বাবার পেশা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ১৬ জুন ১০২৬
ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিকভাবেই আসে। এমনভাবে, যেন এটা শুধু একটা তথ্য যাচাই।
“আপনার বাবার পেশা কী?”
ঘরের ভেতর তিনজন মানুষ। টেবিলের ওপারে বসে আছেন এমন ভঙ্গিতে, যেন বহুবার এই উত্তর শুনেছেন। ফাইল খোলা, কলম নড়ছে, চোখে সেই অভ্যস্ত নিরপেক্ষতা—যেটা অনেক কিছু দেখেও প্রতিক্রিয়া না দেখানোর অভ্যাস তৈরি করে ফেলে।
ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। সময়টা খুব লম্বা না, কিন্তু তার ভেতরে মনে হয় একটু থেমে গেছে।
তার হাতটা শক্ত হয়ে আসে।
“রিকশা চালান,” সে বলে।
এই একটা বাক্যের পর ঘরের ভেতর কিছু বদলায় না, অথচ তার নিজের কাছে মনে হয় বাতাসটা একটু ভারী হয়ে গেছে। খুব সামান্য, কিন্তু উপেক্ষা করার মতো না।
কেউ আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। না বিস্ময়, না আগ্রহ। শুধু একটা ছোট বিরতি। এমন বিরতি, যেটা কথার চেয়েও বেশি কিছু বলে দেয়, আবার কিছুই বলে না।
ছেলেটা এখানে এসেছে অনেক আগের কিছু দিনের ভেতর দিয়ে, যেগুলো এখন আর পরিষ্কারভাবে আলাদা করা যায় না। শুধু কিছু দৃশ্য থেকে গেছে, টুকরো টুকরো।
রাত দুটো। ঘরের লাইট জ্বলে আছে।
টেবিলে বই খোলা, পাশে টিউশনের খাতা।
কালির দাগ শুকিয়ে গেছে, কিন্তু মনোযোগের দাগ এখনও রয়ে গেছে।
একদিন খাতা ভিজে যায় বৃষ্টির পানিতে। শুকানোর পর কিছু লেখা আর আগের মতো থাকে না। তবু সে পড়া থামায়নি। থামার জায়গা ছিল না বলেও হতে পারে, আবার অভ্যাসও হয়ে থাকতে পারে।
কখনো মনে হতো সময়টা এগোচ্ছে না, বরং তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই পার্থক্যটা সে তখন বোঝেনি, এখনো পুরোপুরি বোঝে কি না, সেটা নিশ্চিত না।
তার বাবা প্রতিদিন ভোরে বের হন।
পুরোনো রিকশাটা উঠতে একটু শব্দ করে। ধাতব চাকার হালকা ঘর্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে শহরের রাস্তায় মিশে যাওয়া।
মানুষটা বসেন হ্যান্ডেলে, আর শরীরটা যেন নিজেই গতি শিখে নিয়েছে।
দুপুরে একবার দেখা যেত—রাস্তার ধারে বসে আছেন। পাশে প্লাস্টিকের বোতল। ঢাকাটা খুলে পানি খাচ্ছেন ধীরে, যেন সময়টা তার হাতে নেই, তবু তিনি থামতে চাইছেন না।
একবার ছেলেটা জিজ্ঞেস করেছিল, “ক্লান্ত লাগে না?”
বাবা উত্তর দেননি ঠিকভাবে। শুধু বলেছিলেন,
“পড়াশোনা ঠিকমতো করিস।”
এই বাক্যটা এখন আর শুধু কথা না। এটা একটা নিয়মের মতো। এমন নিয়ম, যেটা কেউ লিখে দেয়নি, কিন্তু সবাই মেনে চলেছে।
ইন্টারভিউ বোর্ডে আবার নড়াচড়া হয়।
একজন ফাইল উল্টে দেখে, আরেকজন একটু ঝুঁকে প্রশ্ন করে, “আর কিছু বলবেন?”
