস্তি হচ্ছিল।
সেদিন বাসায় ফিরে সে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। তারপর প্রথমবার গুগলে সার্চ করেছিল, “দুর্ঘটনার পরে বারবার ভয় লাগা।”
সেখান থেকেই প্রথম বুঝতে পারে, শুধু শরীর না, ভয়ও আঘাত পায়। আর কিছু ভয় সহজে যায় না।
পরে একদিন সে কাউন্সেলরের কাছে যায়। প্রথম দিন খুব বেশি কথা বলেনি।
শুধু বলেছিল, “আমি ঠিক আছি। আবার ঠিকও নাই।”
কাউন্সেলর তাকে থামাননি। “এত ভাবছেন কেন” টাইপ কিছু বলেননি। এই জিনিসটাই অভিকের কাছে অদ্ভুত লেগেছিল। কারণ এত দিন সবাই তাকে বোঝাতে চেয়েছে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু কেউ আসলে জানতে চায়নি, সে এখনও এত ভয় পায় কেন।
ধীরে ধীরে সে কথা বলা শুরু করে। সেই রাতটা নিয়ে। ঘুম ভেঙে যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে। হঠাৎ শব্দ শুনলে বুক ধক করে ওঠা নিয়ে।
সবকিছু একদিনে ঠিক হয়নি। এখনও মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ওই শব্দটা কানে বাজে।
ধাম।
তারপরও একটা জিনিস বদলেছে। এখন অন্তত সে জানে, সে পাগল হয়ে যাচ্ছে না। সে শুধু একটা ভয়ংকর ঘটনার ভেতর দিয়ে গেছে।
আর কিছু ঘটনা মানুষ পার হয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি পেছনে ফেলে আসতে পারে না।
#ছোটগল্প #মানসিকস্বাস্থ্য #আতঙ্ক #ট্রমা #বাংলালেখা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।