সিএমসিতে একদিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ভ্রমণ কাহিনি। ১৬ আগস্ট ২০২৬
ভ্রমণ বলতেই আমাদের চোখের সামনে পাহাড়, সমুদ্র, নদী কিংবা অচেনা কোনো শহরের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু সব যাত্রা তো বেড়ানোর জন্য হয় না। জীবনের প্রয়োজনে এমন কিছু পথেও যেতে হয়, যেখান থেকে ফেরার পর মনে হয়—এই যাওয়াটাও বুঝি এক ধরনের ভ্রমণ ছিল।
সিএমসিতে যাওয়ার দিনটা আমার কাছে তেমনই একটি দিন।
সকালে যখন বের হলাম, শহর তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। রাস্তায় ধীরে ধীরে গাড়ি বাড়ছে। দোকানপাটের শাটার উঠছে। রাস্তার পাশের চায়ের দোকানগুলোতে দু-চারজন করে মানুষ জড়ো হচ্ছে।
আমি বাসের জানালার পাশে বসে চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ছিলাম।
অন্যদিনের মতো সেদিন রাস্তার দৃশ্য দেখছিলাম না। মাথার ভেতর একটা কথাই ঘুরছিল—সিএমসিতে গিয়ে কী হবে? কী জানতে পারব? কতক্ষণ থাকতে হবে?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর আমার কাছে ছিল না।
হাসপাতালের কাছে পৌঁছাতেই প্রথমে চোখে পড়ল মানুষের ভিড়। কেউ একা এসেছে, কেউ পরিবারের কাউকে সঙ্গে নিয়ে। কারও হাতে রিপোর্টের ফাইল, কেউ ফোনে নিচু গলায় কথা বলছে। কেউ দ্রুত পায়ে এদিক-ওদিক যাচ্ছে, কেউ আবার বেঞ্চে বসে চুপচাপ অপেক্ষা করছে।
মানুষের ভিড়টা দেখতে দেখতে একটা কথা মনে হলো—একই জায়গায় এত মানুষ, অথচ প্রত্যেকের চিন্তা আলাদা।
হাসপাতালে ঢুকলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। এখানে কেউ শুধু ঘুরতে আসে না। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো প্রয়োজন নিয়ে আসে। কারও নিজের চিকিৎসা, কারও বাবা-মা, কারও সন্তান, আবার কারও খুব কাছের একজন মানুষ।
করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশ দেখছিলাম।
একজন বয়স্ক মানুষ বেঞ্চে বসে কাগজপত্র দেখছিলেন। একটু পরপর ফাইল খুলছেন, একটা কাগজ বের করছেন, মন দিয়ে পড়ছেন, আবার সেটি গুছিয়ে রাখছেন। পাশে অল্পবয়সী একজন ছেলে বসে ছিল। সম্ভবত তাঁর ছেলে। মাঝেমধ্যে বাবার দিকে ঝুঁকে কিছু বলছিল।
আমি তাঁদের চিনি না। কথাও বলিনি।
তবু দৃশ্যটা কেন যেন চোখে আটকে গেল।
আরেকটু দূরে একজন মা তাঁর ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন। শিশুটি আশপাশের কিছুই বুঝতে পারছে না। মায়ের গায়ে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে বসে আছে। মা মাঝে মাঝে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
শিশুটির মুখে কোনো চিন্তা নেই।
কিন্তু মায়ের মুখের দিকে তাকালে বোঝা যাচ্ছিল, তাঁর ভেতরে অনেক কিছু চলছে।
হাসপাতালে বসে এমন দৃশ্যের অভাব নেই।
সেদিন সিএমসিতে বসে বুঝলাম, মানুষ আসলে কত কিছু নিয়ে অপেক্ষা করে।
কেউ ডাক্তারের সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ রিপোর্টের জন্য। কেউ অপারেশন থিয়েটারের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ ফোন হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে—কখন ভেতর থেকে একটা খবর আসবে।
আর কেউ হয়তো শুধু একটা ভালো খবর শুনবে বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছে।
বাইরে থেকে দেখলে অপেক্ষা খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। কিন্তু যে অপেক্ষা করে, সে জানে একটা মিনিট কখনো কখনো কত দীর্ঘ হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ক্যান্টিনে গেলাম। এক কাপ চা নিলাম।
খুব সাধারণ চা। এমন কোনো চা নয়, যার কথা আলাদা করে মনে রাখার মতো। কিন্তু সেদিন সেই চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছিল।
চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, কেউ চুপচাপ চা খাচ্ছে। কেউ ফোনে কথা বলছে। কেউ পাশের মানুষটির সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলছে। কারও চোখে ঘুম নেই, কারও মুখে ক্লান্তি।
হঠাৎ মনে হলো, আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনটাকে কত সহজে স্বাভাবিক বলে ধরে নিই।
সকালে ঘুম থেকে ওঠা, নাশতা করা, কাজে বের হওয়া, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে এক কাপ চা খাওয়া—এসবের জন্য আমরা কখনো ভাবি না যে এগুলোও জীবনের বড় পাওয়া।
