আলো নিভে যাওয়ার আগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৭ জুন, ২০২৬
সন্ধ্যা নামতেই আলোটা নিভে গেল। ফ্যানটা থেমে গেল হঠাৎ, ঘরটা থম মেরে গেল এক মুহূর্তে। অভিক প্রথমে ভাবল, লোডশেডিং। রোজকার ব্যাপার।
জানালার কাছে গিয়ে দেখল, পাশের সব বাড়িতেই আলো জ্বলছে। টিভির শব্দ আসছে, কারও ঘরে ফ্যান ঘুরছে। শুধু তাদের ঘরটাই অন্ধকার। গুমোট।
দুপুরে বিদ্যুতের অফিস থেকে লোক এসেছিল। খাতা হাতে। বিল না দিলে লাইন কেটে দেবে—বলে গিয়েছিল। তিন মাসের বাকি। অভিক তখন শুধু মাথা নেড়েছিল। পকেটে সাতাশ টাকা ছিল। বলার মতো কিছু ছিল না।
নিশি রান্নাঘর থেকে একটা মোমবাতি এনে জ্বালাল। শেষ মোম, দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে ধরাতে গিয়ে দুবার নিভে গেল। মায়া হাততালি দিয়ে উঠল।
“আজ মোম জ্বালিয়ে খাব?”
অভিক হেসে বলল, “হ্যাঁ, আজ তাই।” হাসিটা গলায় আটকে গেল একটু।
ভাত, ডাল আর আলুভর্তা। পাতের পাশে একটা কাঁচা মরিচ। তিনজন মোমের আলোয় বসে খেতে লাগল। ছায়াগুলো দেয়ালে কাঁপছে, লম্বা হচ্ছে।
হঠাৎ মায়া জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আলো কবে আসবে?”
অভিক চুপ করে রইল। ডালের বাটিতে আঙুল ডুবিয়ে রেখেছে।
নিশি বলল, “শিগগিরই আসবে।”
মায়া মাথা নেড়ে আবার খাওয়ায় মন দিল। বাচ্চাদের বিশ্বাস করতে সময় লাগে না।
খাওয়া শেষ করে অভিক উঠোনে এসে বসল। পাটি পাতেনি, ইটের ওপরই। আকাশভরা তারা। কালপুরুষটা স্পষ্ট দেখা যায়।
কত দিন পরে এভাবে আকাশের দিকে তাকাল, মনে করতে পারল না। হয়তো বছর। শহরে তারা দেখা যায় না সাধারণত।
নিশি এসে পাশে বসল। পায়ের কাছে মশা উড়ছে। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। নীরবতাটা অস্বস্তির না, ক্লান্তির।
তারপর নিশি বলল, “মনে আছে? বিয়ের পর প্রথম বাসাটায় প্রায়ই বিদ্যুৎ থাকত না। টিনের চাল, গরমে ঘুম আসত না।”
অভিক হেসে ফেলল। শব্দ করে। “তখন অন্ধকার নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না। ছাদে উঠে গল্প করতাম।”
নিশি আস্তে বলল, “তখন আমরা একসঙ্গে ছিলাম। এখনো তো আছি।”
অভিক কিছু বলল না। শুধু নিশির দিকে তাকিয়ে রইল। মোমের আলো জানালা দিয়ে এসে পড়েছে নিশির মুখের একপাশে। বাকিটা অন্ধকার।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে মায়া ডাকল, “বাবা, দেখো তো!”
দুজন ভেতরে গেল। মেঝেতে বসে আছে মায়া। মায়া খাতায় একটা ছবি এঁকেছে। রং পেন্সিল দিয়ে।
ছোট্ট একটা ঘর। টিনের চাল আঁকাবাঁকা। পাশে তিনজন মানুষ, হাত ধরে দাঁড়ানো। লাঠি লাঠি হাত-পা। উপরে গোল করে একটা হলুদ আলো, রশ্মি ছড়াচ্ছে চারদিকে।
অভিক হেসে বলল, “এটা কী?”
মায়া বলল, “আমাদের ঘর।”
“কিন্তু তো আলো নেই।”
মায়া টেবিলে গলে যাওয়া মোমবাতিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “এই তো আছে।”
অভিক আর কিছু বলল না। গলাটা ধরে এল। রাত বাড়ছিল।
মোমবাতিটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছিল। গলিত মোম জমছে টেবিলে। অভিক হাত বাড়িয়ে নিশির হাতটা ধরল। নিশির আঙুল ঠান্ডা, একটু খসখসে।
নিশি হাত সরিয়ে নিল না।
ঘরের ভেতর মোমের আলো তখনও জ্বলছিল। কাঁপছে। কিন্তু নিভে যায়নি এখনো।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।