বাবার শেষ ফেরা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
স্মৃতিচারণ | ২৪ অক্টোবর ২০২৬
২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনে নিচে নেমে গিয়েছিলাম। বাবা ফিরেছেন। কিন্তু যে বাবাকে কয়েক দিন আগে সুস্থ করে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেদিন তিনি ফিরেছিলেন নিথর দেহে।
অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর পর বাবার মুখের দিকে তাকালাম। কী শান্ত দেখাচ্ছিল তাঁকে! মনে হচ্ছিল, অনেক ক্লান্তির পর ঘুমিয়ে পড়েছেন। এই বুঝি চোখ খুলে আমাদের দিকে তাকাবেন, কিছু একটা বলবেন।
কিন্তু বাবা আর চোখ খুললেন না।
এর মাত্র চার দিন আগেও বাবার কপালে হাত রেখে জ্বর দেখেছিলাম। সেই কয়েক দিনের মধ্যে কতবার যে মনে হয়েছে, এবার হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবেন। একবার ভালো হলে আবার অসুস্থ হয়েছেন, আমরা হাসপাতাল বদলেছি, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি, আইসিইউর শয্যার জন্য ছোটাছুটি করেছি। প্রতিবারই মনে হয়েছে, হয়তো এবার বিপদ কেটে যাবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবাকে আর ফেরাতে পারিনি।
২০২২ সালের ২২ অক্টোবর হঠাৎ খবর পেলাম, বাবার ভীষণ জ্বর। সন্ধ্যায় তাঁকে দেখতে গেলাম। বাসার গেস্টরুমের ছোট খাটটিতে শুয়ে ছিলেন। পাশে বসে কপালে হাত রাখতেই শরীরের তাপ টের পেলাম। হাত-পায়েও ব্যথা।
বাবার আগে থেকেই স্ট্রোকের সমস্যা ছিল। রাত আটটার দিকে প্যাথলজির লোক এসে রক্তের নমুনা নিয়ে গেলেন। রাত দশটার দিকে বাবা উঠে বসলেন। আমাকে দেখে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিলেন।
রাত দশটা দশের দিকে এলাকার ডাক্তার এলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু বাবা কিছুতেই যেতে রাজি হলেন না। শেষ পর্যন্ত সকালে স্যালাইন দেওয়ার কথা বলে ডাক্তার চলে গেলেন।
রাত এগারোটার দিকে নিজের বাসায় ফিরলাম। কিন্তু দুশ্চিন্তায় সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। ফজরের নামাজের পর চোখ লেগে এসেছিল। ঘুম ভাঙতেই বাবার বাসায় ছুটলাম।
গিয়ে দেখি, বাবার হাতে স্যালাইন চলছে। জ্বরের ঘোরে আবোল-তাবোল বলছেন। মাঝে মাঝে হাত টেনে স্যালাইন খুলে ফেলছেন। এর মধ্যে রিপোর্টও এসে গেছে। ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। সেই সঙ্গে বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাকের খবরও পেলাম।
দুপুর দুইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলো। বাবাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে চারজন মিলে সাততলা থেকে নিচে নামালেন।
সেদিন বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় কে জানত, এটাই হবে তাঁর বাড়ি থেকে শেষবারের মতো বেরিয়ে যাওয়া!
প্রথমে কাছের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দ্রুত পাওয়া যাচ্ছিল না। শুক্রবার হওয়ায় হার্টের চিকিৎসকও পাওয়া গেল না। বাবার অবস্থা বিবেচনা করে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
এরপর শুরু হলো আইসিইউ খোঁজার পালা। একের পর এক হাসপাতালে যোগাযোগ করেও শয্যা পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মগবাজারের কাছে পরিচিত এক বন্ধুর সহযোগিতায় একটি হাসপাতালে বাবাকে আইসিইউতে ভর্তি করাতে পারলাম।
চিকিৎসা শুরু হলো। পরদিন সকালে জানানো হলো, বাবার প্লাটিলেট কমে গেছে। রক্তের প্লাজমা দিতে হবে। ছোট ভাই ডোনার নিয়ে ছোটাছুটি করল। চিকিৎসার পর বাবা কিছুটা সুস্থ বোধ করায় তাঁকে কেবিনে নেওয়া হলো।
আমরা আবার আশায় বুক বাঁধলাম।
কিন্তু জ্বর কমছিল না। প্লাটিলেটও বারবার কমে যাচ্ছিল। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ওই হাসপাতালেই তাঁকে রাখা হলো। পরদিন পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, বাসার কাছের হাসপাতালে নিয়ে বাকি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাব। সেই অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর দুপুরের দিকে বাবাকে খিদমা হাসপাতালে ভর্তি করলাম।
সেদিন তিনি কিছুটা স্বাভাবিক ছিলেন। কিন্তু রাতে আবার জ্বর এল। পরদিন সকালেও অবস্থার উন্নতি হলো না।
২৬ অক্টোবর দুপুরে বাবার পাশে বসেছিলাম। তিনি বললেন, মাথাটা একটু টিপে দিতে। আমি তাঁর মাথা টিপে দিচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর বাবা বললেন, “তুই ডান হাত দিয়ে মাথা টিপ। তোর বাঁ হাতে তো ব্যথা।”
