দুঃখ–সুখের সমান্তরাল রেখাUpload failed: [object Object]
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০৪, ২০২৬
দুঃখ আর সুখকে আমরা প্রায়ই আলাদা দুই প্রান্ত হিসেবে ভাবি। এক পাশে আলো, অন্য পাশে ছায়া—এই সহজ বিভাজনটা শিখে বড় হই আমরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সরল রেখাটা আর ঠিক থাকে না। কোথায় যেন দুটো অনুভূতি পাশাপাশি চলতে শুরু করে, কখনো দূরে সরে যায়, আবার অদ্ভুতভাবে কাছাকাছিও আসে। “দুঃখ–সুখের অঙ্কে সব সময় সমান্তরাল”—এই ধারণাটা তাই কোনো সূত্র না, বরং জীবনের ভেতরের এক ধরনের অস্বস্তিকর সত্যের ইঙ্গিত।
দুঃখ আর সুখকে যদি রেখার মতো কল্পনা করা হয়, তাহলে দেখা যায় তারা আলাদা পথে চলে না। একই অভিজ্ঞতার ভেতরেই তাদের উপস্থিতি বদলাতে থাকে। যে মুহূর্তটা একসময় আনন্দ হিসেবে ধরা পড়ে, তার ভেতরেই হয়তো পরে গিয়ে একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়—যেটাকে তখন দুঃখ বলে মনে হয়। আবার কোনো কষ্টের মুহূর্তও হঠাৎ করে এমন একটা উপলব্ধি রেখে যায়, যেটা সরাসরি সুখ না হলেও গ্রহণযোগ্যতার মতো কিছু এনে দেয়। এই পরিবর্তনগুলোকে সবসময় সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না; অনেক সময় মনে হয়, আমরা ঘটনাগুলোর ভেতরে অর্থ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করি, বাস্তবতা যতটা পরিষ্কার, তার চেয়ে বেশি।
সুখকে আমরা স্থায়ী কিছু ভাবতে চাই। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, তা ততটা স্থির নয়। কোনো আনন্দের মুহূর্ত শেষ হওয়ার পর যে নীরবতা তৈরি হয়, সেটাকে ঠিক দুঃখ বলা যায় না, আবার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষও মনে হয় না। সেখানে একটা ফাঁক থাকে—যেটা সময়ের সঙ্গে অন্য কোনো অনুভূতিতে রূপ নেয়। মনে হয়, সুখ নিজে কখনো আলাদা অবস্থান না, বরং পরিবর্তনের ভেতরেই তার অস্তিত্ব।
দুঃখকেও শুধু নেতিবাচক হিসেবে দেখলে পুরো ছবি ধরা পড়ে না। অনেক সময় দীর্ঘ কষ্ট মানুষকে নিজের চিন্তাকে নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করে। সব দুঃখ একই রকম নয়, আর সব দুঃখের অর্থও এক নয়। কিছু কষ্ট কেবল ভেঙে দেয়, আবার কিছু কষ্ট ভাঙনের ভেতরেই নতুনভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করে—এটা হয়তো সবসময় তখন বোঝা যায় না, পরে বোঝা যায়।
এই দুই অনুভূতির মধ্যে যে ভারসাম্যের কথা বলা হয়, সেটাও স্থির কিছু নয়। কখনো সুখ দীর্ঘ সময় থাকে, কখনো দুঃখ অনেক বেশি জায়গা জুড়ে থাকে। এই ওঠানামা দেখে মনে হয়, জীবন কোনো স্থির রেখা না—বরং এমন একটা প্রবাহ, যেখানে অবস্থান সবসময় বদলাতে থাকে।
আমরা প্রায়ই জীবনের ঘটনাগুলোকে সরল কারণ–ফলাফলের কাঠামোয় বুঝতে চাই। কিন্তু দুঃখ আর সুখ অনেক সময় সেই কাঠামোর বাইরে কাজ করে। একটি সুখের ঘটনা একই সঙ্গে চাপও তৈরি করতে পারে, আবার একটি দুঃখের ঘটনা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তকে সহজও করে দিতে পারে। ফলে তাদেরকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমান্তরাল প্রবাহ বোঝার জন্য জীবনকে স্থির কিছু না ভেবে চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা দরকার। এখানে প্রতিটি মুহূর্ত আগেরটির সরাসরি প্রতিফলন না হলেও তার সঙ্গে সম্পর্কহীনও নয়। সম্পর্কটা সরল না, কিন্তু আছে—এইটুকুই হয়তো বাস্তবতা।
এই সহাবস্থান মানুষের ভেতরে কিছু পরিবর্তন আনে বলে মনে হয়। সবকিছু একসাথে পরিষ্কার হয় না, তাই থামতে হয়, আবার ভাবতে হয়। অনেক সময় দ্রুত উত্তর না পাওয়ার অভ্যাসটাই ধীরে ধীরে মানুষকে নিজের ভেতরের জটিলতা বুঝতে সাহায্য করে।
শেষ পর্যন্ত এই সমান্তরালতা কোনো সমাধান দেয় না। বরং একটা প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কোন অভিজ্ঞতাকে কীভাবে দেখি, সেটাই কি তার অর্থ তৈরি করে, নাকি অর্থ আগেই নির্ধারিত থাকে? “দুঃখ–সুখের অঙ্কে সব সময় সমান্তরাল”—এই ধারণা তাই কোনো শেষ কথা নয়, বরং জীবনের ভেতরে চলতে থাকা এক ধরনের পর্যবেক্ষণ মাত্র।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।