সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প ৮ -সবাই ভালো আছে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
সবাই ভালো ছিল। শুধু যে মানুষটা সবাইকে ভালো রেখেছিল, সে ভালো ছিল না।
অভিককে কেউ জিজ্ঞেস করলে সে প্রায়ই হেসে বলত, “আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ভালো আছি।” কথাটা বলতে তার ভালোই লাগত। মেঘের পড়াশোনা ঠিকঠাক চলছে, মিশির নাচের ক্লাস হচ্ছে, বাড়ির কিস্তি সময়মতো দেওয়া যাচ্ছে, নিশি সংসার সামলাচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে তাদের জীবনে বড় কোনো অশান্তি নেই।
সবাই ভালো আছে।
শুধু নিশিকে কেউ আলাদা করে জিজ্ঞেস করে না, সে কেমন আছে।
নিশি ছিল এই বাড়ির নীরব কেন্দ্র। সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে জানত, কে কখন বের হবে, কার টিফিনে কী দিতে হবে, কার জামা ধোয়া হয়নি, কোন ওষুধটা শেষের দিকে। মেঘের প্রজেক্টের জন্য চার্ট কিনতে হবে, মিশির স্কুলের ড্রেসটা বিকেলে ধুতে হবে, অভিকের পরদিন অফিসে জরুরি মিটিং—তার ফাইলগুলোও গুছিয়ে রাখতে হবে।
কাজগুলো কেউ তাকে আলাদা করে দেয় না। কেউ বসে তালিকা বানায় না। তবু সবকিছু ঠিক সময়ে হয়ে যায়।
এমনভাবে হয় যে, সবাই একসময় ধরে নেয়—এগুলো তো এমনিই হয়।
অতিথি এলে নিশি হাসিমুখে চা এগিয়ে দেয়। আত্মীয়রা প্রশংসা করে বলে, “তুমি কী সুন্দর করে সংসার সামলাও!”
নিশি হেসে মাথা নাড়ে।
কেউ দেখে না, দুপুরের রান্না শেষ করে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। পা দুটো তখন ব্যথায় ভারী হয়ে আসে। কেউ জানে না, রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর সে বারান্দায় গিয়ে পাঁচ-দশ মিনিট বসে থাকে। কোনো বই পড়ে না, ফোন দেখে না। শুধু বসে থাকে।
মনে হয়, সারাদিন এত কথা, এত শব্দ, এত মানুষের মধ্যে থেকেও নিজের সঙ্গে কথা বলার সময়টুকু সে কোথায় হারিয়ে ফেলেছে।
একদিন মেঘ হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, তুমি কখন বিশ্রাম নাও?”
নিশি হেসে বলেছিল, “আমি তো ঠিক আছি।”
“ঠিক আছি”—কথাটা তার মুখে এত স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল যে, মেঘও আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
অভিকও বিশ্বাস করত, নিশি সব সামলে নিতে পারে। সে কখনো ভাবেনি, সব সামলাতে পারা আর সবসময় ভালো থাকা এক কথা নয়।
এক সন্ধ্যায় নিশির শরীরটা কেমন যেন খারাপ লাগছিল। জ্বর এসেছে বুঝতে পারছিল। তবু রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল। অভিক বলল, “আজ রান্না করতে হবে না। বাইরে থেকে কিছু নিয়ে আসি।”
নিশি মাথা নেড়ে বলল, “না, বাড়ির খাবারই ভালো।”
সেদিনও সে রান্না করল।
রাতে জ্বর বেড়ে গেল।
মেঘ পানি এনে দিল। মিশি ওষুধ খুঁজতে লাগল। অভিক বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি হচ্ছিল অন্য একটা কারণে—নিশি চুপ করে শুয়ে আছে। যে মানুষটাকে সে প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নড়াচড়া করতে দেখেছে, সে আজ বিছানা থেকে উঠছে না।
পরদিন সকালে নিশি আর উঠতে পারল না।
সকালের বাড়িটা অদ্ভুত চুপচাপ হয়ে গেল।
অভিক রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চাল কোথায়, ডাল কোন বয়ামে, মশলার কোনটা কী—সবকিছুই যেন হঠাৎ অপরিচিত মনে হলো।
মেঘ এসে বলল, “বাবা, আমার টিফিন?”
