সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প ৭ -শেষবারের মতো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
শেষবার যখন নিজের জন্য কিছু কিনেছিল, নিশি তখনও জানত না সেটাই নিজের জন্য তার শেষ আনন্দ হয়ে থাকবে।
জিনিসটা খুব দামি ছিল না। ছোট্ট একটা কালো ডিজিটাল ক্যামেরা। খুব সাধারণ মডেল। সেদিন দোকান থেকে বের হওয়ার সময় নিশির মুখে যে হাসিটা ছিল, অভিক অনেকদিন মনে রেখেছিল।
বাসায় ফিরে ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করে নিশি বলেছিল, "এবার থেকে আমরা যেখানে যাব, সব ছবি তুলে রাখব। মেঘের ছোটবেলা, পরে মিশি হলে তারও।"
অভিক হেসে বলেছিল, "তুমি তো পুরো ক্যামেরাম্যান হয়ে গেলে।"
নিশি বলেছিল, "নিজের জীবনের ছবি নিজের হাতেই রাখতে হয়।"
তখন কথাটা খুব সাধারণ মনে হয়েছিল।
তারপর আস্তে আস্তে সব বদলে গেল। মেঘ বড় হলো। সংসারে নতুন খরচ এল। মিশি জন্মাল। স্কুল, ডাক্তার, কোচিং, বাজার, বাড়ি ভাড়া— একটার পর একটা প্রয়োজন এসে দাঁড়াতে লাগল। ক্যামেরাটা প্রথমে আলমারির ড্রয়ারে গেল, তারপর একটা কাপড়ের ব্যাগে।
মাঝে মাঝে নিশি ব্যাগটার দিকে তাকাত। ভাবত, কোথাও ঘুরতে গেলে সঙ্গে নেবে।
একবার অভিক বলেছিল, "চলো, দুদিনের জন্য কোথাও ঘুরে আসি।"
নিশি তখন মেঘের পরীক্ষার কথা ভেবে বলেছিল, "ওর পরীক্ষাটা শেষ হোক।"
পরীক্ষা শেষ হলো। তারপর মিশির জ্বর। তারপর বাড়ির একটা জরুরি খরচ। তারপর অভিকের অফিসের চাপ।
যাওয়া আর হলো না।
এভাবেই ক্যামেরাটা পড়ে রইল।
বছর কয়েক পর একদিন আলমারি গোছাতে গিয়ে নিশি সেটা আবার হাতে পেল। ধুলো জমেছে। কালো রঙটা ফ্যাকাশে লাগছে। হাতে নিয়ে ধুলো মুছতে মুছতে মনে হলো, ক্যামেরার চেয়ে বেশি বদলে গেছে সে নিজে।
ব্যাটারিতে চার্জ ছিল না। তবু মেমোরি কার্ডটা খুলে দেখতে ইচ্ছে করল।
অভিক ল্যাপটপে কার্ডটা লাগিয়ে দিল।
একটার পর একটা ছবি ভেসে উঠতে লাগল।
মেঘের প্রথম স্কুল ড্রেস পরা ছবি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অভিক আর নিশি। এক বিকেলের বৃষ্টিতে ভেজা জানালা। মিশি তখনও জন্মায়নি।
একটা ছবিতে নিশি হেসে আছে। চুল খোলা, চোখে কোনো ক্লান্তি নেই, কপালে ভাঁজ নেই। হাতে সেই ক্যামেরাটা। ছবিটা কে তুলেছিল, মনে নেই।
অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল নিশি।
মেঘ পাশ থেকে হেসে বলল, "এই মেয়েটা কে?"
নিশিও হাসল। বলল, "আমি।"
মেঘ অবাক হয়ে বলল, "তুমি এত অন্যরকম ছিলে?"
নিশি উত্তর দিল না। সে জানে, মেয়েটা অন্য কেউ নয়। এই মেয়েটাই সে ছিল। শুধু এত বছরের সংসারের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে সেই মানুষটার মুখ কোথাও চাপা পড়ে গেছে।
সেদিন রাতে ক্যামেরাটা আবার হাতে নিল সে। মনে হলো, সে কোনো পুরোনো জিনিস হাতে নেয়নি, নিজেরই একটা পুরোনো বয়স হাতে নিয়েছে। ওই ছোট কালো বাক্সটার ভেতর আটকে আছে একটা জীবন, যে জীবন তখনও জানত না কত কিছু একদিন 'পরে' হয়ে যাবে।
বই পড়া পরে।
ঘুরতে যাওয়া পরে।
নিজের জন্য কেনাকাটা পরে।
বন্ধুদের সঙ্গে দেখা পরে।
নিজের জন্য একটু সময়— সেটাও পরে।
কিন্তু জীবন 'পরে' শব্দটা বোঝে না। জীবন শুধু এগিয়ে যায়।
কয়েকদিন পর নিশি বাজারে গিয়ে নিজের জন্য একটা ছোট বই কিনল। খুব দামি নয়, মলাটে হালকা নীল রঙ। দোকান থেকে বের হওয়ার সময় বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। মনে হলো, অনেক বছর পর সে নিজের কাছে ফিরে আসছে।
বাড়ি ফিরে বইটা আলমারিতে তুলে রাখল না। বারান্দার ছোট টেবিলের ওপর রাখল। সন্ধ্যায় চা নিয়ে সেখানে বসল। প্রথম পাতা খুলল। ক্যামেরাটা পাশেই পড়ে ছিল।
বই পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে ক্যামেরাটার দিকে তাকাচ্ছিল সে। মনে হচ্ছিল, জীবনের কিছু আনন্দ সত্যিই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সব শেষ আনন্দের পর জীবন ফুরিয়ে যায় না।
কখনো কখনো একটা পুরোনো জিনিস আমাদের শুধু মনে করিয়ে দেয় আমরা একসময় কে ছিলাম। আর সেই মনে পড়াটা যদি বুকের ভেতর এখনও একটু আলো জ্বালাতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে মানুষটা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সেদিন বিকেলে নিশি ক্যামেরাটা তুলে একটা ছবি তুলল। বারান্দায় বসে থাকা নিজের। আলো এসে পড়েছে টেবিলে, পাশে চায়ের কাপ, হাতে বই।
ছবিটা খুব সাধারণ হলো।
তবু অনেক বছর পর নিজের জন্য তোলা সেই ছবিটা দেখে নিশি মৃদু হাসল।
শেষবারের মতো নয়। এবার থেকে আবার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।