Enolej Idea-তে লেখা প্রকাশের নিয়ম জানতে পূর্ণ নির্দেশনা দেখুন...
ই-নলেজ আইডিয়া হলো এমন একটি চিন্তানির্ভর প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মানুষ শুধু তথ্য নয়, চিন্তা শেয়ার করে। এখানে জ্ঞানীরা একত্র হন, নতুনরা পথ খুঁজে পান, এবং সবাই মিলে তৈরি হয় একটি জ্ঞানভিত্তিক উম্মাহ। এটি জ্ঞানচর্চাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ বানানোর একটি প্রচেষ্টা, যেখানে লেখা, ভাবা ও শেখা—সবই হয় মুক্তভাবে।আজই যোগ দিন!নিবন্ধন করতে এখানে ক্লিক করুন...।

-: ই-নলেজ আইডিয়া :-

আপনার লেখার কপিরাইট সুরক্ষা, স্বীকৃতি এবং ফ্রী প্রমোশন, সব এক প্ল্যাটফর্মে!

লেখালেখির কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম আপনার লেখার অভিজ্ঞতাই বদলে দিবে। (পড়ুন...)

যদি আপনি হন পাঠক, কিংবা লেখক হিসেবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করেন:

যদি আপনার লেখাগুলোর কপিরাইট সুরক্ষা, সুশৃঙ্খলতা, আপনার ভেরিফাইড লেখক পোর্টফলিও এবং লেখক-পাঠকের কেন্দ্রীয় কমিউনিটিতে যুক্ত হতে চান, তাহলে নিবন্ধন করুন লেখালেখির কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম “ই-নলেজ আইডিয়া” -এ!

এখানে অনেক প্রতিভাবান লেখক বিভিন্ন সিরিজে লিখছেন। আপনিও চাইলে আপনার লেখাগুলো সিরিজ আকারে সাজাতে পারবেন।

আপনার লেখক প্রোফাইল হবে একদম জীবন্ত পোর্টফলিও, এক ধরনের জীবন্ত বই। এখানে শুধু লেখক নয়, থাকবে পাঠকেরও সংস্পর্শ। ব্যাজ, পয়েন্ট, স্বীকৃতি এবং কপিরাইট সুরক্ষা তো থাকছেই, লেখাগুলো স্ক্যান করলেই আপনার নাম ভেসে উঠবে।

এটি তাই লেখালেখির কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম!

চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক....

পূর্ণ নির্দেশনা [Full Guideline]

ই-নলেজ আইডিয়া – লেখালেখির কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম!

রিষড়া ভ্রমণের একদিন

0 পছন্দ 0 অপছন্দ
4 বার প্রদর্শিত
করেছেন (25,028 পয়েন্ট)   4 ঘন্টা পূর্বে "গল্প" বিভাগে লেখা প্রকাশিত
পোষ্ট আইডি(eID) কার্ড↓ - লেখনীর স্বত্ব ও গুণের পরিচয়!

রিষড়া ভ্রমণের একদিনimage

মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন

ভ্রমণ কাহিনি | ১৫ আগস্ট, ২০২৬


ভ্রমণ মানে শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাওয়া নয়। ভ্রমণ মানে কখনো কখনো সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটা। অচেনা কোনো জনপদের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার পুরোনো দিনের গল্পের সঙ্গে নিজের বর্তমানটাকেও একটু মিলিয়ে নেওয়া। কোনো নদীর ঘাট, পুরোনো মন্দির, শতবর্ষী বাড়ি কিংবা একখানা মিষ্টির দোকান—হঠাৎ এসবই যেন অতীতের কোনো বন্ধ দরজা খুলে দেয়।


সেই দরজার ওপারে কী আছে, তা জানার কৌতূহলেই একদিন বেরিয়ে পড়েছিলাম হুগলি জেলার প্রাচীন জনপদ রিষড়ার উদ্দেশে।


