তবুও জীবন
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরনঃ ছোটগল্প
তারিখঃ ২২ অক্টোবর ২০২৫
গতকাল গভীর রাতে হঠাৎ বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা। মনে হলো, হৃদপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না—ব্যথা কোনোভাবেই কমছে না।
শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে ছুটে গেলাম মুগদা সরকারি হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগে। ইসিজি করার পর ডাক্তার মুখ তুলে তাকালেন, কণ্ঠটা ছিল অদ্ভুত শান্ত অথচ ভয়াবহ—
“আপনার আবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। এখনই জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে যান।”
রাতের আঁধারে সোজা ছুটলাম সেখানে। বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে, প্রতিটি শ্বাস যেন কাঁটার মতো বিঁধছে। সিসিইউতে নেওয়া হলো আমাকে।
ডাক্তাররা যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন—ইনজেকশন, অক্সিজেন, মনিটর—সব কিছুই চলছে টানা তৎপরতায়। এরপর জানালেন, এনজিওগ্রাম করতে হবে। কিন্তু সিরিয়াল দীর্ঘ, তাড়াতাড়ি করা সম্ভব নয়।
ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠলে বাধ্য হয়ে গেলাম বেসরকারি ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে। প্রফেসর ডা. লিয়াকত আলী আমাকে দেখলেন জরুরি বিভাগে।
বললেন, “আগামীকাল ভর্তি হোন, এনজিওগ্রাম করতে হবে।”
কিন্তু বাধা এলো অর্থের অভাবে। এনজিওগ্রামের আগেই যেন জীবনের হিসাব গুলিয়ে গেল। টাকাটা কীভাবে জোগাড় হলো—সে গল্প অন্য একদিন বলব।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা অবস্থায় গায়ে পরানো হলো হাসপাতালের পোশাক। মনে হচ্ছিল, যেন ফাঁসির আসামির গায়ে শেষ কাপড়টি পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবুও পাশে স্ত্রী ছিল—চোখে ভয়, মুখে দৃঢ়তা। ওর উপস্থিতিতেই নিজেকে স্থির রাখলাম।
একটু পর সেবিকারা এসে ক্যানোলা লাগাল, স্যালাইন চলছে, মুখে অক্সিজেন। মনিটরে হৃদস্পন্দনের ওঠানামা যেন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের সুর বাজাচ্ছে। ভিজিটিং সময় শেষ হলে স্ত্রীও চলে গেল। বেডে রইলাম শুধু আমি, আমার নিঃসঙ্গতা, আর হাসপাতালের সাদা দেয়াল।
বাইরে শাহবাগ মোড়ের গর্জন শুনতে পাই, কিন্তু দেখতে পাই না কিছুই। সেই শব্দগুলো যেন জীবনের বাইরে থেকে আমার বেঁচে থাকার প্রমাণ দিচ্ছে।
চোখে ভাসে প্রিয় মুখগুলো—দু’টি মেয়ে, স্ত্রী, পরিবার—সবাইকে মনে পড়ে, অথচ কাউকে ছুঁতে পারি না।
পরের দিন সকালে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে যাওয়া হলো ক্যাথল্যাবে।
দু’মেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে—চোখ দু’টি অজানা আতঙ্কে ভিজে। স্ত্রী তাকিয়ে আছে দৃঢ় মুখে, কিন্তু আমি জানি, তার বুকের ভেতর কান্না ঝড় তুলছে। আমি শুধু তাকিয়ে ছিলাম, কিছু বলিনি—কারণ চোখের ভাষা তখন অনেক গভীর হয়ে উঠেছে।
এনজিওগ্রাম শেষে ডাক্তার জানালেন ফলাফল—
“আপনার আগের বাইপাস সার্জারির সময় যে দুটি রগ লাগানো হয়েছিল, তার মাঝখানের একটি ধমনীতে ৯৮% ব্লক। তাও আবার এলইডি অংশে।”
তারপর ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করলেন—
১. যেহেতু আগে একবার ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়েছে, দ্বিতীয়বার অপারেশন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
২. আপনার হার্টের পাম্পিং বা LVEF মাত্র ৩০%; এ অবস্থায় কোনো অপারেশন ১০০% ঝুঁকিপূর্ণ।
৩. হার্টের টিস্যুগুলো অনেক দুর্বল, তাই দ্বিতীয়বার ঝুঁকি নিলেও তেমন লাভ হবে না।
৪. রিং বসানো সম্ভব নয়, কারণ আগের রিংয়ের ভেতর দিয়ে নতুন রিং নেওয়া যায় না, আর ব্লকের জায়গাটাও খুব সরু।
৫. আমাদের বোর্ডের সিদ্ধান্ত—ঔষধ দিয়েই চিকিৎসা চালাতে হবে, যদিও মাঝে মাঝে ইনজেকশন বা সিসিইউ লাগতে পারে। তবে ওষুধগুলো বেশ দামী।
ডাক্তারের কথা শুনে মনে হলো মাথার ওপরের আকাশটা ভেঙে পড়ল। সেই মুহূর্তে ‘বেঁচে থাকা’ যেন এক ধরনের বিলাসিতা।
কারণ, যদি জীবন অর্থের কাছে বন্দি হয়—তবে মৃত্যু কি মুক্তি নয়?
এনজিওগ্রাম শেষে আমাকে ফিরিয়ে আনা হলো বেডে। অচেতন দেহে ঘুম এসে ভর করল। কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না।
হঠাৎ কপালে এক শীতল ছোঁয়া। চোখ খুলে দেখি—আমার ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ছোট্ট হাতটা আমার কপালে। চোখদুটি ভিজে, হয়তো যে কোনো মুহূর্তে জল গড়িয়ে পড়বে।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম, এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মল রূপ—
শর্তহীন, শব্দহীন, অথচ অনন্ত সত্য।
মনে হলো, হৃদয়ের ভেতর নতুন করে আলো জ্বলে উঠেছে।
অন্ধকারের বুক চিরে যেন সূর্যের প্রথম রশ্মি এসে পড়েছে আমার ওপর।
হয়তো এটাই জীবনের আসল অর্থ—
বেঁচে থাকা মানে শুধু নিঃশ্বাস নয়, কারও চোখে নিজের অস্তিত্ব টের পাওয়া।
আরও একদিন হাসপাতালে থেকে সাময়িকভাবে বাসায় ফিরলাম।
ডাক্তার বললেন—বাঁচতে চাইলে নিয়মিত চেকআপে থাকতে হবে।
কিন্তু প্রতিমাসের ঔষধ আর ইনজেকশনের টাকার যোগান অসম্ভবের কাছাকাছি।
মনে হলো, হয়তো নিঃশব্দে মরে যাওয়া সহজতর।
প্রতিদিন বুকের এই অসহনীয় যন্ত্রণা, শ্বাসের এই লড়াই চলছেই…
তবুও আমি বেঁচে আছি।
কারণ বুঝেছি—
যতদিন ভালোবাসা আছে, ততদিন জীবন আছে।
#তবুওজীবন #মানুষেরগল্প #ভালোবাসাআরবেঁচে_থাকা #জীবনসংগ্রাম #মোহাম্মদজাহিদহোসেন #অনুগল্প #হৃদয়েরগল্প #জীবনেরঅর্থ #বাংলাসাহিত্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।