ছেলেটা মাথা নাড়ে। না মানে না। কিন্তু এই “না”-এর ভেতর অনেক কিছু চাপা পড়ে থাকে।
সে বুঝতে পারে না, বাবার পেশা বলা এত ভারী কেন। “রিকশাচালক”—এই শব্দটা ঠিক, আবার অসম্পূর্ণও। এতে হাতের ঘাম আছে, রাস্তার ধুলো আছে, কিন্তু মানুষটার ভেতরের দীর্ঘ সময় নেই।
“ধন্যবাদ, আপনি যেতে পারেন।”
সে উঠে দাঁড়ায়। করিডোরটা লম্বা। জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। বাইরে শহর চলছে—হর্ন, গতি, মানুষের ভিড়, সিগনালের আলো। সব কিছু একসঙ্গে চলছে, কিন্তু কোনো কিছু থেমে নেই।
তার চোখের সামনে ভেসে আসে একটা ছবি।
একটা পুরোনো রিকশা।
একজন মানুষ, যিনি কখনো নিজের ক্লান্তিকে নাম দেননি।
যিনি হয়তো জানেনই না, ক্লান্তি নিয়ে আলাদা করে কথা বলা যায়।
বাইরে এসে সে বাবাকে দেখে।
রিকশাটা রোদে দাঁড়িয়ে। রং উঠে গেছে অনেক আগেই। হ্যান্ডেলের একপাশে কাপড় পেঁচানো, ঘষে ঘষে কালচে হয়ে গেছে। চাকার পাশে ধুলো জমে আছে।
বাবা দাঁড়িয়ে আছেন পাশে। শরীরটা একটু ঝুঁকে আছে, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা স্থির।
“কেমন হলো?” বাবা জিজ্ঞেস করেন।
ছেলেটা কিছু বলে না। উত্তরটা তার জানা, কিন্তু শব্দে ধরতে পারে না।
“জানি না,” সে বলে।
বাবা মাথা নেড়ে দেন। আর কিছু জানতে চান না। এই “জানি না”-এর ভেতরেও তিনি যেন কিছু পড়ে ফেলেন, যা ব্যাখ্যার দরকার নেই।
রিকশা চলতে শুরু করে।
চাকা ঘোরে ধীরে। প্রথমে একটু শব্দ করে, তারপর সেটা শহরের শব্দের মধ্যে মিশে যায়। রাস্তার ধুলো একটু উড়ে আবার বসে পড়ে। জীবনও যেন সেই ধুলোর মতো—উঠে, ছড়িয়ে, আবার থেমে যায়।
ছেলেটা পেছনে বসে আছে। ফাইলটা হাতে। এখন এটা শুধু কাগজ না, বরং একটা ভারী উপস্থিতি।
হঠাৎ বাবা পেছনে তাকান।
কোনো কথা নেই। কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো ব্যাখ্যাও না। শুধু একটা ছোট হাসি—খুব ছোট, প্রায় অদৃশ্য। এই হাসিটা কোনো কথার বিকল্প না, বরং কথার অভাবকে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখার মতো।
ছেলেটা প্রথমবার বুঝতে পারে—এই মানুষটা নিজের পরিচয়কে কখনো শব্দে বন্দি করেননি। তিনি শুধু ছিলেন। কাজ করেছেন। থেমে থাকেননি।
রিকশা এগিয়ে যায়।
হ্যান্ডেলের কাপড়টা হালকা বাতাসে নড়ে ওঠে। সূর্যের আলো তাতে পড়ে আবার সরে যায়।
পেছনে সেই হাসিটা থেকে যায়—যেটা কোনো ফর্মে লেখা যায় না, কোনো ইন্টারভিউ বোর্ডে ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু ছেলেটার ভেতরে কোথাও স্থির হয়ে বসে থাকে।
আর শহর চলতে থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।