আমার নিজেরও আগে হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। সে কারণে বাঁ হাতে ভারী কাজ করতে পারতাম না। নিজের শরীর নিয়ে এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও বাবা আমার অসুবিধার কথা মনে রেখেছিলেন।
আমি তখনো জানতাম না, বাবার পাশে বসে কাটানো এই সাধারণ মুহূর্তটাই একদিন এত মূল্যবান হয়ে উঠবে।
কিছুক্ষণ পর ছোট ভাই হাসপাতালে এল। আমি ছোট মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে বের হলাম। তার এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। মেয়েকে নিয়ে বাসায় ঢুকতেই ছোট ভাইয়ের ফোন পেলাম। বাবার জ্বর বেড়েছে, পেটও ফুলে গেছে।
দ্রুত হাসপাতালে ছুটলাম। গিয়ে দেখি, বাবা শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছেন। ডাক্তার এসে জানালেন, তাঁকে দ্রুত আইসিইউতে নিতে হবে।
আবার অ্যাম্বুলেন্সে করে মুগদা হাসপাতালে গেলাম। সেখানে আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি ছিল না। একটি সংরক্ষিত শয্যার ব্যবস্থা হতে পারে, তবে ওপর মহলের ফোন লাগবে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা ছোটাছুটির পর আইসিইউর সাত নম্বর শয্যাটি পাওয়া গেল।
বাবার চিকিৎসা শুরু হলো। কিন্তু তাঁর শ্বাসকষ্ট আরও বাড়তে লাগল।
ডাক্তার জানালেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। শরীরের একাধিক অঙ্গ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে। তাঁরা চেষ্টা করছেন, তবে শেষ পর্যন্ত কী হবে, নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।
সেদিন আইসিইউতে বাবার পাশে থাকাকালে তিনি বারবার আমার হাত শক্ত করে ধরেছিলেন। একটু পরপর পানি চাইছিলেন। তাঁর হাতের সেই স্পর্শ এখনো মনে পড়ে।
রাত একটা নাগাদ নিজের শরীর খারাপ লাগায় বাসায় ফিরতে বাধ্য হলাম।
পরদিন সকালে ছোট ভাই ফোন করে জানাল, বাবার অবস্থা ভালো নয়। ডাক্তাররা লাইফ সাপোর্ট দিতে চান। আমি সম্মতি দিলাম। আর কোনো উপায় ছিল না।
সকাল আটটার দিকে হাসপাতালে গিয়ে আইসিইউর ভেতরে বাবাকে দেখলাম। শরীরটা প্রায় নিথর। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আর সহ্য করতে পারলাম না। কিন্তু বাসায় ফিরতে হলো। ছোট মেয়েকে পরীক্ষার হলে নিয়ে যেতে হবে।
ভাবছিলাম, মেয়েকে বাসায় দিয়ে বিকেলে আবার হাসপাতালে যাব।
সন্ধ্যার কিছু আগে ছোট ভাই ফোন করে বলল, আমার হাসপাতালে যাওয়ার চেয়ে বাবার বাসায় যাওয়া বেশি জরুরি।
কথাটা শুনে আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে জানানো হলো, বাবাকে বাসায় নিয়ে আসা হচ্ছে। আমাকে পরিবারের সবাইকে সামলাতে হবে।
সেদিন বুঝেছিলাম, বাবা আর ফিরবেন না।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনলাম। নিচে নেমে বাবাকে দেখলাম। চোখেমুখে কোনো অস্থিরতা নেই। শান্ত হয়ে শুয়ে আছেন।
বাবার একটা শারীরিক সমস্যা ছিল—ঠান্ডায় তাঁর অ্যালার্জি হতো। তিনি মোটেই ঠান্ডা সহ্য করতে পারতেন না। জীবিত অবস্থায় ঠান্ডা লাগলে তাঁর কষ্ট হতো, তাই তাঁকে ঠান্ডা থেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতাম।
অথচ শেষ বিদায়ে সেই বাবাকেই থাকতে হলো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে। তখন আর কেউ তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল না, “বাবা, ঠান্ডা লাগছে?”
বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কত কথা মনে পড়ছিল, অথচ তাঁকে বলার আর কোনো সুযোগ ছিল না। যে মানুষটি নিজের কষ্টের মধ্যেও আমার বাঁ হাতের ব্যথার কথা মনে রেখেছিলেন, তাঁর শেষ মুহূর্তে আমি আর কিছুই করতে পারিনি।
বাবা, তোমাকে তো সুস্থ করে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার কথা ছিল। কত কিছুই না ভেবেছিলাম! হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরবে, আবার তোমার সঙ্গে কথা হবে, তোমার পাশে বসব। অথচ শেষ পর্যন্ত তোমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে হলো এভাবে।
তুমি ফিরেছিলে, অথচ তোমাকে আর ফিরে পাইনি।
আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন, তোমার কবরকে প্রশস্ত ও নূরে ভরে দিন। তোমাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।
আমিন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।