বারান্দার আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৪ আগস্ট ২০২৬
সন্ধ্যার পর থেকেই বিদ্যুৎ নেই। বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে পাশের বাড়ির একটা মোমবাতি দেখা যাচ্ছে। বাতাস এলেই শিখাটা কেঁপে উঠছে, দেয়ালের ছায়াটা কখনো লম্বা হচ্ছে, কখনো আবার ছোট হয়ে যাচ্ছে।
নিশি বারান্দার পুরোনো কাঠের চেয়ারটায় বসে আছে। চেয়ারটার হাতলে অনেক দিনের রং উঠে গেছে। বৃষ্টির পানি এসে মেঝেতে ছোট ছোট দাগ ফেলেছে। সে সেদিকেই তাকিয়ে আছে। কী দেখছে, নিজেও জানে না।
অভিক তিন দিন ধরে বাড়ি ফেরেনি।
প্রথম দিন নিশির রাগ হয়েছিল। দ্বিতীয় দিন অভিমান। তৃতীয় দিনে এসে দুটোই কেমন ক্লান্ত হয়ে গেছে। এখন শুধু বুকের ভেতর একটা ফাঁকা জায়গা নিয়ে সে বসে আছে।
মোবাইলটা হাতে নিল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। কোনো নতুন বার্তা নেই।
সেদিনের কথাগুলো আবার মনে পড়ল।
অভিক বলেছিল, “তুমি আমাকে সবকিছুর হিসাব দিতে বলো কেন?”
নিশি তখন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল। “হিসাব চাই না। জানতে চাই।”
“একই কথা।”
“এক না।”
“তোমার কাছে সবকিছুর ব্যাখ্যা লাগে।”
নিশি একটু চুপ করে থেকে বলেছিল, “আর তোমার কাছে কাউকে কিছু বলার দরকার হয় না।”
অভিক তখন বেশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
“আমি কি তোমার কাছে বন্দি?”
নিশি কথাটা বলার আগে থামতে পারত। থামেনি।
“না। তুমি তো কোনোদিনই ছিলে না।”
কথাটা বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা চুপ হয়ে গিয়েছিল।
অভিক আর কিছু বলেনি। শুধু দরজার পাশে রাখা চাবিটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।
তারপর তিন দিন।
নিশি জানে, কথাটা তার বলা উচিত হয়নি। কিন্তু ক্ষমা চাওয়ার জন্যও তো একজন মানুষ দরকার। ফোন করবে ভেবেছে কতবার। নম্বর খুলেছে। আবার বন্ধ করেছে।
অভিক থাকলে রাতের খাবারে ভাত একটু কম হলে বলত, “আবার আন্দাজে রান্না করছ?”
নিশি বলত, “খাবে না?”
“খাব তো।”
“তাহলে?”
“না, এমনি বললাম।”
এই ‘এমনি বললাম’ কথাটাও এখন তার মনে পড়ে।
মানুষ চলে গেলে তার সঙ্গে শুধু মানুষটা যায় না। তার ব্যবহারও থেকে যায়। গ্লাস রাখার শব্দ, চাবি ঘোরানোর শব্দ, বাথরুমের দরজা টেনে বন্ধ করার শব্দ। এমনকি ঘুমানোর আগে বিরক্ত হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দও।
একসময় নিশির মনে পড়ল, একবার তার খুব জ্বর হয়েছিল। রাতভর শরীর পুড়ছিল। অভিক তখন প্রায় ঘুমায়নি। বারবার পানিতে কাপড় ভিজিয়ে তার কপালে রেখেছিল। ভোরের দিকে জ্বর একটু কমলে নিশি আধঘুমে শুনেছিল, অভিক রান্নাঘরে গিয়ে হাঁড়ির ঢাকনা তুলছে।
সকালবেলা নিশি চোখ মেলে দেখেছিল, অভিক চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
“কেমন লাগছে?”
