ব্যস্ত মানুষের নিঃসঙ্গ মৃত্যু
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। জানুয়ারি ১০, ২০২৬
রাত পৌনে বারোটা। শহরের আলো ভেসে যায় জানালা ভেদ করে। রাহুল ডেস্কে বসে আছে, চারপাশে ফোনের নোটিফিকেশন, মেইল, টাস্ক লিস্ট। দিনের মধ্যে হাজারো মিটিং, কনফারেন্স, রিপোর্ট—সবকিছুর চাপে তার শরীর নিস্তেজ, মন ভেঙে।
সেলফোন বাজল। বার্তা পড়ে, মা লিখেছে:
“রাহুল, রাতে খেয়েছ?”
রাহুল থামল। রাতের খাবারের কথা তার মনের কোন অংশে নেই। সে শুধু টাইপ করতে থাকে:
“হ্যাঁ মা, খেয়েছি।”
কিন্তু আসলে সে খাবার খায়নি। রাতের ক্লান্তি, একাকীত্ব, বেদনা—সব মিশে যায় কেবল নীরব ইমোজি পাঠাতে।
একটা সময় ছিল, যখন রাহুলের চারপাশে মানুষ ছিল। বাবা-মা, বন্ধু, প্রিয়জন। এখন?
ফোনের পরিসংখ্যানই তার একমাত্র বন্ধু। হ্যাঁ, চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু কেউ চোখের সঙ্গে চোখ মেলায় না। কেউ বুঝে না সে একা।
কালকের মিটিং, পরশুর রিপোর্ট—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেউ বলেনি, “তুমি কেমন আছ?”
প্রতিদিন, প্রতিটি ‘হ্যাঁ’ মেনে নেওয়া দায়িত্বের বোঝা। প্রতিটি ‘না’ বলা অসম্ভব। রাহুল বেঁচে আছে কাজের জন্য, জীবনের জন্য নয়।
সপ্তাহান্তে অফিস বন্ধ, শহর নিরব। রাহুল বাড়িতে ফিরল। দরজার চাবি ঘুরল। ঘরটা ফাঁকা। রান্নাঘরের ঘড়ি টিক টিক করছে। টিক টিক শব্দটা যেন তার হৃদয়ের সঙ্গে মিলছে। তিনি বসে থাকলেন সোফায়। মনে হচ্ছে, তার চারপাশের প্রতিটি জিনিস—ফ্রেম, টেবিল, কিতাব, চেয়ার—সব তার একাকীত্বের সাক্ষী।
রাত বাড়তে থাকল। সে নিজের জীবনের হিসাব করতে লাগল। কত বছর কেটে গেছে ব্যস্ততার ছদ্মাবরণে?
কত বন্ধু এসেছে, কতই না চলে গেছে?
কতবার হাসি মুখে ভেতরে কেঁদেছে?
প্রতিটি টাস্ক, প্রতিটি ডেডলাইন, প্রতিটি মিটিং—সবই তাকে আরও নিঃসঙ্গ করে তুলেছে।
ফেসবুকের স্ট্যাটাস পড়ল,
“বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাও, জীবন একবারই আসে।”
রাহুল হেসে ফেলল। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো মানেই নতুন রিপোর্টের চাপ, মিটিংয়ের প্রস্তুতি। তাই বন্ধুত্বও এখন স্ক্রিনের ভেতর সীমাবদ্ধ।
কেন মানুষের জীবনে সময় থাকা সত্ত্বেও সম্পর্ক অদৃশ্য হয়ে যায়?
সে নিজেও বুঝতে পারছে না। পরিবার আছে, ঘর আছে, ভালোবাসা আছে। কিন্তু নিজের হৃদয় কোথায়?
সেই হৃদয় চাপা পড়ে গেছে ফোন, মেইল, কাজের চাপে।
মাঝরাতে হঠাৎ দরজায় কোন শব্দ হলো। রাহুল ঘুম ভাঙল। কেউ নেই। মনে হল, তিনি নাকি এই ঘরে একাই। একা হয়েছেন জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ত মুহূর্তে। একা হলেও দায়িত্ব টিক আছে। পরিবারের জন্য, চাকরির জন্য, সমাজের জন্য—সব কিছুর জন্য। নিজের জন্য নয়।
তিনি বুঝতে পারলেন—ব্যস্ততা যদি মানুষের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায়, তবে মৃত্যু আসে নিঃশব্দে। শারীরিক মৃত্যু নয়, বরং মানসিক, আবেগিক, আত্মার মৃত্যু।
রাতশেষে রাহুল জানালার পাশে বসে বাইরে তাকাল। শহরের আলো এখন নিঃশব্দ। মানুষ ঘুমোয়, পরিবার ঘুমোয়, কিন্তু সে এখনও কাজ করছে—নিজেকে, নিজের দায়িত্বকে বাঁচাতে। নিজের হাসি বিক্রি করেছে, নিজের আনন্দ বিলিয়েছে।
ক্লান্তি? আছে। ব্যথা? আছে।
তবে কেউ জানে না। কেউ বোঝে না।
পরিশেষে রাহুল বুঝতে পারল—ব্যস্ত জীবনের মধ্যে নিঃসঙ্গতা এমন এক সঙ্গী, যা সাথে থাকবে যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন। কিন্তু এই একাকীত্বই তাকে মানবিক করে তোলে, সমাজের জন্য দায়িত্বশীল করে তোলে।
আমরা যদি প্রতিদিন ব্যস্ততার ছদ্মাবরণে নিজের পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয়কে ভুলে যাই, তবে আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্তে কেউ থাকবে না। নিঃশব্দ মৃত্যু তখন আসে, যে মৃত্যু দেখার কেউ থাকে না।
তাই আজ, যদি আপনি রাহুলের মতো জীবন কাটান—একটু সময় বের করুন। ফোন, মেইল, মিটিং ছেড়ে আপনার চারপাশের মানুষকে দেখুন। তাদের সঙ্গে চোখ মেলান, হাসি ভাগ করুন। ব্যস্ততা জীবনের অংশ হতে পারে, তবে মানুষ হওয়া তার চেয়ে বড়।
নিঃসঙ্গ মৃত্যু এড়ানো যায় না, কিন্তু তা কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই সচেতন হোন—নিজের জন্যও, পরিবারের জন্যও, বন্ধুদের জন্যও।
কেননা নিঃশব্দ মৃত্যু নয়, সম্পর্কের মৃত্যু সবচেয়ে ভয়ংকর।
#ব্যস্তমানুষেরনিঃসঙ্গমৃত্যু #একাকীত্ব #শহুরেবিষয়কগল্প #নীরববাস্তবতা #ছোটগল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।