হারিয়ে যাওয়া গ্রামের গল্প
যে উঠোনে সবাই বসত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ০২ আগষ্ট, ২০২৬
গ্রামের উঠোন আজও আছে, শুধু সেখানে মানুষের বসা কমে গেছে।
একটা সময় ছিল, সন্ধ্যা নামলেই উঠোন যেন নতুন করে জেগে উঠত। কারও হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, কেউ এক বাটি মুড়ি নিয়ে বসেছেন, কেউ সারাদিনের মাঠের কাজের গল্প করছেন। পাশের বাড়ির মানুষও কোনো নিমন্ত্রণ ছাড়াই এসে বসে পড়তেন। কে ডাকল, কে ডাকল না—এসব নিয়ে কেউ ভাবতেন না। গ্রামের উঠোন ছিল সবার জন্য খোলা একটি আপন জায়গা।
সন্ধ্যা গড়াত, আর উঠোন ভরে উঠত মানুষের কোলাহলে। ছোটরা দৌড়ে বেড়াত, বড়রা গল্পে মেতে উঠতেন। কেউ পুরোনো দিনের স্মৃতি বলতেন, কেউ ফসলের খবর, কেউ বাজারের গল্প। কখনো এমন হাসির রোল উঠত যে পাশের বাড়ির মানুষও কৌতূহল নিয়ে তাকাতেন। তখন গল্প করার জন্য আলাদা কোনো কারণের প্রয়োজন হতো না। মানুষই ছিল মানুষের সবচেয়ে বড় সঙ্গ।
শীতের রাতে সেই উঠোনেই আগুন পোহানোর আসর বসত। গরমের রাতে খাট পেতে আকাশভরা তারা দেখা হতো। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিরক্তির বদলে গল্পই আরও জমে উঠত। সারাদিনের ক্লান্তি যেন সেই উঠোনেই এসে হালকা হয়ে যেত।
আজও উঠোন আছে, কিন্তু তার ব্যবহার বদলে গেছে। সন্ধ্যা হলেই অনেক বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরাও প্রায়ই আলাদা আলাদা পর্দার সামনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একই ছাদের নিচে থেকেও একসঙ্গে বসে গল্প করার সময় যেন ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
এর জন্য শুধু প্রযুক্তিকে দায়ী করলে পুরো সত্য বলা হবে না। মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, ব্যস্ততা বেড়েছে, কাজের চাপ বেড়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভিড়ে আমরা ধীরে ধীরে হারিয়েছি একসঙ্গে বসে কথা বলার অভ্যাস। আগে প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখ সবার জানা ছিল। এখন অনেক সময় পাশের বাড়ির মানুষের খোঁজও মাসের পর মাস জানা হয় না।
অথচ গ্রামের উঠোন ছিল শুধু ইট-মাটির একটি খোলা জায়গা নয়। এখানেই বড়রা ছোটদের জীবন চিনতে শেখাতেন। এখানেই গ্রামের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতো, বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হতো, ঝগড়ার মীমাংসা হতো, উৎসবের পরিকল্পনাও তৈরি হতো। একটি উঠোন অনেক সময় পুরো গ্রামের সামাজিক বন্ধনকে ধরে রাখত।
আজকের শিশুরা আধুনিক বাড়ি দেখছে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, কিন্তু উঠোনভরা সেই সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা তাদের নেই। তারা হয়তো জানেই না, একসঙ্গে বসে গল্প করার মধ্যেও কত আনন্দ, কত শিক্ষা আর কত সম্পর্ক লুকিয়ে থাকে। মানুষের কাছাকাছি আসার প্রথম পাঠ অনেকেই শিখত এই উঠোনেই।
তবু আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। এখনো অনেক গ্রামে সন্ধ্যা হলে কয়েকজন মানুষ উঠোনে বসেন। কেউ চা খান, কেউ গল্প করেন, কেউ নীরবে অন্যের কথা শোনেন। এমন দৃশ্য দেখলে মনে হয়, গ্রামের প্রাণ এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে খুব বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন নেই।
প্রথমত, নিয়ম করে একসঙ্গে বসার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিবারের সবাই উঠোনে বা বারান্দায় কিছু সময় কাটাতে পারেন। সেই সময়টুকু মোবাইল থেকে দূরে রেখে শুধু গল্প করলেই সম্পর্কের অনেক দূরত্ব কমে আসে।
দ্বিতীয়ত, উঠোনকে আবার মানুষের বসার উপযোগী করে তুলতে হবে। একটি মাদুর, কয়েকটি চেয়ার, পর্যাপ্ত আলো আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ—এই সামান্য আয়োজনই মানুষকে একসঙ্গে বসতে উৎসাহিত করতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রতিবেশীর সঙ্গে সহজ যোগাযোগের অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছাড়াই খোঁজ নেওয়া, কিছুক্ষণ গল্প করা কিংবা এক কাপ চা ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই সম্পর্কের গভীরতা তৈরি হয়। মানুষের সেই শূন্যতা কোনো প্রযুক্তিই পূরণ করতে পারে না।
হয়তো আগের মতো প্রতিটি উঠোন আর প্রতিদিন মানুষে ভরে উঠবে না। তবু যদি কোনো এক সন্ধ্যায় দেখি কয়েকজন মানুষ গল্পে মগ্ন, উঠোনজুড়ে শিশুরা খেলছে, আর পাশের বাড়ির কেউ নিঃসংকোচে এসে বসে পড়েছেন, তাহলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হবে—গ্রামের সেই পুরোনো উঠোন এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। হয়তো সে শুধু আমাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।