সকালেই পৌঁছে গেলাম দমদম জংশন স্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে তখন চেনা ব্যস্ততা। কেউ অফিসে যাওয়ার তাড়ায় ছুটছেন, কেউ হাতে চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কোথাও হকারের হাঁকডাক, কোথাও ট্রেন ধরার ব্যস্ততা। সেই চেনা কোলাহলের মধ্যেই শান্তিপুর লোকালে উঠে পড়লাম।


জানালার পাশে একটি সিটও জুটে গেল। ট্রেন ছাড়তেই শহরটা ধীরে ধীরে পেছনে সরে যেতে লাগল। পরিচিত বাড়িঘর, দোকানপাট, ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে সামনে আসতে লাগল অন্যরকম দৃশ্য। কোথাও ঘন বসতি, কোথাও পুরোনো বাড়ির সারি, কোথাও গাছপালার ফাঁকে ছোট ছোট জনপদ।


জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ভ্রমণ শুরু হয়ে যায়। ট্রেনের জানালার ওপারে বদলে যেতে থাকা দৃশ্যগুলোও আসলে ভ্রমণেরই অংশ।


রিষড়ায় যাওয়ার কয়েকটি পথ আছে। দমদম থেকে বালি হল্ট হয়ে সড়কপথে যাওয়া যায়। আবার খড়দহে নেমে গঙ্গা পেরিয়ে নৌপথেও রিষড়ায় পৌঁছানো যায়। আমি দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছিলাম।


কারণ, কোনো পুরোনো জনপদে গিয়ে যদি নদীর বুকের ওপর দিয়ে তার কাছে পৌঁছানো যায়, তাহলে সেই পথটাই আমার কাছে বেশি ভালো লাগে।


ট্রেনের জানালায় রিষড়ার ইতিহাস


ট্রেন এগিয়ে চলছিল। আর আমি মনে মনে রিষড়ার ইতিহাসের পাতাগুলো একটু উল্টেপাল্টে দেখছিলাম।


রিষড়া শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পুরোনো জনপদের স্মৃতি। রিষড়া নামটির উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে নানা মত। ১৪৯৫ সালে বিপ্রদাস পিপলাই রচিত মনসামঙ্গল কাব্যে চাঁদ সদাগরের প্রসঙ্গে ‘ঋষিরা’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেকের ধারণা, সেন যুগে ভাগীরথীর তীরে ঋষিদের বসবাস কিংবা ‘ঋষিবাটি’ নামের কোনো জনপদ থেকেই রিষড়া নামটির উৎপত্তি। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এখানকার চর্মকার সম্প্রদায়ের ‘ঋষি’ পরিচয়ের সঙ্গেও নামটির সম্পর্ক রয়েছে।


সময়ের সঙ্গে এই জনপদের চরিত্রও বদলেছে। ইউরোপীয় বণিকদের আনাগোনা, পরে চটকল প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে রিষড়ায় মানুষের আগমন বাড়তে থাকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমজীবী মানুষ এসে এখানে বসতি গড়েন। নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতি আর নানা জীবনযাপনের মানুষ মিলে ধীরে ধীরে তৈরি হয় রিষড়ার নিজস্ব সামাজিক চরিত্র।


এসব ভাবতে ভাবতেই ট্রেন এসে থামল খড়দহ স্টেশনে।


গঙ্গা পেরিয়ে রিষড়ায়


স্টেশন থেকে অটো নিয়ে চলে এলাম শ্যামসুন্দর ঘাটে।


ঘাটে পৌঁছানোর পর মনে হলো, এতক্ষণ যে ভ্রমণটা ছিল ট্রেনের জানালার ভেতর, এবার সেটি সত্যিই শুরু হলো।


সামনে বিস্তীর্ণ গঙ্গা। ওপারে রিষড়া।


সাত টাকার টিকিট কেটে লঞ্চে উঠে পড়লাম। লঞ্চ ছাড়তেই শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে গেল। চারপাশে শুধু নদী আর নদী। বাতাসে ভেসে আসছিল জল আর ভেজা মাটির গন্ধ। লঞ্চের ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল নদীর স্রোতের শব্দ।


