সিরিজ -আমাদের না-বলা কথা।
গল্প-০২
পুরোনো জুতোর সেলাই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৫ আগষ্ট, ২০২৬
রবিবার। দুপুর গড়ালে বাজারের ভিড়টা একটু পাতলা হয়।
সোমবার থেকে শাওনের নতুন ক্লাস শুরু। স্কুল থেকে কড়া করে বলে দিয়েছে, কাল থেকে সবাইকে ঠিকঠাক ইউনিফর্ম পরে আসতে হবে। জুতো ছাড়া কাউকে লাইনে দাঁড়াতে দেবে না।
শাওনের জুতোটা আর পরার মতো নেই। সামনের দিকটা হাঁ করে আছে, ভেতরের শক্ত কাগজ বেরিয়ে এসেছে। একটু হাঁটলেই কাদা-পানি ঢুকে যায়। ও লজ্জায় কারও সামনে পা বাড়াতে চায় না।
বাবা রহিম কথা দিয়েছিল, এই মাসে কিনে দেবে।
রহিম রিকশা চালায়। দিনের আয়ে ঘর ভাড়া, বাজার, ওষুধ সব সামলাতে হয়। তার মধ্যেও গত দুই সপ্তাহ ধরে সে একটু একটু করে টাকা সরিয়ে রেখেছে। লুঙ্গির গোঁজে ভাঁজ করা নোটগুলো ঘামে ভিজে নরম হয়ে গেছে।
বাজারে ঢুকতেই শাওনের চোখ আটকে গেল। সারি সারি কালো জুতো, চকচক করছে। নতুন চামড়ার গন্ধ। সে একটা জুতো তুলে পায়ে গলাল। একটু বড় হচ্ছে, তবু মুখটা খুশিতে ভরে উঠল।
রহিম দোকানদারকে দাম জিজ্ঞেস করল। দাম শুনে তার কপালে এক মুহূর্তের জন্য ভাঁজ পড়ল। সে কিছু বলল না। শুধু আস্তে মাথা নাড়ল, বলল, প্যাকেট করে দেন।
টাকা দেওয়ার সময় পকেটের সব বের করল। খুচরো পয়সা পর্যন্ত গুনে দিল। দোকানদার তাকিয়ে আছে, রহিমের কপালে ঘাম জমেছে। শেষ পর্যন্ত মিলে গেল।
দোকান থেকে বেরিয়ে শাওন বলল, "আব্বা, তোমার জুতোটাও তো ছিঁড়ে গেছে।"
রহিম হেসে বলল, "আরে, আমারটা আরও কিছুদিন চলে যাবে।"
তার নিজের জুতোর অবস্থা আরও খারাপ। সামনের চামড়া উঠে গেছে, ডান পায়ের তলাটা প্রায় খুলে এসেছে। রিকশার প্যাডেলে চাপ দিলে মাঝে মাঝে পা পিছলে যায়। তবু অভ্যাস হয়ে গেছে, সে কিছু মনে করে না।
বাজারের কোণে এক মুচি বসে ছিল। রহিম একটু থামল। নিজের পায়ের দিকে তাকাল, তারপর মুচির সামনে বসে পড়ল।
"ভাই, একটু সেলাই করে দেন তো।"
মুচি জুতোটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। বলল, "চাচা, এটা তো পুরাই খুলে গেছে। নতুন একটা নিলে ভালো হইত।"
রহিম মৃদু হেসে বলল, "এখন নতুন লাগবে না। একটু শক্ত করে সেলাই করে দেন, চললেই হবে।"
মুচি সুঁইয়ে মোটা সুতা পরিয়ে টানতে শুরু করল। প্রতিটা টানে পুরোনো চামড়াটা কুঁচকে উঠছিল। রহিম চুপচাপ দেখছিল। শাওন বুকে নতুন জুতোর বাক্সটা চেপে ধরে পাশে দাঁড়িয়ে।
সেলাই শেষ হলে রহিম জুতোটা পায়ে গলিয়ে উঠে দাঁড়াল। দুই পা ফেলে দেখল। ভেতরে মোটা সুতার গিঁট পায়ে বিঁধছে, তবু মুখে কিছু বলল না।
বাড়ি ফেরার পথে শাওন বারবার নিচের দিকে তাকাচ্ছিল। নিজের নতুন বাক্সের দিকে না, বাবার পায়ের দিকে। ও প্রথমবার বুঝতে পারছিল, নতুন জুতোর দাম শুধু টাকা দিয়ে শোধ হয় না।
রাতে খাওয়ার পর শাওন মায়ের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "মা, আব্বা নতুন জুতো কিনবে না?"
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "তোরটাই আগে দরকার ছিল বাবা।"
সেই রাতে শাওন নতুন জুতোটা বালিশের পাশে রেখে ঘুমাল। ঘুম আসার আগে পর্যন্ত ওর চোখে ভাসছিল মুচির হাতের সুঁইয়ের টান আর বাবার চুপচাপ মুখটা।
রহিমের পায়ের ওই সেলাই করা জুতোটা হয়তো আর বেশিদিন টিকবে না। কয়েকদিন পর আবার খুলে যাবে। কিন্তু সে জানে, ছেলের পায়ে যেন আর লজ্জা না লাগে, সেটাই এখন বড় কথা।
বাবারা খুব বেশি কথা বলে না। তারা নিজের ক্ষতির হিসাব রাখে না। তারা শুধু চায়, সন্তানের সামনের পথটা যেন একটু মসৃণ হয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।