উপন্যাসঃ-ছইয়ের নিচে জীবন
গল্প-৫-এক মায়ের নীরব লড়াই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৬ জুলাই, ২০২৬
হাসিমুখে ওষুধ বিক্রি করছিলেন, অথচ চোখের ভেতর লুকিয়ে ছিল অগণিত কষ্ট।
দুপুরের চড়া রোদে গঞ্জের মেঠোপথটা তখন খাঁ খাঁ করছে। ধুলো উড়িয়ে দু-একটা রিকশা ছাড়া রাস্তায় আর মানুষ নেই। ঠিক এমন নিস্তব্ধ সময়ে গ্রামের এক বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালেন এক নারী। পরনে গাঢ় লাল রঙের একটু মলিন শাড়ি, মাথায় আঁচল টানা, হাতে ধরা প্লাস্টিকের একটা ব্যাগ। ভেতরে নানা পদের গাছগাছড়া, শিকড়-বাকড় আর ছোট ছোট কাচের শিশি। মুখে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে তিনি ডাক দিলেন, "ও বাড়ির বউ-ঝিরা, বাতের ওষুধ নিবা নাকি গো? কবিরাজি শিকড় আছে, দাঁতের মাজন আছে!"
ওপর থেকে দেখলে এ যেন এক যাযাবর বেদে নারীর ওষুধ বিক্রির সাধারণ দৃশ্য। হাসিটা এত উজ্জ্বল যে দূর থেকে মনে হয় পৃথিবীর সব সুখ ওই এক চিলতে হাসিতেই জমা হয়ে আছে। কিন্তু কাছে গিয়ে মুখের ভাঁজগুলোর দিকে তাকালেই চোখের কোণে জমে থাকা গভীর ক্লান্তির ছাপটা আর এড়ানো যায় না। সেই হাসির আড়ালেই চাপা পড়ে আছে এক মায়ের নীরব আর্তনাদ, অভাবের তাড়না আর সংসার টেনে নেওয়ার অপরিসীম সংগ্রাম।
এই নারীর নাম রশিদা। নদীর ঘাটে নোঙর করে রাখা ছোট কাঠের নৌকার ছইয়ের নিচে তার বসতি। চারপাশের কাঠের পাটাতন পেরিয়ে যেখানে হু হু করে ঢুকে পড়ে নদীর বৈরী বাতাস। পুরুষের রোজগার যখন অনিশ্চিত, সাপ খেলা বা ঝাড়ফুঁকের কদর যখন বাজারে তলানিতে, তখন সংসারের হাল শক্ত হাতে ধরতে হয় রশিদার মতো নারীদেরই।
ভোররাত থেকেই রশিদার দিন শুরু হয়। অন্ধকার থাকতে থাকতে নৌকার এক কোণে উনুন জ্বালিয়ে রান্না বসানো, ছেলেমেয়ের মুখে দুটো ভাত তুলে দেওয়া, তারপর নদীর টলটলে জলে ভাসমান সংসারটাকে গুছিয়ে নেওয়া — সব একাই সামলান তিনি। এত কাজ সেরে সূর্যের আলো একটু কড়া হতেই কাঁধে ঝুলি নিয়ে ডাঙার দিকে হাঁটা শুরু করেন। গ্রাম থেকে গ্রামে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলা, মানুষের দরজায় দরজায় যাওয়া — এই লড়াই সহজ নয়।
জীবিকার এই পথে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। পথে-ঘাটে কত কটূক্তি, অবহেলা আর তাচ্ছিল্য সইতে হয় তাদের। কেউ দরজার সামনে থেকেই তাড়িয়ে দেয়, কেউ ঠাট্টা করে তাদের কবিরাজি বিদ্যা নিয়ে। কিন্তু রশিদার মুখে কোনো ক্ষোভ থাকে না, প্রতিবাদের ভা
ষা থাকে না। তিনি শুধু নীরবে হাসেন। তিনি জানেন, রাগ করে কথা কাটাকাটি করলে দিনশেষে ঘরের ছোট বাচ্চাটার জন্য এক কেজি চাল কেনা হবে না। আত্মসম্মানের চেয়েও সন্তানের পেটের ক্ষুধা অনেক বড়, অনেক নির্মম।
এই মাঝবয়সী নারী কেবল এক ভাঙা সংসারের হাল ধরে থাকা মানুষ নন, তিনি এক অপরাজেয় শক্তির প্রতীক। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যে কটা টাকা আয় হয়, তা দিয়ে চাল-ডাল আর অসুস্থ শাশুড়ির ওষুধ কিনে যখন গোধূলিবেলায় তিনি নদীর ঘাটে ফিরে আসেন, তখন তার পা দুটো আর চলতে চায় না। তবুও নৌকার গলুইয়ে বসেই যখন দেখেন ছোট সন্তানটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠেছে, তখন সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি আর অপমান এক মুহূর্তে নদীর জলে ধুয়ে মুছে যায়।
আমাদের সমাজে যে নারীরা আলোর সামনে আসেন না, যাদের কোনো স্বীকৃতি থাকে না, রশিদা তাদেরই একজন। কোনো করুণা বা সহানুভূতি ছাড়াই তারা প্রতিদিন বেঁচে থাকার নতুন ইতিহাস লেখেন। ঘরের ভেতরের হাহাকারকে হাসির আড়ালে ঢেকে রেখে তারা আমাদের শিখিয়ে যান — পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে একজন মা কখনো হার মানেন না। রশিদার এই নীরব লড়াই কেবল এক বেদে নারীর গল্প নয়, এটি পৃথিবীর সব সংগ্রামী মায়ের শাশ্বত জয়গাথা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।