যেখানে মনটা একটু থাকে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অভিক জানালার পাশে বসে ছিল।
নিচের রাস্তার ফলওয়ালাটা আজ অনেকক্ষণ ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। ঝুড়িতে কয়েকটা পেয়ারা, দুটো ডাব আর কিছু কলা। লোকজন যাচ্ছে, কেউ থামছে না। অভিক দেখছিল। কেন দেখছে, সে নিজেও জানে না।
নিশি রান্নাঘর থেকে এসে একবার তাকিয়ে আবার চলে গেল। এই দৃশ্যটা ইদানীং প্রায় প্রতিদিনই দেখতে হয় তাকে। অফিস থেকে ফিরে জামা বদলায়, চুপচাপ খায়, তারপর জানালার পাশে বসে থাকে। টেলিভিশন চলে, ফোনে কয়েকটা বার্তা আসে, তবু অভিকের যেন কোনো কিছুর সঙ্গে সম্পর্ক নেই।
এক রাতে খাওয়ার পর নিশি বলল, “তোমার কী হয়েছে?”
অভিক গ্লাসে পানি ঢালছিল। হাতটা থেমে গেল।
“কিছু না।”
“কিছু না হলে মানুষ রাতের খাবার ঠান্ডা করে বসে থাকে?”
অভিক গ্লাসটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
নিশি বলল, “অফিসে কিছু হয়েছে?”
“না।”
“কারও সঙ্গে ঝামেলা?”
“না।”
“আমার সঙ্গে?”
অভিক এবার তাকাল।
“তোমার সঙ্গে কেন হবে?”
“জানি না। আজকাল তোমাকে দেখে মনে হয়, তুমি কোথাও নেই।”
অভিক কিছু বলল না।
তারপর আস্তে বলল, “মাঝে মাঝে অফিসের লিফটে উঠতে ইচ্ছে করে না।”
নিশি চুপ করে শুনল।
“কাজ খারাপ লাগে?”
“না।”
“মানুষ?”
“তাও না।”
“তাহলে?”
অভিক গ্লাসের ভেতর তাকিয়ে রইল।
“লিফটটা যখন ছয়তলায় গিয়ে থামে, মনে হয় আবার নামতে হবে। আবার সেই ঘর, সেই কম্পিউটার, সেই কাজ। কোনো কিছুই খারাপ না। তবু ভালো লাগে না।”
নিশি আর প্রশ্ন করল না।
পরদিন সকালে সে বলল, “আমার সঙ্গে বের হবে?”
“কোথায়?”
“একটা জায়গায়।”
“কত দূর?”
“তুমি বেশি প্রশ্ন করলে দূরটা বাড়বে।”
অভিক হেসে ফেলল।
সকাল আটটার দিকে তারা বের হলো।
শহর পার হতে সময় লাগল। প্রথমে যানজট, বাসের হর্ন, ধোঁয়া। তারপর বড় বড় ভবন কমে এল। দোকানপাট ফুরিয়ে গেল। রাস্তার পাশে গাছ বাড়তে লাগল। কোথাও ধানের জমি, কোথাও পুকুর।
অভিক গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দিল।
বাতাসটা মুখে লাগতেই সে চোখ বন্ধ করল।
নিশি তাকিয়ে বলল, “ঘুমিয়ে পড়ো না।”
“ঘুম আসছে না।”
“তাহলে?”
“বাতাস শুনছি।”
নিশি হেসে ফেলল।
একটু পর গাড়ি থামল।
সামনে বড় একটা মাঠ। একপাশে কয়েকটা পুরোনো গাছ, অন্য পাশে সরু খাল। পানিতে কচুরিপানা। দূরে একজন কৃষক কাঁধে কোদাল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
নিশি গাছের নিচে গিয়ে বসল।
অভিক দাঁড়িয়ে রইল।
“বসো।”
“এখানে?”
“না, ঢাকায় গিয়ে বসো।”
অভিক হেসে তার পাশে বসল।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
শহরে নীরবতা মানে যেন কিছু একটা কমে যাওয়া। এখানে নীরবতার মধ্যেও কত শব্দ। পাতার নড়াচড়া, পাখির ডাক, খালের পানি, দূরের মানুষের কথা।
অভিক ঘাসের ওপর হাত রাখল।
“জায়গাটা সুন্দর।”
“আমি জানি।”
“আগে এসেছ?”
“অনেকবার।”
“একাই?”
নিশি মাথা নেড়ে বলল, “হুম।”
“আমাকে ছাড়া?”
“তখন তো তুমি জানতেই না।”
অভিক তার দিকে তাকাল।
“এটা তোমার জায়গা?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
নিশি একটু চুপ করে বলল, “এখানে আমার মনটা একটু থাকে।”
অভিক কিছু বলল না।
শুধু সামনে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর নিশি ব্যাগ থেকে বিস্কুট বের করে একটা তার হাতে দিল।
অভিক বিস্কুটে কামড় দিয়ে মুখ কুঁচকে বলল, “এগুলো এত শুকনো কেন?”
“তোমার মুখের মতো।”
“আমার মুখ শুকনো?”
“সকাল থেকে।”
অভিক হেসে ফেলল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। তারা কখনো কথা বলল, কখনো চুপ করে থাকল। কোনো বড় কথা নয়। অফিসের গল্প, পাশের বাসার বিড়াল, বাজারে আলুর দাম—এমন সব কথা, যেগুলোর কোনো গুরুত্ব নেই।
তবু সময়টা কেটে গেল।
বিকেলের রোদ নরম হয়ে এলে অভিক উঠে দাঁড়াল।
“চলো হাঁটি।”
দুজন মাঠের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল।
কিছুদূর গিয়ে অভিক বলল, “নিশি।”
“হুম?”
“কালও আসবে?”
নিশি অবাক হয়ে তাকাল।
“কাল?”
“হ্যাঁ।”
“কাল তো তোমার অফিস।”
অভিক একটু হেসে বলল, “জানি।”
“তাহলে?”
“অফিস থেকে ফিরে আসা যাবে?”
নিশি কিছু বলল না।
শুধু হাঁটতে হাঁটতে তার হাতটা ধরল।
ফেরার সময় সূর্য ডুবে গেছে।
শহর আবার সামনে এসে পড়েছে। গাড়ির হর্ন, ধুলো, আলো, মানুষের ভিড়—সব আগের মতো।
বাড়িতে এসে অভিক জামা বদলাল। নিশি রান্নাঘরে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখল, অভিক আবার জানালার পাশে বসেছে।
সেই একই জানালা। একই রাস্তা। একই ব্যস্ত শহর।
শুধু আজ অভিক জানালাটা খুলে দিয়েছে।
বাইরের বাতাস ঘরে ঢুকছে।
অভিক চুপ করে বসে আছে।
নিশি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর আর কিছু না বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।