নীরব যোদ্ধাUpload failed: [object Object]
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। মার্চ ৮, ২০২৬
প্রায়ই মনে হয়, জীবনানন্দ দাশ হয়তো তোমাকে দেখেই সেই কবিতা লিখেছিলেন। চুলের ওই অন্ধকার, চোখের নিথর গভীরতা—যেন এক বিদিশার নিশা। কিন্তু তুমি তো কোনো কবিতা নও, আমাদের পাড়ারই মেয়ে। যে রোজ সকালে হাতে এগোছা নোটবই নিয়ে ছুটত, আর বৃষ্টি এলে ছাতা মাথায় তুলতে ভুলে যেতে।
প্রথম দেখাটা মনে আছে? ২০১৪ সাল, বর্ষার এক ভেজা দুপুর। কলেজের পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলে। শাড়ির আঁচল ভিজে একদম শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। তবুও হাসছিলে। ওই বৃষ্টিভেজা হাসিটুকু দেখেই ভেবেছিলাম, একদম সাধারণ একটা মেয়ে। হয়তো জীবনটাও ওর মতোই সহজ হবে।
আমার ভুলটা বুঝতে পারলাম বিয়ের পর। বাস্তবটা ছিল ভিন্ন।
সংসারের নিয়মকানুন শিখতে শিখতে তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেললে না, বরং নিজেকে বদলে ফেললে। সকালে আমি যখন ঘুমের ঘোরে, তখন তোমার দিন শুরু হয়ে অনেক আগেই—রান্নাঘরে, ঝাড়ু দিয়ে, অফিসের ব্যাগ গুছিয়ে। একদিন ভোররাতে ঘুম ভেঙে দেখি, টেবিল ল্যাম্পের নিচূ আলোয় বসে পড়ছ। পরদিন পরীক্ষা। চোখের নিচে কালো দাগ, কিন্তু মুখটা যেন অন্য কোনো চিন্তায় মুখর।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "এখনো ঘুমাওনি?"
তুমি একটু হাসলে, বললে, "সময় পাচ্ছি না।"
ওই হাসিটা দেখে মনে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো হয়তো ভুল ছিল না। বাইরে হাসির ছটা থাকলেও ভিতরে কতটা জল জমে, সেটা শুধু ওই চোখই জানে। তবে তুমি সেই জল কখনো আমাকে দেখাওনি। সব চেপে রেখেছ, একা।
দুই বছর পর আমাদের সন্তান হলো। ওই সময়টা আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। আমার তখন চাকরি নেই। তুমি একাই সংসার আর অফিসের বোঝা টানছ। একরাতে ঘুম ভেঙে দেখি, তুমি বাথরুমের ঠান্ডা মেঝেতে বসে কাঁদছ। পা দুটো ফুলে গেছে, আর বুকটা কান্নায় টলমল করছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম দরজার ওপাশে। ভেতরে ঢোকার সাহস পেলাম না। কিন্তু সকালে উঠে দেখলাম, সেই মেয়েটি আবার হাসিমুখে অফিসের জন্য রেডি হচ্ছে। যেন রাতের ওই দৃশ্যই ছিল না।
তখন মনে হয়েছিল, তুমি হয়তো 'পথের পাঁচালী'র দুর্গা নও। দুর্গা বা অপুরা ছিল কাহিনীর মেয়ে, তারা বেঁচে ছিল কল্পনার ভুবনে। তুমি বাস্তবের যোদ্ধা। সমরেশ বসুর দীপার মতো নিজের ভাগ্য নিজেই লিখছ। তবে দীপা বিদ্রোহ করেছিল, আর তুমি চুপচাপ সহ্য করে যাচ্ছ।
গত বছর তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লে। ডাক্তার বলল, শরীরের বিশ্রাম দরকার। তুমি দুদিন শুয়ে রইলে। তৃতীয় দিনই আবার কাজে লেগে গেলে। আমার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলে, "বসে থাকলে শরীরের চেয়ে মনটা বেশি অসুস্থ হয়।"
এখনো তুমি একা লড়ছ। আমি পাশে আছি বললেও, লড়াইয়ের মূল ভার তোমার। দারিদ্র্য, অসুখ, সমাজের নানা প্রশ্ন—সবকিছুর মোকাবিলা তুমি একা করছ। আর আমি? আমি হয়তো একজন নিরীক্ষক মাত্র।
আমার কাছে এখন দেবার মতো বড় কিছু নেই। টাকা নেই, সময় নেই, কোনো চমকপ্রদ উপহারও নেই। তবুও এই লেখাটা—আমার অক্ষমতার কথা, আমার হারিয়ে যাওয়ার কথা—শুধুমাত্র তোমাকে বলার জন্য।
যদি কখনো ক্লান্ত লাগে, একা মনে হয়, তখন মনে রেখো—আমি আছি। জীবনের শেষ দৃশ্য পর্যন্ত। হয়তো সামনে থেকে নয়, তবে নীরবে পেছনে থেকে সর্বদা।
(বিঃদ্রঃ: ৮ই মার্চ, বিশ্ব নারী দিবসে আমার স্ত্রীকে—যে আমার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।