নিশি উপাখ্যান সিরিজ
গল্প-৩
শেষবারের মতো দুঃখিত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৯, জুন, ২০২৬
ঝগড়ার পর সব সময় একই মানুষটা আগে ফোন করত—দুঃখিত। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অনেক সময় অভিক জানত, দোষটা তার ছিল না। তবুও সে বলত। কারণ তার মনে হতো, একটা ছোট্ট "সরি" হয়তো একটা সম্পর্ককে ভেঙে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারে।
প্রথম দিকে নিশিও বলত,
“আমিও হয়তো একটু বেশি রেগে গিয়েছিলাম।”
এই কথাটুকুই অভিকের জন্য যথেষ্ট ছিল। সে ভাবত, মানুষটা বুঝতে পারছে। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু একটা বদলে গেল। ঝগড়া হতো। নিশি কষ্ট পেত। নিশি চুপ করে যেত। আর অভিক ভাবত, কীভাবে আবার সব ঠিক করা যায়।
এক সময় এমন হয়ে গেল, ভুল যারই হোক, কথার শেষে "দুঃখিত" শব্দটা শুধু অভিকের মুখ থেকেই আসত। এক রাতে খুব ছোট একটা বিষয় নিয়ে ঝামেলা হলো।
নিশি বলেছিল,
“তুমি কখনো আমার কথা বোঝার চেষ্টা করো না।” অভিক অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, “সরি।” নিশি কোনো উত্তর দেয়নি।
পরদিন সকালে আবার অভিকই বলেছিল,
“কালকের বিষয়টা নিয়ে আর মন খারাপ করে থেকো না।”
নিশি শুধু বলেছিল,
“তুমি সব সময় সরি বলো। কিন্তু বদলাও না।”
অভিক চুপ করে গিয়েছিল। কারণ সে সত্যিই জানত না, তাকে ঠিক কোন জায়গায় বদলাতে হবে।
দিন যেতে লাগল। এক সময় সে নিজের কথাও মেপে বলতে শুরু করল।
কিছু বলার আগে ভাবত—
"এটা বললে কি আবার ঝগড়া হবে?
আবার কি আমাকেই ক্ষমা চাইতে হবে?
চুপ থাকলেই কি ভালো?"
ধীরে ধীরে সে কথা কমিয়ে দিল। শান্তি রাখার জন্য। কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেই কোথায় যেন নিজের একটা অংশ হারিয়ে যাচ্ছিল।
একদিন বন্ধু রাহাত বলল,
“তুই আগের মতো নেই কেন?”
অভিক হেসে বলেছিল, “কিছু না।” কিন্তু সে জানত, কিছু একটা বদলে গেছে। আগে সে ঝগড়ার পর সম্পর্ক ঠিক করতে চাইত। এখন সে শুধু ঝগড়া এড়াতে চাইত।
এক সন্ধ্যায় আবার একই ঘটনা ঘটল। একটা সাধারণ বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি। নিশি রাগ করে অন্য ঘরে চলে গেল। অভিক আগের মতো ফোন হাতে নিল না। লিখল না—"সরি।"
সেই রাতে প্রথমবার সে নিজেকে প্রশ্ন করল—প্রতিবার ক্ষমা চেয়ে কি সে সম্পর্ক বাঁচাচ্ছে?
নাকি ধীরে ধীরে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে?
পরদিন সকালে নিশি অবাক হয়ে বলল,
“কালকের জন্য কিছু বলবে না?”
অভিক শান্তভাবে তাকাল। “কী বলব?”
“মানে?”
অভিক একটু থেমে বলল,
“আগে হলে আমি দুঃখিত বলতাম। কিন্তু এবার আগে বুঝতে চাই, আসলে সমস্যাটা কোথায়।”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“তুমি কি তাহলে আর চেষ্টা করবে না?”
অভিক মাথা নাড়ল। “করব।
কিন্তু শুধু ক্ষমা চেয়ে না। নিজেকে ছোট করে না।
সব সময় নিজেকেই দোষী বানিয়ে না।”
এই প্রথমবার নিশি বুঝল, অভিকের "সরি" বলা বন্ধ হওয়া মানে ভালোবাসা কমে যাওয়া নয়।
হয়তো সে প্রথমবার নিজের অস্তিত্বটাকে আবার খুঁজে দেখছে।
কয়েক দিন পর তারা বসে কথা বলল। অভিক বলল, “আমি ভুল করলে অবশ্যই ক্ষমা চাইব। কিন্তু একটা সম্পর্কের সব সমস্যার শেষে যদি শুধু একজনই দোষী হয়, তাহলে সেটা ঠিক সম্পর্কের মতো থাকে না।”
নিশি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি হয়তো অভ্যাস করে ফেলেছিলাম, তুমি সব ঠিক করে দেবে।” অভিক হালকা হাসল। “আর আমি অভ্যাস করে ফেলেছিলাম, সব দোষ নিজের ওপর নেব।”
সেদিন দুজনেই বুঝল, ভালোবাসা মানে একজন সব সময় নিচু হয়ে থাকবে আর অন্যজন সব সময় জিতে যাবে—এটা নয়। ভালোবাসা মানে দুজন মানুষই নিজের ভুলের সামনে দাঁড়াতে পারা।
কিছুদিন পর আবার ছোট একটা ভুল হলো।
নিশি বলল,
“আমার কথাটা হয়তো একটু বেশি কঠিন হয়ে গেছে।”
অভিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আমারও হয়তো তোমার কথা আরও ভালো করে শোনা দরকার ছিল।”
সেদিন কেউ "সরি" বলল না। কারণ শুধু ক্ষমা চাওয়ার চেয়ে বড় কিছু দরকার ছিল। বোঝাপড়া।
অভিকের বুকের ভেতর বহুদিন পর শ্বাস নিতে একটু সহজ লাগল। কারণ এইবার দোষের বাটখারা শুধু তার হাতে ছিল না।
নিশি নিজের কথার দায় নিচ্ছে। অভিকও নিজের ভুলের জায়গাটা দেখছে। সম্পর্কে সব সময় একজন ক্ষমা চাইবে আর অন্যজন শুধু গ্রহণ করবে—এটা ভালোবাসা নয়।
দুজন মানুষই যখন নিজের অংশটুকু স্বীকার করতে পারে, তখনই সম্পর্ক আবার সমান জায়গায় দাঁড়ায়। অনেক দিন পর অভিক মনে মনে বলল—এটাই ছিল তার শেষবারের মতো দুঃখিত বলা। এরপর থেকে সে ভুল হলে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু শুধু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের আত্মসম্মান ভেঙে নয়।
কারণ ভালোবাসা এমন কোনো জায়গা নয়, যেখানে একজন মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাবে। যে সম্পর্ক বাঁচাতে গিয়ে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলে,
একদিন সেই সম্পর্কের কাছেই একটা প্রশ্ন রেখে যেতে হয়—
"আমরা কি সত্যিই একসঙ্গে ছিলাম, নাকি শুধু একজন আরেকজনকে ধরে রেখেছিলাম?"
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।