মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প।১২ নভেম্বর ২০২৫
আজ আমি অভিককে দেখতে এসেছি—হাসপাতালের মর্গে।
সাদা শুভ্র ট্রের ওপর শান্তভাবে শুয়ে আছে অভিক।
আজ ওর মুখে সেই চেনা হাসিটা নেই, যেন পাথর হয়ে গেছে। নিথর। নিশ্চুপ।
সামনে শুভ্র কাপড়ে মোড়ানো অভিকের নিস্তব্ধ দেহ। তার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পরী—অভিকের বড় মেয়ে।
চোখের সামনে ভেসে উঠলো অভিকের জীবনের দীর্ঘ এক হিসাবের খাতা। প্রতিটি অধ্যায় যেন জীবনের এক একটি খরচের হিসাব—টাকার নয়, ভালোবাসার, ত্যাগের, আর অবহেলার।
একুশ বছর আগে...
রাতের অন্ধকারে নিশির প্রচণ্ড প্রসববেদনা উঠেছিল।
অভিক ছুটে গেল হাসপাতালে। ডাক্তার দ্রুত অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিলেন।
তারপর—জন্ম নিলো পরী।
হাসপাতালের বিল ত্রিশ হাজার।
অভিকের মুখে তখনো হাসি—মেয়ের মুখ দেখার আনন্দে টাকা যেন কিছুই নয়!
পরী একটু একটু করে বড় হচ্ছে
মায়ের দুধ ছাড়ার পর শুরু হলো বেবি ফুড, জামা, ন্যাপি, ওষুধ—মাসে অন্তত পাঁচ হাজার টাকার খরচ।
হাঁটতে শিখে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙত আর হেসে গড়াগড়ি খেত। উপরের পাটির দুটো দাঁত উঠেছে—আবার কখনও কুটুস করে কামড়ও দেয়!
পরীর পুতুল
পরীর জেদ—একটা পুতুল চাই!
বাজারে গিয়ে অভিক দেখে দাম প্রায় দু’হাজার!
জানে, দু’ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙে যাবে, তবুও কিনে আনে—কারণ পরীর হাসি কোনো পুতুলের চেয়েও দামি।
স্কুলে ভর্তি
ইউনিফর্ম, বই-খাতা, স্কুল ফি—সব মিলিয়ে মাসে ছয় হাজার টাকার ধাক্কা।
অভিক হাসে—“শেখার খরচে হিসাব চলে না।”
টিউটর দরকার
ভালো রেজাল্টের জন্য প্রত্যেক বিষয়ের আলাদা শিক্ষক। একেকজন তিন হাজার টাকা করে।
সব মিলিয়ে মাসে ষোল হাজার।
অভিকের কপালে ঘাম, কিন্তু মুখে হাসি—“আমার মেয়ে তো মানুষ হচ্ছে।”
কিশোরী পরী
সাজগোজের শখ বেড়েছে।
ক্রিম, লিপস্টিক, ফেসিয়াল—প্রতিদিনই নতুন কিছু লাগে। মাসে পাঁচ হাজার টাকার খরচ।
অভিক শুধু তাকিয়ে থাকে—সময় কোথায় উড়ে গেল!
বিয়ের বয়স
সম্বন্ধ দেখতে দেখতে ক্লান্ত অভিক।
প্রতি বার পাত্রপক্ষের আপ্যায়নে হাজার হাজার টাকা উড়ে যায়—মিষ্টি, চা, উপহার!
শেষে যখন বিয়ে ঠিক হলো, দেখা গেল পাত্র ভালো, পরিবারও প্রতিষ্ঠিত।
তবে চাহিদার তালিকা বিশাল—ছয় ভরি সোনা, ফার্নিচার, দুই শত বরযাত্রী, এসি সেন্টারে ভোজ।
শুধু খাবারের বিলেই গেল আট লাখ টাকা।
বিয়ের পর
বিয়ে মানেই শেষ নয়—উপহার দিতে হয় সবাইকে।
বেয়াইয়ের জন্য স্যুট, বেয়ানের জন্য জামদানি, জামাইয়ের জন্য ঘড়ি—সব মিলিয়ে আরেক লাখ।
বিপর্যয়
জামাইয়ের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না, লাগবে দশ লাখ টাকা।
অভিক তার জীবনের সব সঞ্চয় তুলে দিলো মেয়ের হাতে—“তুমি শুধু সুখে থেকো।”
এরপর আবার গাড়ি কেনার কথা উঠলো। আট লাখ দরকার।
অভিকের তখন কিছুই অবশিষ্ট নেই। সে চুপ করে যায়।
অভিকের পতন
নিজের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় টাকাটুকু পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছিল পরীর জন্য।
অবশেষে, নিজের প্রতি চরম অবহেলাই আজ ওর মৃত্যু ডেকে এনেছে।
হাসপাতালের বিল মিটিয়ে হাতে পেলাম অভিকের হিমশীতল নিথর দেহ।
মোট খরচ—ষাট হাজার টাকা।
জীবনের শেষ ব্যয়ের হিসাবও সে রেখে গেল নিখুঁতভাবে।
শেষ বিদায়
বাসায় আনা হলো অভিকের দেহ। চারপাশে কুরআন তেলাওয়াতের ধ্বনি, আগরবাতি আর কর্পুরের গন্ধে ভরে উঠেছে ঘর।
কাফনের কাপড়, জানাজার খরচ—সব মিলিয়ে এবার খরচটা “পুরোপুরি সাশ্রয়”!
আমি ভাবি, অভিকের এই পরিণতির জন্য কি আমরা কিছুটা দায়ী নই?
আমরা কি পারতাম না একবার তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে, কিংবা তার বোঝাটা কিছুটা হালকা করতে?
এটাই কি আধুনিক সমাজের মানবিকতার চেহারা—নাকি পুরোনো স্বার্থপরতারই নতুন রূপ?
মানবিকতা কি সত্যিই আজ কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ?
অভিকের জীবনের শেষ হিসাবের যোগফল—
...শুধু একটা শূন্য।
(বিঃদ্রঃ টাকার হিসাবটি অভিকের জীবনের ত্যাগ ও অবহেলার রূপক হিসেবেই ব্যবহার করা হয়েছে।)
#মানবিকতা #ছোটগল্প #শুধু_একটা_শূন্য #জীবনের_হিসাব #বাংলা_গল্প #পিতা_ও_কন্যা #জীবনের_মূল্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।