সময়ের আবর্তের ইতিহাস
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। জানুয়ারি,১৬,২০২৬
সময়ের আবর্তের ইতিহাস কখনো বইয়ে লেখা থাকে না, লেখা থাকে মানুষের চোখে, নিঃশ্বাসে আর নীরব মৃত্যুর ভেতরে। একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, এক কাপ রং চা, আর হঠাৎ করে থমকে যাওয়া একটি তরুণ জীবন—এই অনুগল্প সেই বাস্তবতার কথা বলে, যেখানে যৌতুক, পারিবারিক কলহ আর সামাজিক চাপ এক কিশোরী মায়ের জীবনকে ইতিহাসে পরিণত করে। সময়ের আবর্তের ইতিহাস শুধু একটি গল্প নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেকের সামনে দাঁড় করানো এক নিষ্ঠুর প্রশ্ন।
আজ বৃহস্পতিবার। দুপুরের পর থেকেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ব্যথা। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, অক্সিজেনের ওঠানামায় মনে হচ্ছিল জীবনটা বুঝি এখানেই থেমে যাবে। বিকেলের দিকে নিজের অজান্তেই আতঙ্কে লোডিং ডোজটা খেয়ে ফেললাম। সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত নিলাম—একটা ইসিজি করানো দরকার।
বাসার কাছেই মুগধা হাসপাতাল। তাই সোজা চলে গেলাম হাসপাতালের জরুরি বিভাগে।
জরুরি বিভাগে বসে ছিলেন অল্প বয়সী একজন ডাক্তার। আমার ইসিজি ও আগের চিকিৎসার কাগজপত্র মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন তিনি। কথা বলতে বলতে ভালোই লাগছিল। প্রসঙ্গক্রমে জানলাম, তিনি এফসিপিএস করছেন। ওষুধ, চিকিৎসা—সব মিলিয়ে আলোচনা জমে উঠল। এমনকি এক কাপ রং চাও চলে এলো, যেন মুহূর্তের জন্য বুকের ব্যথাটাও ভুলে গেলাম।
জরুরি বিভাগে রোগী আসছে, যাচ্ছে। ডাক্তার সংক্ষেপে চিকিৎসা দিয়ে বেশিরভাগ রোগীকেই সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠাচ্ছেন।
ঠিক তখনই জরুরি বিভাগের ব্রাদার এসে জানালেন—একজন জরুরি রোগী এসেছে।
ডাক্তার রোগীকে ভেতরে ডাকলেন।
দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি, ১৩–১৪ বছরের চিকন-চাকন একটি মেয়ে। পরনে বোরকা, তবে মুখ ঢাকা নয়। সঙ্গে একজন বয়স্ক মহিলা—নিজেকে মেয়েটির মা বলে পরিচয় দিলেন।
আমার পাশের চেয়ারটি ফাঁকা থাকায় ডাক্তার মেয়েটিকে সেখানে বসতে বললেন। মেয়েটি আমার পাশে বসলো। তার মা বললেন, মেয়েটি একসঙ্গে ১৫টি নাপা ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছে।
কথাটা শুনে অবচেতনে বলে ফেললাম,
“আম্মু, আর কিছু পেলি না? নাপাটাই খেতে হলো! ওয়াশের পর জীবনে আর ওষুধের নাম মুখে আনবি না।”
মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।
এই প্রথম ভালো করে লক্ষ্য করলাম—তার চোখের নিচে গভীর কালো ছাপ। মনে হচ্ছিল, অনেক দিন ধরেই সে ঘুমাতে পারেনি। সেই চোখে ছিল ক্লান্তি, ভয় আর এক অদ্ভুত নীরবতা।
ডাক্তার কোনো কথা না বলে ব্রাদারকে বললেন, নার্সকে ডেকে ওয়াশের ব্যবস্থা করতে।
নার্স আসতেই মেয়েটি তার সঙ্গে চলে গেল। যাওয়ার সময় খেয়াল করলাম—ওর মধ্যে কেমন একটা আতঙ্ক কাজ করছে।
মেয়েটি চলে যাওয়ার পর আমরা আবার আগের আলোচনায় ফিরে গেলাম। সময় গড়িয়ে গেল প্রায় বিশ মিনিট।
হঠাৎ করেই ব্রাদার দৌড়ে এসে ডাক্তারকে জানালেন—
যে মেয়েটিকে ওয়াশ করতে পাঠানো হয়েছিল, সে মারা গেছে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি আর ডাক্তার দৌড়ে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম, স্টিলের ট্রলিতে করে মেয়েটির নিথর দেহ সামনে আনা হচ্ছে।
ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে ইসিজি করলেন। ইসিজির নীরব গ্রাফ স্পষ্ট করে বলে দিল—মেয়েটি আর পৃথিবীতে নেই।
একটু পরেই দেখা গেল, এক মহিলা হাউমাউ করে কাঁদছেন। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, তিনি মেয়েটির মা। আর যিনি প্রথমে মেয়েটিকে নিয়ে এসেছিলেন, তিনি তার শাশুড়ি। মেয়েটির একটি এক বছরের সন্তানও আছে।
পারিবারিক কলহের কারণ জানতে চাইলে জানা গেল—
মেয়ের জামাইকে বিদেশ পাঠানোর টাকা দিতে না পারায় ঝগড়ার শুরু। সেই ঝগড়ার এক পর্যায়ে মেয়েটি শ্বশুরবাড়িতে বিষ পান করে।
আমার চোখের সামনে তখন ভেসে উঠল মাত্র বিশ মিনিট আগের সেই হাসিমাখা আধো-জাগা চোখ দুটি। একবারও ভাবিনি—বিধাতা তার জন্য এমন এক দীর্ঘ, নিঃশব্দ ঘুমের আয়োজন করে রেখেছেন।
যৌতুক যে কত ভয়ংকর, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। আজও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে এই অমানবিক প্রথা। শুধু আইন দিয়ে কখনোই এই অভিশাপ নির্মূল করা সম্ভব নয়—যতদিন না আমাদের বিবেক জাগ্রত হয়।
ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কেস রিপোর্ট করলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্টিলের ট্রলিটি ঠেলে মর্গের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম অন্ধকারের মধ্যে।
আমার পাশে তখন শুধু দাঁড়িয়ে ছিল—
সময়ের আবর্তে ইতিহাস হয়ে যাওয়া এক কিশোরীর শেষ হাসি।
#সময়ের_আবর্তের_ইতিহাস #বাংলা_অনুগল্প #যৌতুক_প্রথা #নারী_নির্যাতনের_বিরুদ্ধে #সমাজ_ও_বিবেক
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।