যদি দশ বছর আগে দেখা হতো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২২, ২০২৬
কিছু প্রশ্ন আছে যেগুলো ঠিক “প্রশ্ন” হিসেবে টিকে থাকে না। তারা ধীরে ধীরে মাথার ভেতরে একটা আলাদা জায়গা দখল করে নেয়—উত্তর না থাকা সত্ত্বেও। এই ভাবনাটাও তেমনই। যদি বছর দশেক আগে দেখা হতো তোমার আর আমার, তাহলে কি আজকের মানুষ দু’জন একই থাকতাম?
শহরের পুরোনো একটা ভাড়া বাসার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে এই কথাগুলো ভাবছিল। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে মিইয়ে আসছে, আর রাস্তার শব্দও যেন আর আগের মতো আলাদা আলাদা শোনা যাচ্ছে না—একটা ঘনত্ব তৈরি হচ্ছে, যেটাকে ক্লান্তি বলা যায় কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। আজ এই প্রশ্নটা কেন ফিরে এলো, সে নিজেও পুরোপুরি বোঝে না। তবে এটা যে ফিরে এসেছে, সেটা স্পষ্ট।
সে মাঝে মাঝে কল্পনা করে নেয় আরেকটা সময়। অনেক আগের, যখন দিনগুলো এতটা থেমে থেমে ছিল না, বা অন্তত মনে হতো না। তখন সে হয়তো একটু বেশি স্থির ছিল, কিংবা নিজেকে সে রকম ভাবতেই অভ্যস্ত ছিল—সবকিছু ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। আর তুমি—তোমাকে সে এমন একজন হিসেবে ভাবে, যার উপস্থিতি অনেক সময় মানুষের ভেতরের বন্ধ জায়গাগুলোকে হালকা করে দেয়, যদিও সেটা কতটা বাস্তব, আর কতটা কল্পনা, বলা মুশকিল।
মনে হয়, তখন পরিচয়ের ধরনটাই আলাদা হতে পারত। সে হয়তো অকারণে কম জটিল হয়ে যেত, আর নিজের অস্থিরতাগুলো লুকানোর চেষ্টাও ততটা নিয়মিত হতো না। আবার উল্টোও হতে পারত—তুমি তার নীরবতার ভেতরে ঢুকে পড়তে, কিন্তু সেই ঢোকা কতটা স্থায়ী হতো, সেটা নিয়ে নিশ্চয়তা খুব একটা নেই। সময় এখানে অনেক কিছুই বদলে দিতে পারে, এই কথাটা খুব সাধারণ শোনালেও পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
সে নিজেকে কল্পনায় দেখে, যেন হাতে কোনো অদৃশ্য অধিকার আছে। সেই অধিকার দিয়ে সে তোমাকে আগলে রাখছে। কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায়—অধিকার কি সত্যিই তৈরি হয়, নাকি মানুষ শুধু তার একটা ধারণা নিয়ে বাঁচে?
তার মনে পড়ে যায়, জীবন সবসময় বড় কিছু দেয় না। কোনো বড় বাড়ি, না দূরের কোনো যাত্রার সুযোগ। তবু এই না পাওয়ার ভেতরেও কিছু ছোট অভ্যাস তৈরি হয়, যেগুলো পরে অদ্ভুতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। যেমন—বাড়ি ফেরার পথে কিছু নিয়ে যাওয়া।
সে কল্পনায় তোমার জন্য কখনো খয়েরি টিপের পাতা আনে। কখনো লাল নখপালিশের ছোট শিশি, যার রং কেন জানি মনে থেকে যায়, যদিও তার কারণটা খুব পরিষ্কার না। আবার কোনো কোনো দিন, সময় কম থাকলে, শুধু গরম আলুর চপের ঠোঙা। এই আনা-নেওয়ার ভেতরেও একটা আলাদা যত্ন থাকে, যেটাকে শব্দে ঠিকভাবে ধরা যায় না।
তুমি যদি সেখানে থাকতে, হয়তো শুধু তাকিয়ে থাকতে। অথবা হালকা করে হাসতে। মানুষ সবসময় বড় প্রতিক্রিয়া দেয় না; অনেক সময় ছোট একটা নীরবতাই অনেক বেশি কিছু বলে দেয়—এই ধারণাটা সে এখন কিছুটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, যদিও পুরোপুরি নিশ্চিত না।
কখনো সে ভাবে, যদি সত্যিই তখন দেখা হতো, তাহলে হয়তো দু’জন কোথাও যেত। খুব দূরের কিছু না—পাড়ার মোড়ের ফুচকার দোকান। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা, চারপাশের ভিড়, আর অল্প টক-মিষ্টি স্বাদের ভেতর দিয়ে সময়কে একটু সহজ মনে করা। বড় কোনো ঘটনা না, কিন্তু পরে মনে থাকার মতো একটা মুহূর্ত।
তবু প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে—সবকিছু কি সত্যিই এতটা সরল থাকত? নাকি সময় নিজেই সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্যভাবে অন্য পথ তৈরি করে দেয়?
তার বুকের ভেতরে একটা চাপের মতো অনুভূতি তৈরি হয়। সে বোঝে, কিছু সম্ভাবনা শুধু সম্ভাবনাই থেকে যায়। তারা বাস্তব হয় না, এবং সম্ভবত না হওয়াটাও এক ধরনের বাস্তবতা।
সে জানালার দিকে তাকায়। বাইরে মানুষ চলছে, গাড়ি যাচ্ছে—কেউ থেমে নেই। মনে হয়, জীবন থামার জন্য নয়, বরং চলার ভেতরেই নিজের অর্থ খুঁজে নেয়।
তার বুকপকেটের নিচে একটা ভার থেকে যায়। সেটাকে ঠিক ক্ষত বলা যায় কি না, সে নিশ্চিত না। কিন্তু উপস্থিতিটা অস্বীকার করার মতোও না—অনেকদিন ধরে আছে, কখনো স্পষ্ট, কখনো ঝাপসা।
সে আবার ভাবে, যদি বছর দশেক আগে দেখা হতো, তাহলে হয়তো সবকিছু বদলে যেত। আবার এটাও সম্ভব, কিছুই বদলাত না—শুধু তারা নিজেদের অন্যভাবে ব্যাখ্যা করত, এতটুকুই।
এই ভাবনার মাঝেই সে বুঝতে পারে, কিছু সম্পর্ক সময়ের আগে বা পরে তৈরি হয় না। তারা কোথাও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানে “হতে পারত” আর “হয়নি”—দুটোই একইসঙ্গে সত্যি, আবার দুটোই অসম্পূর্ণ।
বাইরে সন্ধ্যা নেমে আসে। আলো ধীরে ধীরে কমে যায়।
সে আর জানালার দিকে তাকায় না। শুধু ভেতরে ভেতরে ভাবে—সম্ভাবনার যে শহরগুলো কখনো দেখা যায় না, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে রাখে।
আর কোথাও, কোনো অদেখা সময়ে, সেই না হওয়া দেখা হয়তো এখনো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।