স্পর্শের প্রাচীন সঙ্গীত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২২, ২০২৬
কখনো কখনো মনে হয়, জগৎকে আলাদা আলাদা জিনিস বলে ভাবাটা হয়তো একটা অভ্যাসমাত্র। বাস্তবে সবকিছু মিলেমিশে এমন এক ধরনের শব্দ তৈরি করে, যেটা কানে ধরা পড়ে না, কিন্তু শরীরের ভেতরে কোথাও একটা প্রতিক্রিয়া রেখে যায়। এটাকে ঠিক “সঙ্গীত” বলা যাবে কি না, সে প্রশ্নটা খোলা থাকে। নিশ্চিত কোনো অবস্থান নেওয়া কঠিন। তবু একটা ধারণা থেকে যায়—এর শুরু বা শেষ নেই, শুধু চলমানতা আছে।
রুমেলিয়া এই অনুভূতির ভেতর দিয়ে অনেক রাত একা দাঁড়িয়ে কাটায়। জানালার পাশে গেলে জ্যোৎস্না তার মুখে পড়ে, কিন্তু সেই আলো উষ্ণতা তৈরি করে না; বরং একটা দূরত্বের অনুভূতি দেয়, যেন আলো নিজেই কিছুটা সাবধান। সে সেই দূরত্বের ভেতরেই থাকে—কখনো কাছে যেতে চায়, আবার মাঝপথে থেমে যায়।
এমন মুহূর্তে তার গ্রামের বাড়ির কথা মনে পড়ে। বসন্তের শেষদিকে বাতাস সেখানে একধরনের অনিয়মিত ছন্দে বইত। ফুল ঝরার কোনো শব্দ শোনা যেত না, কিন্তু একটা পরিবর্তনের চাপা উপস্থিতি টের পাওয়া যেত। তখন সে সেই অনুভূতিকে নাম দিতে পারত না। এখন দাঁড়িয়ে মনে হয়, সেই অনুভূতিটাই হয়তো সময়ের ভেতরে কোথাও জমাট বেঁধে আছে।
রাত গভীর হলে জানালার বাইরে পাতার ঘষাঘষির শব্দ শোনা যায়। একটা বড় গাছ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, বয়স বোঝা যায় তার স্থিরতায়। পাতাগুলো একে অন্যের গায়ে লাগতে থাকে, দেখে মনে হয় পুরোনো কোনো বাক্য আবার নিজেকে গুছিয়ে নিতে চাইছে। মাঝেমধ্যে প্যাঁচার ডাক সেই শব্দের ভেতর ঢুকে পড়ে। ডাকটা তীক্ষ্ণ, কিন্তু তাতে আতঙ্কের চেয়ে বেশি এক ধরনের একাকীত্বের ইঙ্গিত থাকে।
এই সব মিলিয়ে অন্ধকারকে আর ফাঁকা জায়গা বলে মনে হয় না। বরং সেটাকে একটা উপস্থিতি হিসেবে ভাবা যায়, যার মুখ আছে বলে মনে হয়, কিন্তু ভাষা তৈরি হয়নি।
রুমেলিয়া মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করে—স্পর্শ কি কেবল শারীরিক অভিজ্ঞতা, নাকি তার ভেতরে স্মৃতির মতো কিছু জমা হয়, যা সময়ের সঙ্গে অন্য রূপ নেয়? জানালার কাঁচে হাত রাখলে কাঁচটা তখন আর শুধু কাঁচ থাকে না। সেখানে অতীতের মতো কিছু একটা প্রতিফলিত হয় কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না, কিন্তু এমন একটা ধারণা মাথায় আসে।
একবার বসন্তের বিকেলে সে স্টেশনে গিয়েছিল। ট্রেন ছিল না, তবু দূর থেকে ভেসে আসছিল হুইসেলের মতো একটা শব্দ। সেটা কখনো কাছে আসছিল, কখনো আবার হারিয়ে যাচ্ছিল। সেই অনির্দিষ্টতার মধ্যে তার মনে হয়েছিল, সময়ও হয়তো স্থির কোনো কাঠামো না—বরং বারবার ফিরে আসা এবং সরে যাওয়ার মাঝের কিছু।
গ্রামের তুলসী মঞ্চের স্মৃতিও এমন সময়ে ফিরে আসে। সন্ধ্যার পর সেখানে একটা ছোট বাতি জ্বলত। বাতাসে হালকা গন্ধ থাকত, কিন্তু সেটা কোনো নির্দিষ্ট স্মৃতির সঙ্গে সরাসরি বাঁধা নয়। তবু এখন মনে হয়, সেই গন্ধই হয়তো নীরবতার একটা রূপ ছিল। তুলসী পাতার দিকে তাকিয়ে থাকলে সময় কিছুটা ধীর হয়ে যেত—এটা কল্পনা নাকি বাস্তব অভিজ্ঞতা, তা আলাদা করে বলা কঠিন।
