বাবা, তোমাকে আজও খুঁজি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
স্মৃতিচারণ | ২৭ অক্টোবর ২০২৬
বাবা, তোমাকে শেষবারের মতো বাড়িতে ফিরতে দেখেছিলাম ২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর। সেদিন তুমি বাড়ি ফিরেছিলে, কিন্তু আমার সেই বাবাটা আর ফিরে আসেনি—যার সঙ্গে কথা বলার জন্য কোনো অজুহাত লাগত না।
সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনে নিচে নেমে গিয়েছিলাম। কত আশা ছিল, তুমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। গত কয়েকটা দিনের দুশ্চিন্তা শেষ হবে, তোমাকে আবার কাছে পাব, তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারব। কিন্তু বাড়ি ফিরেছিলে তুমি, অথচ তোমার সঙ্গে আর কোনো কথা বলা সম্ভব ছিল না। যে মানুষটাকে সুস্থ করে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখেছিলাম, তাঁকে এভাবে ফিরে পেতে হবে, কখনো ভাবিনি।
আজ চার বছর হয়ে গেল, বাবা। ক্যালেন্ডারের পাতায় চারটি বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সেই সন্ধ্যার স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি।
তোমার শেষ কয়েকটা দিনের কথা খুব মনে পড়ে। অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালে শুয়ে ছিলে। নিজের কত কষ্ট, কত যন্ত্রণা—তার মধ্যেও আমার কষ্টের কথা ভুলে যাওনি। আমার বাঁ হাতে ব্যথা ছিল। তুমি সেটা খেয়াল করে বলেছিলে, “তুই ডান হাত দিয়ে টিপ, তোর বাঁ হাতে ব্যথা তো!”
বাবা, তোমার সেই কথাটা আজও আমার মনে আছে। তুমি নিজেই তখন অসুস্থ, অথচ ছেলের বাঁ হাতের ব্যথাটা তোমার মনে ছিল। কথাটা হয়তো খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু আজ সেই কথার মধ্যেই তোমার ভালোবাসা খুঁজে পাই। তোমার মুখ থেকে আর কোনো দিন এই কথাটা শুনতে পাব না—ভাবলে বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে।
এখন কত কথা মনে হয় তোমাকে বলি। কোনো কষ্টের সময় মনে হয়, তোমাকে জানাই। কোনো ভালো খবর পেলে মনে হয়, তোমাকে বলি। হয়তো তুমি শুনে খুশি হতে, হয়তো দু-একটা সাধারণ কথা বলতে। কিন্তু সেই সাধারণ কথাগুলো শোনার মানুষটিই যে আর নেই!
আগে কখনো ভাবিনি, বাবার সঙ্গে কথা বলার সুযোগটাও একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে। মনে হতো, তুমি তো আছ। প্রয়োজন হলে কথা বলব, সময় পেলে পাশে বসব। কত কথা যে পরে বলব ভেবে রেখে দিয়েছিলাম! এখন সেই কথাগুলো বলার আর কোনো সময় আসবে না।
তোমার সঙ্গে আমার আরও কত কথা বলা বাকি ছিল, বাবা! হয়তো সব কথা কোনো দিনই বলা হতো না। তবু তুমি আছ—এই বিশ্বাসটুকু ছিল। এখন কোনো কথা মনে পড়লে তোমাকে বলার বদলে নিজের মধ্যেই রেখে দিতে হয়।
আজ তোমার মৃত্যুবার্ষিকীতে লিখতে বসে বারবার সেই শেষ ফেরার কথাই মনে পড়ছে। যে মানুষটাকে সুস্থ করে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার জন্য এত চেষ্টা করেছিলাম, তাঁকে আর কখনো আগের মতো ফিরে পাব না। এই সত্যটা বদলানোর ক্ষমতা আমার নেই। শুধু স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে তোমাকে মনে করতে পারি।
বাবা, আজ যদি তোমার পাশে বসার সুযোগ পেতাম, তাহলে হয়তো খুব বেশি কিছু বলতাম না। শুধু তোমার পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকতাম। তোমার মুখের দিকে তাকাতাম, তোমার কথা শুনতাম। কারণ এখন তোমার সঙ্গে কাটানো সাধারণ মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়লেও সেগুলো আর ফিরে পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
বাবা, চার বছর হয়ে গেল তুমি নেই। তবু তোমাকে মনে করার জন্য কোনো বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না। কোনো কথা মনে পড়লে, কোনো কষ্ট এলে কিংবা হঠাৎ কোনো স্মৃতি সামনে এসে দাঁড়ালে তোমাকে খুঁজি। তারপর মনে পড়ে, তোমাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না।
শুধু একটা আফসোস রয়ে গেল—আরেকবার যদি তোমাকে বাবা বলে ডাকতে পারতাম, আরেকবার যদি তোমার কণ্ঠটা শুনতে পেতাম!
বাবা, তোমার জন্য আমার দোয়া কখনো থামবে না। আল্লাহ যেন তোমাকে মাফ করে দেন। তোমার কবরটা যেন শান্তির হয়, আলোয় ভরে থাকে। তোমাকে যেন জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
ভীষণ মনে পড়ে তোমাকে, বাবা। চার বছর পরেও তোমাকে হারানোর কষ্টটা আগের মতোই রয়ে গেছে।
আল্লাহ তোমাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।