গঙ্গার বুক চিরে লঞ্চ এগিয়ে চলেছে। আমি চুপ করে তাকিয়ে আছি ওপারের দিকে।


কয়েক মিনিট পরেই পৌঁছে গেলাম রিষড়া ফেরিঘাটে।


ঘাট থেকে নেমে জিটি রোড পেরিয়ে বাঁশতলার দিকে হাঁটা দিলাম। আমার প্রথম গন্তব্য লাহাবাবুর ঘাট।


লাহাবাবুর ঘাট ও পুরোনো শিবমন্দির


লাহাবাবুর ঘাটে পৌঁছেই চোখে পড়ল পুরোনো আটচালা রীতির একটি শিবমন্দির। কৈলাস চন্দ্র লাহার প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটি যেন সময়ের অনেক ওঠানামা দেখেও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।


মন্দিরের উল্টো দিকে একটি হনুমান মন্দির। পাশে বিশাল অশ্বত্থ গাছ। তার নিচে বসার জায়গা। সামনে গঙ্গা।


একদিকে পুরোনো মন্দির, অন্যদিকে গাছের ছায়া, আর তার সামনে নদী—সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে এমন একটা শান্তি আছে, যা ব্যস্ত শহরের মধ্যে সহজে পাওয়া যায় না।


ঘাটটি প্রায় এক দশক আগে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন নির্মাণের ছাপ আছে, কিন্তু জায়গাটার পুরোনো আবহটা এখনো টিকে আছে।


লাহাবাবুর ঘাটের পাশেই রয়েছে বেণী বিতান উদ্যান। ২০০৮ সালে গড়ে ওঠা গঙ্গাতীরবর্তী এই উদ্যানটি ছোট হলেও বেশ মনোরম। রয়েছে বসার জায়গা, রয়েছে ডলফিনের ফোয়ারা। তবে আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল নদীর ধারে বসে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকা।


নদীকে দূর থেকে দেখা আর নদীর পাশে বসে তাকে দেখা—দুটো এক জিনিস নয়।


এখানে গঙ্গাকে শুধু একটি নদী মনে হয় না। মনে হয়, রিষড়ার জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা কোনো পুরোনো আত্মীয়।


বিরল ব্রহ্মা মন্দির ও শ্রীমানী ঘাট


লাহাবাবুর ঘাট থেকে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলাম শ্রীমানী ঘাটের দিকে। পথেই চোখে পড়ল একটি বিরল স্থাপনা—শ্রী শ্রী ব্রহ্মা মন্দির।


ফলকে লেখা তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠিত। ব্রহ্মার মন্দির এমনিতেই খুব বেশি চোখে পড়ে না। তাই ছোট্ট মন্দিরটির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখলাম। পুরোনো স্থাপনার প্রতি আমার বরাবরই আলাদা একটা টান আছে। কারণ এসব জায়গায় দাঁড়ালে মনে হয়, আমরা চলে যাব, কিন্তু এই দেয়ালগুলো আরও অনেক গল্প জমিয়ে রাখবে।


এরপর পৌঁছালাম শ্রীমানী ঘাটে।


সেদিন গঙ্গার রূপ হঠাৎ বদলে গেল। নদীতে জলের স্রোত বেড়ে উঠছিল। প্রবল বান আসার সেই দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে দেখতে বুঝলাম, নদীকে কখনো পুরোপুরি চেনা যায় না।


কিছুক্ষণ আগেও যে নদী শান্ত ছিল, মুহূর্তেই তার মধ্যে অন্যরকম অস্থিরতা।


আমি দাঁড়িয়ে শুধু সেই বদলে যাওয়া দেখছিলাম।


প্রেম মন্দির আশ্রম


শ্রীমানী ঘাটের কাছেই প্রেম মন্দির আশ্রম।


তারানন্দ ব্রহ্মচারী প্রতিষ্ঠিত এই আশ্রমের বয়স আশি বছরেরও বেশি। ভেতরে ঢুকতেই বাইরের ব্যস্ততা যেন অনেকটা দূরে সরে গেল।


