সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প ৬ -আজ একটু বিশ্রাম নেব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
“আজ একটু বিশ্রাম নেব”—নিশি কথাটা বহু বছর ধরে বলে আসছে। কিন্তু আশ্চর্য, বিশ্রামের সেই দিনটা আর কোনোদিন আসে না। একসময় সে ভাবত, এই সপ্তাহটা একটু যাক, তারপর দুদিন নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকবে। পরে সেই দুদিন এক সপ্তাহের কাছে হার মানত, সপ্তাহটা মাসের কাছে। এভাবেই ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো বদলেছে, মেয়েরা বড় হয়েছে, অভিকের চুলে পাক ধরেছে; শুধু নিশির নিজের জন্য রাখা বিশ্রামের দিনটি কোথাও এসে দাঁড়ায়নি।
ভোর পাঁচটার অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে কোনো স্বপ্ন আসে না, আসে কাজের তালিকা। মেঘের টিফিনে কী দেওয়া যায়, মিশির দুধটা বসাতে হবে, অভিকের অফিসের জামাটা ইস্ত্রি করা হয়নি, বাজারে ডাল শেষ, দুপুরে কী রান্না হবে—সবকিছু যেন মাথার ভেতর আগেই সাজানো থাকে। বিছানা ছাড়ার আগেই নিশি বুঝে যায়, আজকের দিনটাও তার নিজের হবে না।
শরীর অবশ্য অনেকদিন ধরেই তাকে অন্য কথা বলছিল। কখনো কোমরের কাছে টান ধরত, কখনো মাথাটা ভার হয়ে থাকত, কখনো সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে বুকটা অকারণে ধড়ফড় করত। কোনো কোনো সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হতো, আর একটু শুয়ে থাকি। কিন্তু সেই ইচ্ছেটা মুখে আসার আগেই অন্য একটা ভাবনা তাকে বিছানা থেকে তুলে দিত—মেঘের স্কুল আছে, মিশির নাশতা চাই, অভিকের অফিস আছে। সংসার তো আর অপেক্ষা করবে না।
অভিক কয়েকবার বলেছে, “একবার ডাক্তার দেখিয়ে নাও।”
নিশি হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। “এমন কিছু না। একটু ক্লান্তি। ঠিক হয়ে যাবে।”
সে নিজের শরীরের প্রতিটি সতর্কবার্তাকে এমন সহজভাবে সরিয়ে রেখেছিল যে, একসময় শরীরের অসুবিধাগুলোও তার কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হতে লাগল। জ্বর নিয়েও রান্না করেছে, মাথাব্যথা নিয়ে ওষুধ খেয়ে কাজ করেছে, রাত জেগে মেয়ের পড়া দেখেছে। নিজের জন্য একটু শুয়ে থাকা তার কাছে বিশ্রাম ছিল না, বরং কাজ ফেলে রাখা।
তার একটা অদ্ভুত ভয় ছিল—সে থামলে বুঝি সংসারটা থেমে যাবে।
সেদিন দুপুরে বাজার থেকে ফিরতে ফিরতে রাস্তায় খুব গরম ছিল। হাতে বাজারের ব্যাগ, মাথায় সারাদিনের ক্লান্তি। দরজার কাছে এসে নিশির হঠাৎ মনে হলো, মেঝেটা যেন দুলছে। সে দেয়ালে হাত রাখল। চোখের সামনে আলোটা কেমন ঝাপসা হয়ে এল। পরের মুহূর্তে শরীরটা আর সামলাতে পারল না।
মেঘের চিৎকারে বাড়ির ভেতরটা মুহূর্তে বদলে গেল। মিশি ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করল। খবর পেয়ে অভিক অফিস থেকে ছুটে এল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলল বেশ কিছুক্ষণ।
ডাক্তার রিপোর্টগুলো দেখে নিশির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি এসব লক্ষণ আগে থেকেই টের পাচ্ছিলেন?”
নিশি মাথা নিচু করল।
“তাহলে আগে আসেননি কেন?”
নিশি কোনো উত্তর দিতে পারল না। কী বলবে? যে সংসারের কাজ ছিল? যে সময় পায়নি? যে নিজের অসুবিধাকে সে নিজেই গুরুত্ব দেয়নি?
