সিরিজ -আমাদের না-বলা কথা।
গল্প-১০
আলোটা একদিন ফিরবেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৮ আগষ্ট, ২০২৬
সন্ধ্যা নামতে তখনও একটু দেরি। তৃষা টেবিলে বসে পড়ছিল। সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা। ঘরে আর কোনো শব্দ নেই, শুধু ফ্যানের একটানা ঘুরপাক আর পাতা ওল্টানোর শব্দ।
হঠাৎ ফ্যানটা থেমে গেল। বাতিটা দপ করে নিভে গেল।
প্রথমে ভাবল লোডশেডিং। কিন্তু জানালার ফাঁক দিয়ে পাশের বাড়িতে আলো জ্বলতে দেখে বুকটা ধক করে উঠল।
লাইন কেটে দিয়েছে।
দরজার সামনে বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। একটু আগেই বিদ্যুৎ অফিসের লোকেরা এসে ঘুরে গেছে। বাবা অনেক করে বুঝিয়েছিলেন।
"আর কটা দিন সময় দেন ভাই। কাজ পেলেই বিলটা দিয়ে দেব।"
লোকটা বলেছিল, "কিছু করার নেই ভাই, আমাদেরও নিয়ম মানতে হয়।"
তারপর তারা চলে গেছে। ঘরের আলোটাও সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।
রফিক আগে নির্মাণের কাজে নিয়মিত মজুরি পেত। এখন কাজ জোটে ভাগ্যের ওপর। কখনো তিন দিন কাজ, তারপর চার দিন বসা। বাজারের ব্যাগ আর আগের মতো ভরে না। হিসাব করতে করতে সংসারটা যেন দিনে দিনে আরও ছোট হয়ে আসছে।
সালমা এসব নিয়ে বেশি কথা বলে না। অনেকদিন হলো নিজের জন্য কিছু চাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। নতুন শাড়ি, স্যান্ডেল, এসব নিয়ে আর ভাবে না। শুধু একটা কথাই বারবার বলে, "মেয়েটার পড়াটা যেন না থামে।"
সেই রাতে আলমারি থেকে একটা ছোট মোমবাতি বের করল।
তৃষা সেটা জ্বালিয়ে আবার বই খুলল।
বাবা বলল, "আজ থাক না মা, এই আলোয় পড়ে কী হবে?"
তৃষা বই থেকে মুখ তুলে বলল, "আজ না পড়লে কালও পারব না বাবা।"
এর বেশি কিছু বলল না।
রফিকও আর জোর করল না। বারান্দায় গিয়ে বসে রইল। অন্ধকারে কাঁদলে কেউ টের পায় না।
স্কুলে গিয়েও তৃষা কিছু বলেনি। বন্ধুরা নতুন বই, কোচিং, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলছিল। ও শুধু শুনছিল। মনে মনে ভাবছিল, একটা চাকরি পেলেই বাবাকে আর কারও সামনে হাতজোড় করে দাঁড়াতে হবে না।
এভাবেই কয়েকটা রাত কেটে গেল। মোমবাতি ছোট হয়ে আসতে লাগল, কিন্তু তৃষার জেদটা ছোট হলো না।
একদিন পাশের বাড়ির আনোয়ার চাচা সব জানতে পারল।
এসে শুধু বলল, "এত কষ্টে ছিলি, বলিসনি কেন?"
রফিক একটু হেসে বলল, "সব কষ্ট কি মুখে বলা যায় চাচা?"
পরদিন আনোয়ার চাচা আর পাড়ার আরও দুজন মিলে বকেয়া বিলটা দিয়ে এলো।
সন্ধ্যায় তৃষা কাঁপা হাতে সুইচ চাপল। বাতিটা জ্বলে উঠল। অনেকদিন পর ঘরটা আবার আলোয় ভরে গেল।
সালমা আঁচলে চোখ মুছল। রফিক মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "এবার একটু বিশ্রাম নে মা।"
তৃষা হেসে বলল, "পরীক্ষাটা শেষ হলেই অনেক বিশ্রাম নেব।"
তারপর আবার বইয়ে চোখ রাখল।
দুই বছর পর।
সেই টিনের ঘরটা এখনও আছে। তবে চালটা বদলেছে, দেয়ালে নতুন রঙের ছোঁয়া।
এক সকালে তৃষা প্রথম বেতনের টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরল। বাবাকে নিয়ে বাজারে গেল।
সালমা ভেবেছিল, হয়তো চাল ডাল কিনবে। কিন্তু তৃষা আগে ঢুকল একটা শাড়ির দোকানে। মায়ের জন্য একটা নীল শাড়ি কিনল। তারপর বাবার জন্য একটা সাদা পাঞ্জাবি।
রফিক একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল, "এত টাকা খরচ করলি কেন?"
তৃষা হেসে বলল, "একদিন তোমরা আমার জন্য সব আটকে রেখেছিলে। আজ আমার পালা।"
সালমা শাড়িটা হাতে নিয়ে কিছু বলতে পারল না। রফিকও না। শুধু মেয়ের মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল।
বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে। এক এক করে আশপাশের সব ঘরে আলো জ্বলছে। তাদের ঘরেও আলো জ্বলছে।
রফিক জানে, এই আলো শুধু বিদ্যুতের নয়। এই আলো এসেছে অনেক রাতের না ঘুম, অনেক অপূর্ণ ইচ্ছে আর একটা মেয়ের জেদ থেকে। সেই জেদটাই শেষ পর্যন্ত তাদের অন্ধকারটা হারিয়ে দিয়েছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।