শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
পর্ব–৪ : দুই মেয়ের চোখে ভাঙা পরিবার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
"বাবা-মায়ের ঝগড়া শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সন্তানদের ভয় অনেক দিন বেঁচে থাকে।"
সত্যিটা জানার পর বাড়িটা আর বাড়ি নেই।
একই ছাদের নিচে চারটা মানুষ। একই টেবিলে ভাতের থালা। একই ফ্যানের বাতাস। তবু মাঝখানে একটা কাচের দেয়াল উঠে গেছে—দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না, শব্দ পার হয় না।
অভিক আর নিশি এখন মাপা কথা বলে। “মিশির স্কুলের বেতন দিয়েছ?” “মেঘলার কোচিংয়ের সময় বদলেছে।” এইটুকুই। প্রয়োজনের বাইরে শব্দ খরচ করা যেন নিষেধ।
সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে বাতাসের ওজন। আগে ঘরে ঢুকলেই ভাতের গন্ধের সাথে হাসির শব্দ মিশে থাকত। এখন শুধু ফ্যানের একঘেয়ে শোঁ শোঁ।
মেঘলা টের পায়।
সে আর প্রশ্ন করে না, “মা, বাবা তোমরা কথা বলো না কেন?” বারো বছর বয়সে কিছু কথা মুখে আনতে নেই, এটা সে শিখে গেছে। স্কুল থেকে ফিরে সোজা ঘরে ঢোকে। দরজা ভেজিয়ে দেয়, কিন্তু ছিটকিনি লাগায় না। যেন কেউ চাইলে আসতে পারে। কিন্তু কেউ আসে না।
টেবিলে বই খোলা থাকে। খাতায় অঙ্কের ঘর ফাঁকা। চোখ থাকে জানালার গ্রিলের বাইরে। নিচে কাকেদের ঝগড়া, রিকশার বেল, ফেরিওয়ালার ডাক—সব আগের মতো। শুধু এই ঘরটা থেমে গেছে।
একদিন অভিক দরজায় নক করল। “আসব?”
মেঘলা চমকে উঠে বই টেনে নিল। “এসো, বাবা।”
“কী করছিস?”
“পড়ছি।”
“অঙ্কটা হয়েছে?”
“হবে।”
একটা শব্দে উত্তর। আগে এই মেয়েটা বাবাকে পেলে বকবক থামাতে পারত না। অভিক চেয়ার টেনে বসল। কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও গলায় আটকে গেল। “স্কুলে কোনো সমস্যা?” প্রশ্নটা এত ঠুনকো শোনাল যে নিজেরই লজ্জা লাগল।
মেঘলা মাথা নিচু করে বলল, “না।”
অভিক উঠে এল। মেয়েটা মিথ্যে বলা শিখে গেছে। আর এই মিথ্যের দায় কার?
মিশি এখনো ছোট। সে বোঝে না, কিন্তু টের পায়।
রাতে ঘুমানোর সময় সে এখন আর গল্প শুনতে চায় না। সে দেখে। মা এক কোণে, বাবা আরেক কোণে। মাঝখানে তার ছোট্ট কোলবালিশটা যেন নো ম্যানস ল্যান্ড।
একদিন হঠাৎ বাবার আঙুল ধরে বলল, “তোমরা আগে তো একসাথে বসে টিভি দেখতে। এখন দেখো না কেন?”
অভিক হাসার চেষ্টা করল। হাসিটা মুখ পর্যন্ত এল না। “কাজ থাকে তো মা।”
মিশি বিশ্বাস করল না। বাচ্চারা মিথ্যে ধরতে পারে। বড়রা পারে না।
অফিসে ফোনটা বেজে উঠল। মেঘলার ক্লাস টিচার।
“অভিক সাহেব, কিছু মনে করবেন না। মেঘলা হঠাৎ খুব চুপচাপ হয়ে গেছে। ক্লাসে ডাকলে চমকে ওঠে। লাস্ট টার্মে যে মেয়ে ফার্স্ট হয়েছিল, সে এবার ম্যাথে ফেল করেছে। বাসায় কোনো সমস্যা?”