আশ্রমের মধ্যে রয়েছে নাটমঞ্চ, মূল মন্দির, রাধা-কৃষ্ণ, মা দুর্গা ও শিবের বিগ্রহ। রয়েছে তারানন্দ ব্রহ্মচারীর সমাধি। অন্যদিকে রয়েছে প্রেম মন্দিরের যজ্ঞমণ্ডপ।


পুরোনো আশ্রমের একটা আলাদা আবহ থাকে। সেখানে শব্দ কম, মানুষের চলাফেরা ধীর, আর সময়টাও যেন একটু অন্যভাবে চলে।


কিছু জায়গা আছে, যেখানে বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করে না। শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে।


প্রেম মন্দির আমার কাছে তেমনই একটি জায়গা হয়ে রইল।


ফেলু মোদকের মিষ্টিতে রিষড়ার স্বাদ


রিষড়া এসে ফেলু মোদকের মিষ্টি না খেলে ভ্রমণটা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।


জিটি রোডের ওপর প্রায় ১৭৫ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টির দোকান। প্রতিষ্ঠাতা ফেলু বাবুর আসল পদবি ছিল দে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁদের পরিবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। বর্তমানে পঞ্চম প্রজন্মের অমিতাভ দে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিলেও পুরোনো স্বাদ ও পদ্ধতিকে যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করছেন।


এই দোকানের সঙ্গে বহু পরিচিত মানুষের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব থেকে শুরু করে প্রণব মুখোপাধ্যায়, অটল বিহারী বাজপেয়ী, সৌরভ গাঙ্গুলি, শচীন তেন্ডুলকর—অনেকেই নাকি এখানকার মিষ্টির স্বাদ নিয়েছেন।


আমি অবশ্য সেই তালিকায় নিজের নাম যোগ করার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে যাইনি।


গিয়েছিলাম মিষ্টি খেতে।


খাঁটি ঘি আর ছানার তৈরি লবঙ্গলতিকা, গজা, ছানার মুড়কি আর রসালো মোহিনী মিষ্টি—এক এক করে স্বাদ নিলাম।


মিষ্টি খাওয়ার পর মনে হলো, কিছু স্বাদ শুধু জিভে থাকে না। তার সঙ্গে একটা জায়গার ইতিহাসও মিশে থাকে।


নেতাজির স্মৃতিবিজড়িত বোস হাউস


এরপর রওনা হলাম শরৎ বোস লেনের ঐতিহাসিক বোস হাউসের দিকে।


আড়াই বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই বাগানবাড়িটি ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসুর। বাড়িটির সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে।


১৯৪১ সালে নেতাজির অন্তর্ধানের গোপন বার্তা এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে ঘিরে জাপানি কনসাল জেনারেল ওকাজাকির সঙ্গে শরৎ বসুর গোপন বৈঠকের স্মৃতিও এই বাড়ির সঙ্গে যুক্ত।


একটি বাড়ি যখন শুধু ইট, কাঠ আর দেয়ালের সমষ্টি থাকে না, বরং ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কোনো মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ওঠে, তখন তার সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতিটাও বদলে যায়।


মনে হয়, এই বাড়ির দেয়ালগুলো যদি কথা বলতে পারত, তাহলে হয়তো আমাদের ইতিহাসের অনেক অজানা গল্প শোনাতে পারত।


বর্তমানে বাড়িটি রামকৃষ্ণ মিশন সারদাপীঠের অধীনে রয়েছে।


ছয়শো বছরের সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির


রিষড়ার ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির।


বাঙুর পার্কে অবস্থিত এই মন্দিরটি প্রায় ছয়শো বছরের পুরোনো বলে জানা যায়। আনুমানিক ৮১১ বঙ্গাব্দে এর প্রতিষ্ঠা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, পঞ্চদশ শতকে জটাধর পাকড়াশী স্বপ্নাদেশ পেয়ে দ্বিভুজা কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।


মন্দিরের পাশেই রয়েছে রিষড়ার ঐতিহ্যবাহী ‘দা বাড়ি’ বা ‘দা এস্টেট’। সেখানে রয়েছে পূজামণ্ডপ, মদনমোহন মন্দির, শিবমন্দির এবং তিলকরাম দা ঘাট।


