কুয়াকাটার পথে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ভ্রমণকাহিনি
২ নভেম্বর ২০২৬
২০২৫ সালের ২০ মার্চ একা বেরিয়ে পড়েছিলাম কুয়াকাটার উদ্দেশে। সঙ্গে কোনো ভ্রমণসঙ্গী নেই, নেই দল বেঁধে ঘোরার আয়োজন। নিজের মতো করে কয়েকটি দিন কাটানোর ইচ্ছা নিয়েই যাত্রা শুরু।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এমভি কুয়াকাটা-১ লঞ্চে উঠলাম। আগে থেকেই বুক করা ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন। কেবিনে ঢুকে মনে হলো তিন তারকা হোটেলের ঘরে ঢুকলাম। বাইরে নদী, ভেতরে ঠান্ডা এসি আর ধবধবে বিছানা। দীর্ঘ পথের ক্লান্তির জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু দরকার ছিল না।
লঞ্চ ছেড়ে দেওয়ার পর ঢাকার পরিচিত আলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রইল। নদীর বুক চিরে লঞ্চ এগিয়ে চলেছে পটুয়াখালীর দিকে। কেবিনে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। তারপর রাতের খাবারের সময় হলো।
রাতের খাবার খেলাম লঞ্চের ডাইনিংয়ে। মেনুতে ছিল রূপচাঁদা মাছ ভাজি, কালোজিরা ভর্তা, ডাল-চচ্চড়ি, গরুর মাংসের কালো ভুনা, টক দই ও পানি। খাওয়া শেষে আবার কেবিনে ফিরে এলাম। বাইরে তখন রাতের অন্ধকার। লঞ্চের চলার শব্দের সঙ্গে নদীর বুকের নিস্তব্ধতা মিশে এক অন্য রকম পরিবেশ তৈরি করেছিল। কেবিনে বিশ্রাম নিতে নিতে রাত কেটে গেল।
পরদিন পটুয়াখালী পৌঁছে সেখান থেকে স্থানীয় যানবাহনে কুয়াকাটার পথে রওনা হলাম। কুয়াকাটায় পৌঁছে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিলাম। ভাড়া ১০০ টাকা। গন্তব্য হোটেল খান প্যালেস। সেখানে পৌঁছে প্রথমেই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম।
সকাল নয়টার দিকে বের হলাম সমুদ্রসৈকতের দিকে। কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট দিয়ে সৈকতে প্রবেশ করতেই সামনে বিশাল সমুদ্র। ঢেউ এসে বালুর ওপর আছড়ে পড়ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে। সৈকতে মানুষের আনাগোনা, কোথাও চায়ের দোকান, কোথাও ছাতা টাঙিয়ে বসার ব্যবস্থা।
আমি কখনো সমুদ্রের পাশে হাঁটছিলাম, কখনো ছাতার নিচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। মাঝেমধ্যে ডাব খেয়েছি। একা এসেছি বলে কোথাও যাওয়ার তাড়া ছিল না। যতক্ষণ ইচ্ছা বসে থাকা, আবার হঠাৎ উঠে হাঁটতে শুরু করা। কেউ সময় বেঁধে দিচ্ছে না, কেউ বলছে না এবার অন্য কোথাও যেতে হবে।
বিকেলের দিকে সৈকতের পশ্চিম পাশে সূর্যাস্ত দেখার জন্য অপেক্ষা করলাম। সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তের দিকে নেমে যাচ্ছিল। চারপাশের আলো বদলে যাচ্ছিল। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। দিনের শেষ আলো মিলিয়ে যাওয়ার পর সৈকত ছেড়ে হোটেলে ফিরলাম।
পরদিন ভোরে সূর্যোদয় দেখার জন্য রওনা হলাম গঙ্গামতির চরের দিকে। মোটরসাইকেলে যেতে ভাড়া লেগেছিল ৫০০ টাকা। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করার আগেই সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা ছিল।
গঙ্গামতির চরে গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়ল লাল কাঁকড়া। বালুর ওপর ছোট ছোট কাঁকড়া ছুটে বেড়াচ্ছিল। কাছে গেলেই দ্রুত গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আমি দু-তিনটিকে ধরার চেষ্টা করলাম। একটার দিকে এগোতেই সেটি চোখের পলকে গর্তে ঢুকে গেল। আরেকটির পেছনে ছুটলাম, সেটিও ফসকে গেল। শেষ পর্যন্ত একটিও ধরতে পারিনি।