“একটু ভালো।”
“জ্বর কমেছে।”
তারপর চায়ের কাপটা হাতে দিয়ে বলেছিল, “আজ ভাতটা তুমি রান্না কোরো না। কাল যে কী করেছিলে, ভাত না খিচুড়ি—এখনও বুঝিনি।”
নিশি তখন দুর্বল শরীরেও হেসে ফেলেছিল।
এই মানুষটাকেই সে তিন দিন ধরে দেখতে পাচ্ছে না।
অদ্ভুত ব্যাপার, মানুষকে ভালোবাসার কারণগুলো খুব বড় হয় না। কখনো কপালে ভেজা কাপড় চেপে ধরার মতো ছোট। আবার সেই মানুষটার ওপর রাগ করার কারণও খুব বড় কিছু নয়। একটা কথা, একটা দেরি, একটা উত্তর না দেওয়া—এই সামান্য জিনিসেই কত দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।
নিশি চেয়ার থেকে উঠে রান্নাঘরে গেল। ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা তুলল। ভেতরে ঠান্ডা ভাত পড়ে আছে। অভ্যাসবশত সে একটু হাত দিয়ে ভাতটা নেড়ে দিল। তারপর নিজের ওপরই বিরক্ত হলো।
কার জন্য করছে এসব?
হাঁড়ির ঢাকনা নামিয়ে আবার বারান্দায় এসে বসল।
এই বারান্দাটা তাদের খুব পছন্দের ছিল না। সরু, দুজন পাশাপাশি দাঁড়ালে একজনকে একটু সরে যেতে হয়। বর্ষায় দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ হয়। শীতকালে বাতাস সরাসরি এসে লাগে।
তবু সংসারের অনেক কথা এই বারান্দাতেই হয়েছে।
নিশি চোখ বন্ধ করল। অভিকের মুখ মনে পড়ল। তার রাগী মুখ। হাসির মুখ। জ্বরের রাতে জেগে থাকা মুখ। আবার সেই মুখটাই দরজা বন্ধ করে চলে যাওয়ার সময় কেমন শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়লে মানুষ কাউকে ঠিক কী নামে ডাকে—প্রিয়, অপরাধী, নাকি নিজের মানুষ—নিশি জানে না।
বাইরে অন্ধকার আরও ঘন হয়েছে। দূরের রাস্তার বাতিটা কয়েকবার জ্বলে নিভে আবার জ্বলল।
হঠাৎ নিচে একটা গাড়ি থামার শব্দ হলো।
নিশি চমকে উঠে দাঁড়াল।
গাড়িটা তাদের বাড়ির সামনে থামেনি। পাশের গলি দিয়ে চলে গেল।
সে ধীরে ধীরে আবার বসে পড়ল।
নিজের ওপর এবার সত্যিই রাগ হলো।
“এভাবে আর কত?”
কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে গেল।
ঠিক তখনই মোবাইলটা কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে অভিকের নাম।
নিশি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর বার্তাটা খুলল।
জেগে আছ?
তার আঙুল থেমে রইল।
তারপর লিখল,
হ্যাঁ।
উত্তর আসতে বেশি সময় লাগল না।
বারান্দায়?
নিশির বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
সে লিখল,
তুমি কোথায়?
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই।
তারপর,
নিচে।
নিশি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
বারান্দার গ্রিল ধরে নিচে তাকাতেই অন্ধকারের মধ্যে একটা পরিচিত অবয়ব দেখতে পেল।
অভিক।
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
নিশি কিছুক্ষণ নড়ল না।
তারপর অভিক মাথা তুলে তাকাল।
এই দূরত্ব থেকেও নিশি বুঝতে পারল, মানুষটার চোখে ক্লান্তি।
তিন দিনের রাগ তখনও তার ভেতরে আছে। কথাগুলোও আছে। যে কথাগুলো বলা হয়নি, সেগুলোও।
তবু নিশি বারান্দা থেকে সরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার কাছে এসে একবার থামল।
হাতটা ছিটকিনির ওপর রাখল।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে নিশির মনে হলো, কিছু মানুষকে হারিয়ে ফেললেও পুরোপুরি হারানো যায় না।
তারা থেকে যায়।
কখনো অভ্যাস হয়ে, কখনো রাগ হয়ে, কখনো গভীর রাতের অস্থিরতা হয়ে।
আর কখনো আলো-আঁধারির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা সরু বারান্দার ওপারে—একজন মানুষ হয়ে।
নিশি দরজা খুলে দিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।