কোর্টপাড়ায় একদিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ভ্রমণকাহিনি | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সেদিন কোর্টপাড়ায় যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। সকালে পুরান ঢাকার দিকে বের হয়েছিলাম। কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই, নির্দিষ্ট কোনো কাজও নেই। গুলিস্তান পেরিয়ে পুরান ঢাকার দিকে যেতে যেতে মনে হলো, গাড়ি থেকে নেমে একটু হাঁটা যাক। বহুবার পাশ দিয়ে গেছি, কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখিনি।
কোর্ট কাচারির আশপাশে নামতেই প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ল, তা হলো মানুষের তাড়াহুড়ো। কেউ ফাইল বগলে দ্রুত হাঁটছেন, কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছেন, কেউ কাগজপত্র হাতে কারও অপেক্ষায়। কয়েকজন কালো কোট পরা আইনজীবী এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছেন। তাঁদের হাঁটার মধ্যে এমন একটা তাড়া, মনে হলো পাঁচ মিনিটও এখানে নষ্ট করার সুযোগ নেই।
পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একজন ফোনে বললেন, “আপনি কোথায়? আমি গেটের সামনে।” আরেকজনকে বলতে শুনলাম, “কাগজটা নিয়ে আসছেন তো?”
একটা ছোট চায়ের দোকান দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। কয়েকটা বেঞ্চ, সামনে কেটলি, পাশে বিস্কুট আর পাউরুটি। বসে এক কাপ চা চাইলাম। চা ঢালতে ঢালতে দোকানদার জিজ্ঞেস করলেন, “কোর্টে কাজ আছে?” বললাম, “না, ঘুরতে এসেছি।” লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, “কোর্টে আবার ঘুরতে আসে নাকি?” বললাম, “আজ থেকে আসবে।” তিনি হেসে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলেন।
চা খেতে খেতে চারপাশ দেখছিলাম। তখনই চোখে পড়ল একজন বয়স্ক লোককে। হাতে একটা ফাইল। পাশে একজন মহিলা। বৃদ্ধটি মাঝে মাঝে ফাইল খুলছেন, কয়েক পৃষ্ঠা দেখছেন, আবার বন্ধ করছেন। তারপর চুপচাপ বসে থাকছেন। একবার মহিলাটি কিছু জিজ্ঞেস করলেন। তিনি মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন। কথাটা শুনতে পেলাম না। কী কারণে এসেছেন, সেটাও জানলাম না। আমি আর জানতে চাইলাম না।
কিছু দূর হাঁটতে বের হলাম। পুরোনো ভবনগুলোর দেয়ালে কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও পুরোনো রং কালচে হয়ে আছে। কোথাও পুরোনো জানালা, কোথাও লম্বা বারান্দা। মানুষের ভিড়ের মাঝেও এসব ভবনের দিকে তাকালে মনে হয়, শহরের অনেক কিছু বদলে গেলেও কিছু জায়গা এখনো পুরোনো চেহারাটা ধরে রেখেছে।
কিন্তু রাস্তার জীবন এসব ভাবার বেশি সময় দেয় না। একজন দ্রুত পাশ কাটিয়ে গেলেন। পেছন থেকে আরেকজন ডাকলেন, “ভাই, একটু দাঁড়ান।” তিনি থামলেন। দুজন রাস্তার একপাশে সরে গিয়ে কথা বলতে লাগলেন। কী কথা হলো, শুনলাম না।
আরেকটু এগিয়ে ফুটপাতের পাশে কয়েকজনকে কাগজ নিয়ে বসে থাকতে দেখলাম। কেউ পড়ছেন, কেউ লিখছেন। কেউ আবার ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝেমধ্যে মানুষ এসে কিছু জিজ্ঞেস করছে, তারপর আবার চলে যাচ্ছে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ মানুষের আসা-যাওয়া দেখলাম।
তারপর আবার চায়ের দোকানের দিকে ফিরলাম। সকালের সেই বৃদ্ধ লোকটি তখনও বসে আছেন। ফাইলটা এবার তাঁর হাঁটুর ওপর। পাশের মহিলা নেই। তিনি একবার ফাইল খুললেন, কয়েকটা কাগজ দেখলেন, তারপর ধীরে ধীরে সেটি বন্ধ করে পাশে রাখলেন। কিছুক্ষণ পর একজন তরুণ এসে তাঁর পাশে বসলেন। বৃদ্ধ লোকটি তাঁর দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেন। তরুণটি বলল, “হবে। আপনি চিন্তা করবেন না।” বৃদ্ধ লোকটি আর কিছু বললেন না। শুধু মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
দুপুরের দিকে ক্ষুধা লাগল। কাছের একটা ছোট খাবারের দোকানে ঢুকে ভাত খেলাম। সাধারণ খাবার—ভাত, ডাল, তরকারি আর মাছ। পাশের টেবিলে দুজন কোনো একটা মামলা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তারিখ, কাগজ, আইনজীবী—এমন কিছু শব্দ বারবার কানে আসছিল। আমি নিজের খাবার খাচ্ছিলাম, তাঁরা নিজেদের কথা বলছিলেন।
খাওয়া শেষে বাইরে এসে দেখি দুপুরের রোদ বেশ চড়া। তবু কোর্টপাড়ার ছোটাছুটি কমেনি। চায়ের দোকানে নতুন মানুষ এসেছে। কেউ দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছেন, কেউ ফোনে কথা বলছেন। একজন ফাইল বগলে দ্রুত রাস্তা পার হলেন। একজন রিকশাওয়ালাকে থামিয়ে কোথায় যেতে হবে তা বোঝাচ্ছেন।
একজন কাগজ বিক্রেতার সঙ্গে কথা হলো। জিজ্ঞেস করলাম, “এত কাগজ লাগে?” তিনি হেসে বললেন, “কোর্টের কাজ কাগজ ছাড়া চলে?” বলেই নিজের কাজে ফিরে গেলেন।
বিকেলের দিকে আবার সেই চায়ের দোকানের সামনে এলাম। বৃদ্ধ লোকটি এবারও সেখানে। তবে এবার একা। ফাইলটা পাশে রাখা। তিনি চুপচাপ বসে আছেন। সকাল থেকে কতবার যে তাঁর সামনে দিয়ে মানুষ গেছে, কতজন এসেছে, কতজন চলে গেছে—তার কোনো হিসাব নেই। অথচ তিনি প্রায় একই জায়গায় বসে আছেন।
কোর্টপাড়ার দিনও তখন শেষের দিকে। সকালের অনেক মুখ আর নেই। তাদের জায়গায় নতুন মানুষ এসেছে। নতুন ফাইল, নতুন তাড়া, নতুন অপেক্ষা।
ফিরতে ফিরতে রিকশায় বসে আছি। পেছনে পুরোনো ভবন, কালো কোট, চায়ের দোকান। আর সকালে যে বৃদ্ধ লোকটিকে ফাইল হাতে বসে থাকতে দেখেছিলাম, ফেরার সময়ও তাঁকে সেখানেই দেখলাম। ফাইলটা তখন পাশে রাখা। তিনি এখনও অপেক্ষা করছিলেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।