ডাক্তার খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, “শরীরকে সবসময় পরে রাখা যায় না। কিছুটা বিশ্রাম, নিয়মিত খাওয়া আর নিজের যত্ন—এসবও প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে।”
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল। অথচ সেদিন নিশির মনে হলো, কেউ যেন বহু বছর পর তাকে এমন একটা কথা বলল, যা তার নিজেরই আগে বলা উচিত ছিল।
রাতে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে সাদা ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাইরে করিডোরে মানুষের চলাচল, দূরে কোনো যন্ত্রের শব্দ, মাঝেমধ্যে নার্সের পায়ের শব্দ—সব মিলিয়ে রাতটা অদ্ভুত নির্জন। নিশির মনে হচ্ছিল, সে তো খুব বেশি কিছু চায়নি। শুধু একটা দুপুর ঘুমাতে চেয়েছিল। কোনোদিন রান্না না করে বসে থাকতে চেয়েছিল। একটা বই হাতে নিয়ে বিকেলটা পার করতে চেয়েছিল। অথচ সেই সামান্য চাওয়াগুলোকেও সে সবসময় বলেছে—“পরে।”
পরদিন মেঘ তার পাশে বসে হাত ধরে বলল, “মা, তুমি এখন থেকে এত কাজ করবে না।”
মিশি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল, “আমার কাজ আমি নিজেই করব।”
অভিক অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমরা ধরে নিয়েছিলাম, তুমি সব পারবে। তোমাকে কিছু করতে হবে না বলিনি কখনো। কিন্তু আমরা এটাও ভাবিনি যে তোমারও তো বিশ্রাম দরকার।”
নিশি তার দিকে তাকাল। এত বছরের সংসারে এই কথাটা এত দেরিতে কেন শুনতে হলো, সে জানে না।
বাড়ি ফেরার পর প্রথম কয়েকটা দিন নিশির কাছে অদ্ভুত লাগল। দুপুরে সে বিছানায় শুয়ে আছে, অথচ রান্নাঘর থেকে বাসনের শব্দ আসছে। অভিক রান্না করছে। মেঘ বাজারে গেছে। মিশি নিজের কাপড় গুছিয়ে রাখছে। নিশির মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনো ভুল করছে। এতদিনের অভ্যাস তাকে ভেতর থেকে বলছিল—উঠে যাও, কাজগুলো পড়ে আছে।
কিন্তু সেদিন সে উঠল না।
চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল।
জানালার ফাঁক দিয়ে দুপুরের আলো বিছানার ওপর এসে পড়েছিল। অনেকদিন পর সেই আলোটা দেখার মতো সময় হলো তার।
নিশি ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, সংসারের সব কাজ নিজে করে যাওয়া তার দায়িত্ব হতে পারে, কিন্তু নিজের শরীরকে শেষ করে দেওয়া তার দায়িত্ব নয়। বরং এতদিন সে ভুল করে ভেবেছে, ভালোবাসা মানেই সবসময় দিয়ে যাওয়া। এখন বুঝছে, কখনো কখনো ভালোবাসার অর্থ নিজের জন্যও একটু জায়গা রাখা।
সেদিন বিকেলে ঘুম থেকে উঠে নিশি জানালার পাশে বসে এক কাপ চা খেল। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল।
তারপর মনে মনে বলল, “আজ একটু বিশ্রাম নেব।”
এই প্রথম কথাটার সঙ্গে কোনো “পরে” জুড়ে দিল না।
সেদিন থেকে নিশির জীবন পুরো বদলে যায়নি। সংসার আছে, কাজ আছে, দায়িত্বও আছে। শুধু একটা ছোট পরিবর্তন এসেছে—নিজেকে আর সে সবশেষে রাখে না।
কারণ সে বুঝে গেছে, সংসারের জন্য যে মানুষটা প্রতিদিন জেগে থাকে, তারও মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে থাকার অধিকার আছে।
আর বিশ্রাম কোনো বিলাসিতা নয়।
কখনো কখনো সেটাই আবার উঠে দাঁড়ানোর প্রথম শর্ত।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।