জুনের ভারী বৃষ্টি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ১৭, জুন ২০২৬।
জুনের বৃষ্টি সেদিন থামার নামই নিচ্ছিল না।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামছিল। আকাশটা অনেক আগেই কালচে হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল, আর তার পরপরই দূরে কোথাও মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছিল। ছাদের ওপর, গাছের পাতায়, রাস্তার পানিতে—সবখানে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
শহরের ব্যস্ততাও যেন একটু থেমে গিয়েছিল। দোকানের শাটার নেমে যাচ্ছিল। রাস্তায় মানুষ কমে এসেছিল। মাঝে মাঝে কোনো রিকশা বা মোটরসাইকেল পানি ছিটিয়ে চলে যাচ্ছিল।
এই বৃষ্টির মধ্যেই অভিক বসেছিল তাদের বাসার ডাইনিং রুমে।
সামনে উচ্চতর গণিতের বই খোলা। খাতায় কয়েকটা সমীকরণ লেখা। কিন্তু তার চোখ বইয়ে থাকলেও মন ছিল অন্য কোথাও।
তার সামনে বসেছিলেন নিশি ম্যাডাম।
“অভিক, একই জায়গায় পাঁচ মিনিট ধরে তাকিয়ে আছ।”
অভিক একটু চমকে উঠেছিল।
“না ম্যাডাম... চেষ্টা করছিলাম।”
“চেষ্টা আর সমাধান এক জিনিস না।”
নিশি খাতাটা নিজের দিকে টেনে নিলেন। একটা জায়গায় কলম দিয়ে দাগ দিলেন।
“দেখো, এখানে তুমি দ্বিতীয় ধাপেই ভুল করেছিলে। এই মানটা আগে ঠিক করতে হবে।”
অভিক মাথা নেড়ে আবার খাতার দিকে তাকাল। কিন্তু মনটা ঠিক ফিরছিল না।
“কী হয়েছে তোমার?”
“কিছু না।”
“মিথ্যা বলছ।”
অভিক একটু হেসে ফেলেছিল।
“এত সহজে বুঝে ফেললেন?”
“তোমাদের বয়সে সবাই ভাবে, তারা নিজেদের লুকাতে পারে।”
বাইরে হঠাৎ একটা বজ্রপাত হলো। এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটা সাদা আলোয় ভরে গেল। তারপর আবার অন্ধকার। জেনারেটরের আলো জ্বলতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। সেই ছোট্ট অন্ধকারে শুধু বৃষ্টির শব্দই শোনা যাচ্ছিল।
নিশি জানালার দিকে তাকালেন।
“আজ মনে হয় রাত পর্যন্ত বৃষ্টি হবে।”
অভিকও জানালার বাইরে তাকাল।
“আপনি ফিরতে পারবেন?”
“ফিরতে হবে।”
“এই বৃষ্টিতে?”
নিশি কিছুক্ষণ কাঁচ বেয়ে নামা পানির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“সব বৃষ্টি এড়িয়ে চলা যায় না।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। তবু অভিকের মনে হলো, এর ভেতরে যেন অন্য কোনো কথা লুকিয়ে আছে।
কিন্তু মাঝে মাঝে অভিকের মনে হতো, সেই হাসির পেছনে এমন কিছু আছে, যা তিনি কাউকে দেখান না।
“ম্যাডাম?”
“হুম?”
“আপনি কি ছোটবেলায় শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন?”
নিশি একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
“হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
“এমনিই।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি জানালার বাইরে তাকালেন।
“ছোটবেলায় ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে হলেন না কেন?”
নিশি হালকা হাসলেন। কলমটা খাতার ওপর রেখে দিলেন।
“জীবন সবসময় মানুষের ইচ্ছামতো চলে না।”
বাইরে বৃষ্টি একইভাবে পড়ছিল।
“আপনার আফসোস হয়?”
প্রশ্নটার উত্তর দিতে তিনি একটু সময় নিলেন।
“আগে হতো।”
“এখন?”
“এখন মনে হয়, যা হারিয়েছি তার হিসাব করতে থাকলে সামনে এগোনো যায় না।”
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। ঘড়ির কাঁটার শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল।
অভিক হঠাৎ বুঝতে পারল, সে শুধু গণিত শিখছে না। জীবনের কিছু কঠিন হিসাবও যেন বুঝতে চেষ্টা করছে। যে হিসাব কোনো বইয়ে লেখা থাকে না।
“চলো, এবার প্রশ্নটা শেষ করি।”
“ম্যাডাম?”
“হ্যাঁ?”
“আপনি কি কখনো ক্লান্ত হন না?”
নিশি মৃদু হাসলেন।
“হই।”
“তবু সবসময় এত শান্ত থাকেন কীভাবে?”
তিনি কিছুক্ষণ খাতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর সমীকরণের নিচে একটা দাগ টেনে বললেন,
“সব অংক খাতায় কষা যায় না, অভিক।”
অভিক চুপ করে শুনছিল।
“কিছু অংক মাথার ভেতরেই গুণতে হয়।”
বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে নামতে শুরু করেছিল। জানালার কাঁচ বেয়ে পানি নেমে আসছিল। মনে হচ্ছিল, বাইরের পৃথিবীটা এই বৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেছে।
ঠিক তখন দূরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
অভিক জানালার দিকে তাকাল।
গেটের বাইরে একটা কালো গাড়ি এসে থেমেছে। বৃষ্টির মধ্যেও গাড়িটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
নিশিও শব্দটা শুনেছিলেন।
তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। খুব সামান্য। কিন্তু অভিকের চোখ এড়াল না।
“কেউ এসেছে?”
নিশি কোনো উত্তর দিলেন না।
কয়েক সেকেন্ড পর তার ফোন কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে একটা নাম ভেসে উঠল।
তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ফোনটা উল্টে রাখলেন।
“আপনি ফোন ধরলেন না কেন?”
নিশি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
“কিছু কিছু ফোন ধরার পর এমন কথা বলতে হয়, যেগুলো মানুষ বলতে চায় না।”
অভিক চুপ করে গেল।
বাইরে বৃষ্টি তখনও পড়ছিল।
কিছুক্ষণ পর নিশি বইগুলো গুছিয়ে নিলেন।
“আজ পড়া থাক।”
“কিন্তু ম্যাডাম...”
“সব উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না, অভিক।”
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। দরজার কাছে গিয়ে একবার থামলেন।
“আর একটা কথা মনে রেখো, মানুষের মুখ দেখে তার পুরো গল্প বোঝা যায় না।”
অভিক কিছু বলল না।
সে শুধু দেখল, নিশি ছাতা হাতে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে গেলেন।
গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়ির দরজা খুলে গেল।
নিশি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর গাড়িতে উঠে বসলেন।
গাড়িটা ধীরে ধীরে অন্ধকার রাস্তার দিকে চলে গেল।
অভিক জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
সেদিন সে বুঝেছিল, কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে শুধু কিছু শেখানোর জন্য নয়। কখনো কখনো তাদের নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো আমাদের নিজের চোখও খুলে দেয়।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল।
কিন্তু অভিক জানত, সবচেয়ে ভারী ঝড়টা বাইরে নয়।
কোনো একজন মানুষের ভেতরে চলছিল।
#জুনের_ভারী_বৃষ্টি #ছোটগল্প #বাংলাসাহিত্য #সমকালীন_কথাসাহিত্য #মনস্তাত্ত্বিক_গল্প #বৃষ্টিভেজা_গল্প #মোহাম্মদ_জাহিদ_হোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।