অভিক মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর প্রথমবার বুঝল, একটা সংসার শুধু টাকা দিয়ে চলে না। বাজারের ব্যাগ, রান্নাঘরের হাঁড়ি, ধোয়া কাপড় কিংবা সাজানো ঘরের আড়ালে এমন একটা শ্রম থাকে, যার কোনো বেতন নেই, কোনো ছুটি নেই, এমনকি নামও নেই।
নিশির কাজগুলো এতদিন চোখে পড়েনি, কারণ সেগুলো কখনো বাকি থাকেনি।
পরের দুদিনে বাড়ির ছন্দ বদলে গেল।
মেঘ নিজের জামা নিজে গুছিয়ে নিল। মিশি রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করতে গিয়ে বুঝল, এক কাপ চা বানাতেও কত কিছু মনে রাখতে হয়। অভিক বাজারে গিয়ে বুঝল, শুধু বাজার করাই নয়—কী লাগবে, কতটা লাগবে, কোনটা আগে কিনতে হবে, সেটাও একটা কাজ।
নিশি বিছানায় শুয়ে সব দেখছিল।
তার মনে একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছিল—সে অসুস্থ না হলে কি কেউ কখনো বুঝত, সে প্রতিদিন কতটা কাজ করে?
সেদিন রাতে অভিক তার পাশে এসে বসল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমরা একটা ভুল করেছি।”
নিশি তাকাল।
“তোমাকে খুব শক্ত মানুষ ভেবেছি। তাই ধরে নিয়েছি, তুমি সব পারবে।”
নিশির চোখ ভিজে উঠল।
সে ধীরে বলল, “আমি সবসময় শক্ত থাকতে চাইনি। শুধু মনে হয়েছে, আমি থেমে গেলে সব থেমে যাবে।”
অভিক নিশির হাতটা ধরে বলল, “সবাই তোমার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু তোমার ওপর কে নির্ভর করে—এই প্রশ্নটা আমরা কোনোদিন ভাবিনি।”
নিশি কিছু বলল না।
শুধু চোখ বন্ধ করে রইল।
কয়েকদিন পর সে সুস্থ হয়ে উঠল। সংসারও আবার আগের মতো চলতে শুরু করল। তবে আগের মতো আর রইল না।
রবিবারে নিশির কাজ কমে গেল। মেঘ নিজের কিছু কাজ নিজে করে। মিশি রান্নাঘরে হাত লাগায়। অভিক সপ্তাহের বাজারের ফর্দ নিজেই লেখে।
এক রবিবার দুপুরে নিশি বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। মেঘ এসে পাশে বসল। মিশি এসে তার হাতে একটা বই দিল। অভিক দূর থেকে বলল, “আজ রান্না নিয়ে তুমি কিছু ভাববে না।”
নিশি হেসে ফেলল।
অভিকও হাসল।
“সবাই ভালো আছে”—কথাটা এখনও সত্যি।
শুধু এবার তারা বুঝেছে, সেই “সবাই”-এর মধ্যে একজন মানুষকে বাদ দেওয়া যায় না।
নিশি নিজেও সেই পরিবারের একজন।
আর যে মানুষটা এতদিন সবাইকে আগলে রেখেছে, তাকে আগলে রাখার দায়িত্বও যে সবার—সেটা বুঝতে তাদের একটু দেরি হয়েছে।
তবে দেরিতে বোঝা আর কোনোদিন না বোঝার মধ্যে পার্থক্য আছে।
সেদিন থেকে নিশি আর “আমি ঠিক আছি” কথাটা শুধু অভ্যাসবশত বলে না।
কখনো সত্যিই ভালো না থাকলে সে বলে—
“আজ একটু বিশ্রাম দরকার।”
আর এবার কেউ তাকে থামতে বলে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।