হাসপাতালে এলে সেই হিসাবটা একটু বদলে যায়।
তখন মনে হয়, সুস্থ শরীরে একটা সাধারণ দিন কাটাতে পারাটাই আসলে অনেক বড় ব্যাপার।
দুপুরের পর হাসপাতালের ব্যস্ততা আরও বেড়ে গেল। একের পর এক মানুষ আসছে, যাচ্ছে। কেউ রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তারের কক্ষের দিকে যাচ্ছে। কেউ বেরিয়ে এসে ফোনে বাড়ির মানুষকে খবর দিচ্ছে। কেউ আবার নতুন কিছু পরীক্ষার কাগজ হাতে নিয়ে পরের কাউন্টারের দিকে ছুটছে।
একই জায়গায় কত রকমের মুখ।
কেউ একটু স্বস্তি নিয়ে বের হচ্ছে। কেউ আরও কিছু পরীক্ষার কথা শুনে চুপ হয়ে যাচ্ছে। কারও মুখে হাসি ফুটছে, আবার কারও মুখ আরও ভারী হয়ে উঠছে।
সবকিছু খুব কাছ থেকে দেখছিলাম।
বিকেলের দিকে হাসপাতালের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। দিনের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। বাইরে রাস্তায় গাড়ি চলছে, মানুষ ছুটছে, দোকানপাটে ভিড় বাড়ছে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
আমার ভেতরে তখন যত চিন্তা, যত অস্থিরতা—বাইরের পৃথিবীতে তার কোনো চিহ্ন নেই।
শহর নিজের মতো চলছে।
কেউ জানে না, কে কী নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে বসে আছে। কারও জন্য রাস্তার গাড়ি থেমে নেই। দোকান বন্ধ হয়ে যায়নি। মানুষের কাজকর্মও থেমে নেই।
জীবনও বোধহয় এমনই।
কারও দিন ভালো যাচ্ছে, কারও দিন খারাপ। কারও ঘরে আনন্দ, কারও ঘরে দুশ্চিন্তা। কেউ নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ একটা পুরোনো কষ্ট বয়ে নিয়ে হাঁটছে।
তারপরও সময় থেমে থাকে না।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করল। সিএমসি থেকে বেরিয়ে আবার বাসের জানালার পাশে বসলাম।
সকালে যে রাস্তা দিয়ে এসেছিলাম, ফিরছিলাম সেই একই রাস্তা ধরে।
কিন্তু ফেরার সময় রাস্তার সবকিছু কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল।
সকালে মনে ছিল শুধু সিএমসিতে পৌঁছানোর চিন্তা। আর ফেরার সময় মাথায় ঘুরছিল সারাদিনের দেখা মানুষগুলোর মুখ।
সেদিন কোনো পাহাড় দেখিনি।
সমুদ্র দেখিনি।
কোনো দর্শনীয় জায়গাতেও যাইনি।
তবু মনে হচ্ছিল, একটা ভ্রমণ শেষ করে বাড়ি ফিরছি।
হয়তো সব ভ্রমণে নতুন কোনো জায়গা দেখা হয় না। কিছু ভ্রমণ আমাদের নিজের জীবনটার দিকেই নতুন করে তাকাতে শেখায়।
সিএমসিতে কাটানো দিনটা আমাকে সেদিন তেমনই কিছু শিখিয়েছিল।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, আমরা জীবনে কত কিছুর পেছনে ছুটি। আরও টাকা চাই, আরও ভালো বাড়ি চাই, আরও সাফল্য চাই। একটার পর একটা চাওয়া আমাদের সঙ্গে চলতেই থাকে।
কিন্তু হাসপাতালে এসে মানুষ অনেক সময় অন্য একটা হিসাব শিখে।
সুস্থ থাকা কত বড় পাওয়া।
নিজের মানুষগুলোর পাশে থাকা কত বড় সৌভাগ্য।
আর দিনের শেষে কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়া নিজের বাড়ির দরজায় ফিরে আসতে পারা—সেটাও যে কম কিছু নয়।
সিএমসিতে কাটানো ওই দিনটার কথা তাই মনে থাকবে।
হাসপাতালের করিডোর, মানুষের ভিড়, অপেক্ষায় থাকা মুখগুলো, ক্যান্টিনের এক কাপ চা, আর বিকেলের সেই নরম আলো—সব মিলিয়ে দিনটা বাইরে থেকে খুব সাধারণই ছিল।
কিন্তু আমার কাছে দিনটা সাধারণ হয়ে থাকেনি।
সেদিন ফিরে এসে মনে হয়েছিল, জীবনের অনেক বড় সত্য আসলে খুব ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
সুস্থ শরীরে ঘুম থেকে ওঠা।
নিজের হাতে এক কাপ চা তুলে নেওয়া।
প্রিয় মানুষের সঙ্গে দুটো কথা বলা।
দিন শেষে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে আসা।
এসবের মূল্য আমরা তখনই বুঝি, যখন কোনো কারণে এগুলো আর সহজ থাকে না।
সিএমসি থেকে ফেরার পথে তাই মনে মনে একটা কথাই বলছিলাম—
জীবন যতদিন সুস্থভাবে বাঁচার সুযোগ দেয়, ততদিন তার ছোট ছোট আনন্দগুলোকে অবহেলা না করাই ভালো। কারণ একদিন হয়তো বুঝব, আমরা যে সাধারণ জীবনটাকে এত সহজ মনে করতাম, সেটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
#সিএমসিতে_একদিন #ভ্রমণকাহিনি #মোহাম্মদজাহিদহোসেন #ভ্রমণ #জীবনেরগল্প #মানুষেরগল্প #বাংলাগদ্য #বাংলাসাহিত্য #ভ্রমণলেখা #জীবন #অনুভূতি #TravelStory #BanglaLiterature
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।