রুমেলিয়া এসব কথা কাউকে বলে না। সে নিজেও এগুলোকে খুব পরিষ্কার করে সাজাতে পারে না। হয়তো সে মনে করে, অনুভূতি যতটা ভাষায় আসে, ততটাই কিছু অংশ হারিয়ে যায়। এই ধারণাটা ঠিক কি না, সে নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
এক রাতে হঠাৎ বৃষ্টি নামে। জানালার কাঁচে পানির শব্দ পড়ে, কিন্তু সেই শব্দ ভেতরের নীরবতাকে ভাঙে না। বরং দুইটা একসঙ্গে মিশে যায়। সেই মিশ্রণে একটা ভারসাম্যের মতো কিছু তৈরি হয়—যেখানে শব্দ আর নীরবতা একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না, শুধু পাশাপাশি থাকে।
সে বিছানায় বসে থাকে। চোখ বন্ধ করলে পুকুরের ধারের একটা গাছ ভেসে ওঠে। গাছটা একা দাঁড়িয়ে ছিল। পাতাগুলো নড়ছিল বাতাসে, কিন্তু সেই নড়াচড়ায় অস্থিরতার চিহ্ন ছিল না; বরং সেটাকে জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস বলেই মনে হয়। তখন তার মনে হয়, গাছটা হয়তো অপেক্ষা করছিল না। তবু দাঁড়িয়ে ছিল।
এই দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টাই তাকে ভাবায়।
মানুষ কি সত্যিই অপেক্ষা করে, নাকি শুধু সময়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকে, আর সময় নিজে নিজে এগিয়ে যায়?
রুমেলিয়া এর কোনো পরিষ্কার উত্তর খুঁজে পায় না। তবে ধীরে ধীরে সে টের পায়, তার ভেতরের অভিজ্ঞতাগুলো আর আগের মতো আলাদা আলাদা থাকে না। স্পর্শ, শব্দ, আলো—সবকিছু একে অন্যের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করে। এক ধরনের বিন্যাস তৈরি হয়, যেটাকে সঙ্গীতের মতো মনে হয়, কিন্তু তা শোনা যায় না।
এই সঙ্গীত কেউ লিখে রাখে না, কেউ বাজায়ও না। তবু সেটার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না।
কখনো কখনো তার মনে হয়, জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানের পুরোটা সময় কোনো রেখার মতো নয়। বরং সেটি একটি সুরের মতো, যা স্থির নয়; শুধু নিজের ভেতরে রূপ বদলায়।
রাত আরও ঘন হয়। গাছের পাতার শব্দ বাড়তে থাকে। প্যাঁচার ডাক আবার শোনা যায়। দূরে কোনো ট্রেন চলে যায়, যার হুইসেল আর শোনা যায় না, কিন্তু তার অনুপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
রুমেলিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। হাত কাঁচে রাখা।
সে নিশ্চিত নয় কিছু নিয়েই। শুধু এটুকু বোঝে—স্পর্শগুলো আলাদা নয়। তারা কোথাও গিয়ে এক হয়ে যায়, এমন এক জায়গায়, যেখানে শব্দ আর নীরবতার পার্থক্য আর টেকে না।
আর সেই অনির্দিষ্ট জায়গাতেই বাজে এক প্রাচীন সঙ্গীত—যার শুরু কখনো নির্ধারিত ছিল কি না, সেটাও পুরোপুরি বলা যায় না, আর শেষও কোথাও ধরা পড়ে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।