এখানে এসে আবার মনে হলো, একটি জনপদের ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে আটকে থাকে না।


মানুষের বিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য, পূজা-পার্বণ, মন্দির, ঘাট—এসবের মধ্যেও ইতিহাস বেঁচে থাকে।


রিষড়া তারই একটি জীবন্ত উদাহরণ।


চটকলের শহর


রিষড়াকে বুঝতে হলে তার শিল্প-ইতিহাসের কাছেও যেতে হয়।


১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়েলিংটন জুট মিল এই অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। চটকলকে কেন্দ্র করে একসময় রিষড়ায় তৈরি হয়েছিল বিশাল শ্রমজীবী জনপদ। কারখানার সাইরেনের সঙ্গে যাদের সকাল শুরু হতো, তাঁদের ঘামেই গড়ে উঠেছিল এই শিল্পাঞ্চলের অর্থনীতি।


দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর মিলটি আবার চালু হয়েছে—এই খবর শুনে ভালো লাগল।


কারণ একটি পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান কখনো শুধু একটি কারখানা নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য পরিবারের জীবন, শ্রম, আশা-নিরাশা আর প্রজন্মের স্মৃতি।


রাজসিক রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার


এতক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে তখন বেশ খিদে পেয়েছে।


দুপুরের খাবারের জন্য চলে গেলাম এন কে ব্যানার্জি স্ট্রিটের রাজসিক রেস্তোরাঁয়।


দুশো টাকার নিরামিষ বাঙালি থালি নিলাম।


ভাত, ডাল, ঝুরি আলুভাজা, বাঁধাকপি, পটলের তরকারি, ঢ্যাঁড়শ পোস্ত আর চাটনি—খুব সাধারণ আয়োজন। কিন্তু ভ্রমণের দিনে সাধারণ খাবারও যেন অন্যরকম লাগে।


সারাদিনের পথচলার পর গরম ভাত, ডাল আর বাঙালি রান্নার স্বাদে শরীরটা যেন আবার একটু শক্তি ফিরে পেল।


খাওয়া শেষ করে আবার বেরিয়ে পড়লাম।


ধর্মোদয় বৌদ্ধ বিহার


রিষড়া ভ্রমণের শেষ গন্তব্য ছিল পঞ্চাননতলার বড়ুয়াপাড়ায় অবস্থিত ধর্মোদয় বৌদ্ধ বিহার।


এখানে চট্টগ্রাম থেকে আসা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বসবাস। বিহারের পরিবেশ শান্ত, নিরিবিলি। বুদ্ধগয়া থেকে আনা বোধিবৃক্ষের নিচে রয়েছে মূল বুদ্ধমূর্তি। পাশাপাশি রয়েছে ত্রিপিটকে বর্ণিত আঠাশ জন বুদ্ধের মূর্তি।


সারাদিনের নানা দৃশ্যের পর এই জায়গাটিতে এসে দাঁড়ানোটা যেন ভ্রমণের একটি সুন্দর সমাপ্তি হয়ে উঠল।


সকালে শুরু হয়েছিল গঙ্গার পথে। আর দিনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ালাম বুদ্ধের শান্ত মূর্তির সামনে।


একদিনের মধ্যে যেন রিষড়ার বহু রং দেখে ফেললাম।


কোথাও নদী, কোথাও মন্দির, কোথাও আশ্রম, কোথাও মিষ্টির দোকান, কোথাও স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি, কোথাও শ্রমিকের জীবন, আবার কোথাও বৌদ্ধধর্মের শান্ত দর্শন।


রিষড়া যেন একটি শহর নয়, অনেকগুলো সময়ের পাশাপাশি বেঁচে থাকা একটি দীর্ঘ গল্প।


ফেরার পথে


ততক্ষণে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। সারাদিনের হাঁটাহাঁটি আর দেখা-জানায় শরীর ক্লান্ত। কিন্তু মনটা আশ্চর্য রকম ভালো।