কাঁকড়াগুলো যেন আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিল। একটু দূরে দেখছি, এগিয়ে যাচ্ছি, আর মুহূর্তেই সেটি উধাও। আবার অন্য কোথাও লাল রঙের ছোট্ট কিছু নড়তে দেখে সেদিকে ছুটছি। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই ফিরতে হলো।
সেখানেই সূর্যোদয় দেখলাম। রাতের অন্ধকার কাটিয়ে ধীরে ধীরে আলো ছড়িয়ে পড়ছিল। সমুদ্রের দিগন্তে নতুন দিনের সূচনা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখলাম। তারপর ফিরে এলাম কুয়াকাটায়।
এরপর গেলাম মিশ্রিপাড়া সীমা বৌদ্ধবিহারে। বিহারের ভেতরে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু অষ্টধাতুর তৈরি বুদ্ধমূর্তিটি নিজের চোখে দেখেছি। বিশাল মূর্তিটির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। এত বড় মূর্তির সামনে দাঁড়ালে নিজের উপস্থিতিটাই যেন ছোট মনে হয়। বুদ্ধদেবের শান্ত ও সৌম্য অবয়বের মধ্যে এক ধরনের গাম্ভীর্য রয়েছে। বিহারের ভেতরের পরিবেশও ছিল শান্ত।
কুয়াকাটা নামের উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রাচীন কুয়াটিও দেখতে গিয়েছিলাম। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, রাখাইন জনগোষ্ঠীর মানুষ সুপেয় পানির সংকট মেটাতে এখানে কুয়া খনন করেছিল। সেই কুয়া থেকেই এলাকার নাম হয়েছে কুয়াকাটা। কুয়াটি নিজে দেখেছি। চারপাশ ঘুরে দেখার সময় মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট কুয়াটির সঙ্গে একটি জনপদের পুরোনো ইতিহাস জড়িয়ে আছে। নিজের স্মৃতি ধরে রাখতে মোবাইল ফোনে বেশ কিছু ছবিও তুলেছিলাম।
এরপর গেলাম শুঁটকিপল্লিতে। সেখানে বাঁশের মাচার ওপর সারি সারি মাছ শুকানো হচ্ছিল। রূপচাঁদা, লইট্টা, ছুরি, পোয়া, চিংড়িসহ নানা ধরনের মাছ চোখে পড়ল। কোথাও মাছ পরিষ্কার করা হচ্ছে, কোথাও বাছাই চলছে, আবার কোথাও মাচার ওপর মাছ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
শুঁটকির গন্ধটা বেশ তীব্র। মাচার সারিগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেই গন্ধ নাকে এসে লাগছিল। একেকটি মাচায় কত মাছ যে ছড়ানো, হিসাব করা কঠিন। একজন মাছ পরিষ্কার করছেন, আরেকজন সেগুলো সাজিয়ে রাখছেন। কারও হাতে ঝুড়ি, কারও হাতে মাছ। কাজের মধ্যে সবাই ব্যস্ত। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাদের কাজ দেখলাম।
খাবারের ব্যাপারেও কোনো কার্পণ্য করিনি। সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া, শুঁটকি ভর্তা, চুইঝালে হাঁসের মাংস এবং মহিষের দুধের দইসহ স্থানীয় নানা খাবার চেখে দেখেছি। সামুদ্রিক মাছ ও কাঁকড়ার স্বাদ যেমন ভালো লেগেছে, তেমনি চুইঝালের হাঁসের মাংস আর ঘন মহিষের দুধের দইও উপভোগ করেছি।
দুই দিনের এই ভ্রমণে এক রাত কুয়াকাটায় ছিলাম। সময় খুব বেশি ছিল না, কিন্তু সমুদ্রসৈকত, সূর্যাস্ত, গঙ্গামতির সূর্যোদয়, বৌদ্ধবিহার, প্রাচীন কুয়া ও শুঁটকিপল্লি ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে।
ফেরার দিন পটুয়াখালী এসে সন্ধ্যা ছয়টায় আবার এমভি কুয়াকাটা-১ লঞ্চে উঠলাম। ফেরার জন্যও ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন। যাওয়ার সময় যে নদীপথ নতুন জায়গায় যাওয়ার আনন্দ নিয়ে এসেছিল, ফেরার সময় সেই পথেই ফিরে আসছিলাম কয়েকটি দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে।
ঢাকায় ফিরে এসেছি অনেক দিন হলো। তবু গঙ্গামতির চরের লাল কাঁকড়াগুলোর কথা মনে পড়ে। দু-তিনটিকে ধরার চেষ্টা করেও পারিনি। ওরা হয়তো এখনো গঙ্গামতির বালুর ওপর ছুটে বেড়াচ্ছে। আমি তাদের ধরতে পারিনি বলেই হয়তো সেই ছোট্ট ঘটনাটা এত দিন পরও মনে রয়ে গেছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।