সমুদ্র, গমক্ষেত ও একটি অপেক্ষা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
সাহিত্যিক ছোটগল্প। ১৭ মে, ২০২৬
কফির কাপটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু অমিতা খেয়াল করেনি। সে তাকিয়ে আছে সরু মাটির পথটার দিকে।
পশ্চিম দিকের আকাশটা ধীরে ধীরে রক্তিম হয়ে উঠছে।
চারদিকে শুধু সাগরের ভয়ংকর গর্জন আর দক্ষিণের পাগল করা হাওয়া। এমন এক নিস্তব্ধতা, যেখানে শব্দ বলতে শুধু ঢেউয়ের আছড়ে পড়া। দূরে সাদা ফেনা তুলে সমুদ্র এগিয়ে আসে, আবার সরে যায়। তারপর আবার আসে। যেন পৃথিবীর শুরু থেকে একই খেলা চলে আসছে।
এই বিশালতার সামনে দাঁড়ালে মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতাকে খুব স্পষ্ট বুঝতে পারে।
অমিতা কাঠের দ্বিতল বাড়িটার প্রশস্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে সাদা শুভ্র মিডি। পড়ন্ত বিকেলের লাল আলো এসে পোশাকটার উপর নরম আগুনের মতো ছড়িয়ে আছে। দক্ষিণের ঠাণ্ডা বাতাসে তার জুঁই-গন্ধ মাখা চুলগুলো উড়ছে এলোমেলোভাবে। মাঝেমধ্যে চুল এসে মুখ ঢেকে দিচ্ছে, আবার সে হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে।
পিছনে দিগন্তজোড়া সমুদ্র।
সামনে যতদূর চোখ যায়, শুধু সোনালী গমের ক্ষেত।
বাতাসে গমের শীষগুলো একসাথে হেলে পড়ে, আবার উঠে দাঁড়ায়। অমিতার মনে হয়, মাটির বুকেও ঢেউ আছে—শুধু তার শব্দ নেই।
অভিক তখনও ফেরেনি।
গতকাল শহর থেকে বান্ধবী রুমানা ফোন করেছিল। এখন সে একটি বড় হাসপাতালে কাজ করে। ফোন রেখে অনেকক্ষণ অমিতা চুপ করে ছিল। তারপর থেকে এই নীরবতাটা আর আগের মতো লাগে না। মনে হয়, কিছু জীবন খুব দ্রুত এগিয়ে যায়, আর কিছু জীবন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।
তার হাতের কফি ঠান্ডা হলেও বুকের ভেতরটা অস্থির।
কারণ এই সময়েই অভিক ফেরে।
অভিককে ভালোবেসেই সে শহর ছেড়ে এই নির্জন উপকূলে এসেছে। শুরুতে সবাই বলেছিল,
“একজন কৃষকের সঙ্গে জীবন কাটাতে পারবে?”
সে শুধু হেসেছিল।
কিন্তু এখন সে জানে, ভালোবাসা যতটা সহজ মনে হয়, জীবন ততটা সহজ নয়।
হঠাৎ দূরে একটা অবয়ব দেখা যায়।
লাল সূর্যের আলো মাথায় নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে অভিক। ঝাঁকড়া চুল, গামছা বাঁধা, ফেইড নীল জিন্স, বাদামি টি-শার্টে দিনের ধুলো। হাতে কাস্তে। কিন্তু আজ কাস্তেটা একটু শক্ত করে ধরা।
অভিক একজন কৃষক।
কিন্তু আজ তার চোখে শুধু ক্লান্তি না, একটা চাপও আছে—যা সে কাউকে বলে না। ফসলের দাম গতকাল কমে গেছে। পুরোনো ঋণের কথা আবার মাথা তুলেছে। আর তার চেয়েও বড় কথা, সামনে যে নতুন জীবন আসছে, তার জন্য প্রস্তুত হওয়া সহজ নয়।
তবু সে হাঁটে। কারণ থেমে যাওয়ার সুযোগ তার নেই।
অমিতা জানে, এই হাঁটার মধ্যে শুধু ক্লান্তি না—একটা টিকে থাকার যুদ্ধও লুকিয়ে আছে।
দূরত্ব কমছে ধীরে ধীরে।
অমিতা কফির কাপে চুমুক দেয়। কিন্তু তার মন আর স্থির নেই। হাতটা অজান্তেই চলে যায় নিজের পেটের উপর।
সেখানে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে তাদের আগামী।
অভিক তখনো হাঁটছে। আর অমিতা তাকিয়ে থাকে সেই সরু পথে, যেখানে প্রতিদিন কেউ ফিরে আসে—আর কোনো দিন কেউ শুধু মানুষ হয়ে ফিরে আসে না, তার ভেতরের ভয় আর দায়িত্ব নিয়েও ফিরে আসে।
সে ভাবে, এই নীরব জীবনটা কি সত্যিই শান্তি, নাকি শুধু অন্য রকম এক অপেক্ষা—যার নাম আমরা পরে ভালোবাসা দিই।
অভিক আরও কাছে আসে।
আর দূরে, সমুদ্রের ঢেউ আবার ভাঙে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।