রিষড়া স্টেশনে এসে হাওড়াগামী ট্রেনে উঠে বসলাম। ট্রেন ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল। জানালার বাইরে সন্ধ্যা নামছে। দিনের আলো ফিকে হয়ে আসছে। সারাদিনে দেখা জায়গাগুলো একে একে মনে পড়ছিল।


লাহাবাবুর ঘাটের সেই পুরোনো শিবমন্দির।


গঙ্গার বুকের ওপর দিয়ে লঞ্চে আসার মুহূর্ত।


শ্রীমানী ঘাটের বদলে যাওয়া নদী।


প্রেম মন্দিরের নীরবতা।


ফেলু মোদকের মিষ্টির স্বাদ।


বোস হাউসের ইতিহাস।


সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের পুরোনো বিশ্বাস।


চটকলের শ্রমিকদের জীবন।


আর সবশেষে ধর্মোদয় বৌদ্ধ বিহারের শান্ত পরিবেশ।


সকালে যে মানুষটি দমদম থেকে রওনা হয়েছিল, সন্ধ্যায় সে শুধু একটি জায়গা ঘুরে ফিরছে না। সঙ্গে করে ফিরছে একটি জনপদের গল্প।


ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধহয় এটাই।


আমরা কোনো জায়গা দেখতে যাই, কিন্তু ফিরে আসার সময় জায়গাটিই আমাদের ভেতরে কিছু রেখে যায়।


রিষড়াও রেখে গেল।


ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, একটি শহরকে শুধু তার নতুন রাস্তা, বাজার কিংবা বড় বড় ভবন দিয়ে চেনা যায় না। তাকে চিনতে হলে তার পুরোনো ঘাটে দাঁড়াতে হয়, মন্দিরের সামনে একটু থামতে হয়, কোনো পুরোনো বাড়ির দেয়ালে হাত রাখতে হয়, স্থানীয় মানুষের মুখে তার গল্প শুনতে হয়। কখনো তার মিষ্টির স্বাদ নিতে হয়, কখনো নদীর দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকতে হয়।


একদিনে রিষড়াকে চেনা সম্ভব নয়।


বরং একদিনের ভ্রমণ শেষে মনে হলো, রিষড়াকে চেনার শুরুটাই হলো আজ।


দমদমে ফিরে যখন রাত নেমে এসেছে, তখন দিনের ক্লান্তি শরীরে স্পষ্ট। তবু মনের মধ্যে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।


ভাবছিলাম, আজকের দিনটা আসলে শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না।


ছিল একটি পুরোনো জনপদের সঙ্গে আমার একদিনের পরিচয়।


ছিল গঙ্গার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা।


ছিল ইতিহাসের কয়েকটি পাতা উল্টে দেখা।


আর ছিল বর্তমানের ভেতর দাঁড়িয়ে অতীতকে একটু ছুঁয়ে দেখা।


রিষড়া তাই আমার কাছে এখন আর শুধু মানচিত্রের একটি জায়গা নয়। গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বহু শতকের এক জীবন্ত গল্প—যে গল্প একদিনে শেষ হয় না।

আমি মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, ই-নলেজ এর একজন যাচাইকৃত লেখক। আমি এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত আছি প্রায় 10 মাস 3 সপ্তাহ ধরে, এবং এ পর্যন্ত 1239 টি লেখা ও 0 টি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছি। আমার অর্জিত মোট পয়েন্ট 25028। ই-নলেজ আমার চিন্তা, জ্ঞান ও কণ্ঠকে সবার মাঝে পৌঁছে দিতে সহায়তা করেছে।
সংযুক্ত তথ্য
নিজস্ব আইডিয়া, ই-নলেজ আইডিয়া এ প্রথম প্রকাশিত
Enolej ID(eID): 4670
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।

এই লেখকের অন্যান্য সিরিজ


বিজ্ঞাপন: Remembering...