অভিক চেয়ারটা শক্ত করে ধরল। গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আছে।
“না মানে... আমরা একটু... পারিবারিক সমস্যা যাচ্ছে।”
“দেখুন, বাচ্চারা স্পঞ্জের মতো। বাসার সব শুষে নেয়। একটু খেয়াল রাখবেন।”
ফোনটা রাখতেই অভিকের মনে হলো, এতদিন সে আর নিশি ভাবছিল ঝড়টা তাদের দুজনের ঘরে। আসলে ঝড়টা পুরো বাড়ির ছাদ উড়িয়ে দিয়েছে।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখল, নিশি বারান্দায় বসে। হাতে চায়ের কাপ, চোখ দূরে। চোখের কোণে জল শুকিয়ে দাগ হয়ে আছে।
অভিক পাশে গিয়ে দাঁড়াল না। দরজায় দাঁড়িয়েই বলল, “মেঘলার স্কুল থেকে ফোন করেছিল।”
নিশি চমকাল না। যেন জানত, এই ফোনটা আসবেই।
“কী বলল?”
“নম্বর কমে গেছে। মেয়েটা ক্লাসে কথা বলে না।”
নিশি কাপটা নামিয়ে রাখল। হাত কাঁপছে।
“আমাদের জন্য... তাই না?”
অভিক উত্তর দিল না। কিছু প্রশ্নের উত্তর হয় না।
অনেকক্ষণ পর নিশি ফিসফিস করে বলল, “আমরা ভাবছি আমরা কষ্ট পাচ্ছি। আসল শাস্তি তো ওরা পাচ্ছে। যারা কিছুই করেনি।”
কথাটা ঘরের বাতাসে ঝুলে রইল।
রাত দুটো।
মিশির কান্নায় ঘুম ভাঙল দুজনের। নিশি ছুটে গেল। “কী হয়েছে মা? খারাপ স্বপ্ন?”
মিশি মাকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল, “তুমি আমাকে রেখে চলে যাচ্ছিলে। বাবাও ছিল না। আমি একা।”
নিশি মেয়েকে বুকে চেপে ধরল। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। শব্দ নেই।
দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে অভিক দেখল। এই দৃশ্যটা তার বিয়ের বারো বছরে দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য। চিৎকার না, মারামারি না। একটা বাচ্চার ভয়।
সে বুঝল, ভাঙা সংসারের সবচেয়ে জোরে শব্দ হয় সন্তানের বুকের ভেতর। বড়রা শুনতে পায় না।
মিশি ঘুমিয়ে গেলে নিশি ডাইনিংয়ে এল। অভিক আগে থেকেই বসা। টেবিলে দুই কাপ চা। ঠান্ডা হয়ে গেছে। কেউ ছোঁয়নি।
অনেকক্ষণ পর অভিক বলল, “এভাবে হবে না।”
নিশি মুখ তুলল। চোখের নিচে কালি। গলার স্বর ভাঙা। “কীভাবে হবে?”
“জানি না। কিন্তু রোজ রাতে মিশির এই কান্না... আমি আর নিতে পারছি না।”
নিশি দুই হাতে মুখ ঢাকল। “আমি কী করব বলো? আমি থাকলেও ওরা কষ্ট পাচ্ছে। আমি চলে গেলে...”
কথাটা শেষ করতে পারল না।
অভিক জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় একটা কুকুর ঘুমাচ্ছে। এত রাতে পুরো শহর ঘুমায়। শুধু তাদের ঘর জেগে থাকে।
সে আস্তে করে বলল, “আমাদের একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে, নিশি।”
নিশি চোখ বন্ধ করল। সে জানে, এই সিদ্ধান্ত মানে কী। এই সিদ্ধান্ত মানে মেঘলার স্কুলের খাতায় বাবার নামের পাশে ব্র্যাকেটে কিছু একটা লেখা হবে। এই সিদ্ধান্ত মানে মিশি আর কখনো জিজ্ঞেস করবে না, “তোমরা একসাথে গল্প করো না কেন?”
কারণ তখন ‘তোমরা’ শব্দটাই আর থাকবে না।
“আমি... আমি ভাবার সময় চাই,” নিশির গলা কাঁপল।
অভিক উঠে দাঁড়াল। “সময় নাও। কিন্তু বেশি না। কারণ সময় নিতে নিতে মেয়েদুটো শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
ঘরের ভেতর অন্ধকারটা আরও গাঢ় হলো।
দেয়ালঘড়িটা টিকটিক করছে। প্রতিটা সেকেন্ড যেন বলছে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আর এই দেরির দাম সবচেয়ে বেশি দিচ্ছে দুটো ঘুমন্ত মুখ।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।