Image

এই ব্লগটির প্রতিক্রিয়া দিতে দয়া করে প্রবেশ কিংবা নিবন্ধন করুন ।

সংশ্লিষ্ট ব্লগগুচ্ছ


image
সিএমসিতে একদিন মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন ভ্রমণ কাহিনি। ১৬ আগস্ট ২০২৬ ভ্রমণ বলতেই আমা&#[...] বিস্তারিত পড়ুন...
5 বার প্রদর্শিত 0 টি প্রতিক্রিয়া
0 পছন্দ 0 অপছন্দ

image
সিরিজ -আমাদের না-বলা কথা। গল্প-১০  আলোটা একদিন ফিরবেই মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন  ছোট গল&#[...] বিস্তারিত পড়ুন...
7 বার প্রদর্শিত 0 টি প্রতিক্রিয়া
0 পছন্দ 0 অপছন্দ

image
নীরব মানুষটার শেষ সীমা   পর্ব–১ : কথা বলতে বলতে মানুষটা একদিন চুপ হয়ে গেল   একটি ধা[...] বিস্তারিত পড়ুন...
21 বার প্রদর্শিত 0 টি প্রতিক্রিয়া
0 পছন্দ 0 অপছন্দ

image
যদি একদিন আর ডাকো না মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন  গদ্য কবিতা। ২১ জুলাই, ২০২৬ যদি একদিন আর ö[...] বিস্তারিত পড়ুন...
22 বার প্রদর্শিত 0 টি প্রতিক্রিয়া
0 পছন্দ 0 অপছন্দ

image
*শেষ বিকেলে একদিন* শামীমা আকতার পথ ভুলে একদিন শেষ বিকেলে,   আমার দ্বারে আলতো হাত রাখ[...] বিস্তারিত পড়ুন...
26 বার প্রদর্শিত 0 টি প্রতিক্রিয়া
0 পছন্দ 0 অপছন্দ
📢 Notice Board
No active notices
ই-নলেজ আইডিয়া(Enolej Idea) হলো লেখালেখির কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম যেখানে যেকোনো ধরনের লেখা—সাহিত্য, বিজ্ঞান, গবেষণা নোট, মতামত, প্রতিবাদী লেখা, ধর্মীয় চিন্তা, ব্যক্তিগত নোট বা দৈনন্দিন ভাবনা—নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। এটি সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে থাকা অগোছালো কনটেন্টকে একটি ভেরিফাইড, রেফারেন্সযোগ্য ডিজিটাল পোর্টফোলিওতে রূপান্তর করে, যা ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ডিং গড়ে তোলে। প্রতিটি লেখার জন্য ইউনিক ডিজিটাল আইডি (eID) ও কপিরাইট সুরক্ষা প্রদান করা হয়, ফলে লেখা চুরি হলেও আসল লেখক সহজে শনাক্তযোগ্য থাকে। ধারাবাহিক কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজানো, এক ক্লিকেই ই-বুক বা বইয়ের খসড়ায় রূপান্তর, ব্যক্তিগত খসড়া গোপন রাখা এবং একটি সক্রিয় কমিউনিটির মাধ্যমে পাঠকের সাথে সরাসরি সংযোগ—সব সুবিধাই এখানে একসাথে পাওয়া যায়। ই-নলেজ আইডিয়া মূলত ব্যক্তির চিন্তা ও জ্ঞানকে একটি স্থায়ী, সুরক্ষিত ও সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত ডিজিটাল লেখক ইকোসিস্টেমে রূপ দেয়। IDEA = Independent Digital Expression & Authorship.
  1. মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন

    1194 পয়েন্ট

    0 টি প্রতিক্রিয়া

    0 মন্তব্য

    59 টি আইডিয়া ব্লগ

  2. Monsoon Harmony

    904 পয়েন্ট

    0 টি প্রতিক্রিয়া

    0 মন্তব্য

    45 টি আইডিয়া ব্লগ

  3. রফিক আতা

    367 পয়েন্ট

    0 টি প্রতিক্রিয়া

    0 মন্তব্য

    18 টি আইডিয়া ব্লগ

  4. Mayabi Ilmaz Megh

    81 পয়েন্ট

    0 টি প্রতিক্রিয়া

    0 মন্তব্য

    4 টি আইডিয়া ব্লগ

...