বাবার নম্বরটি আজও ফোনে আছে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
শোক ও স্মৃতির ছোটগল্প
১৯ অক্টোবর ২০২৬
বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে। তাঁর মোবাইল নম্বরটি আর চালু নেই। তবু নতুন ফোন কেনার পর আরিফ সবার আগে যে নম্বরটি সংরক্ষণ করেছিল, সেটি বাবার।
নাম লিখেছিল শুধু—‘বাবা’।
ফোন বদলানোর সময় অন্য নম্বরগুলো পুরোনো ফোন থেকে তুলে এনেছিল আরিফ। পরিচিত মানুষদের নম্বর একে একে সংরক্ষণ করতে করতে রাত হয়ে গিয়েছিল। বাবার নম্বরটি সে নিজে হাতে লিখেছিল। শেষের চারটি সংখ্যা টাইপ করতে তার একবারও ভুল হয়নি।
নম্বরটি তার মুখস্থ।
বাবা বেঁচে থাকতে এই নম্বরেই ফোন করতেন। কখনো বাজার থেকে ফেরার পথে, কখনো অফিস ছুটির পর। বেশির ভাগ দিন কথাবার্তা বেশি হতো না।
— কোথায় আছিস?
— বাসায় ফিরছি।
— আচ্ছা, সাবধানে আসিস।
কখনো আরিফ ফোন ধরতে দেরি করলে বাবা আবার ফোন করতেন না। পরে কথা হলে শুধু জিজ্ঞেস করতেন, ব্যস্ত ছিল কি না। আরিফ তখন এসবকে স্বাভাবিক বলেই জানত। বাবার ফোন আসবে, সে ধরবে, দু-চার কথা হবে—এ নিয়ে আলাদা করে ভাবার কিছু ছিল না।
এখন ফোনের পর্দায় বাবার নামটি দেখা যায়, কিন্তু সেই নম্বরে কল করলে সংযোগ পাওয়া যায় না।
প্রথম দিকে আরিফ নম্বরটি বন্ধ হওয়ার খবর জানতে চেয়েছিল। পরে বুঝেছিল, নম্বরটি আর ফিরে পাওয়ার কোনো কারণ নেই। সিমটি অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তবু পরিচিতির তালিকা থেকে নামটি সরানোর কথা তার মনে হয়নি।
একদিন বিকেলে বন্ধু রাকিব তার ফোন নিয়ে একটি নম্বর খুঁজছিল। আরিফ তখন পাশেই বসে কাজ করছিল।
হঠাৎ রাকিব জিজ্ঞেস করল,
— ‘বাবা’ নামে এই নম্বরটা কার?
— আমার বাবার।
— উনি কি এখনো এই নম্বর ব্যবহার করেন?
আরিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— না। বাবা মারা গেছেন।
রাকিব ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নম্বর খোঁজার কাজ শেষ করে ফোনটি ফিরিয়ে দিল। আর কোনো প্রশ্ন করল না।
সেদিন রাতে আরিফ অনেকক্ষণ ফোন হাতে বসে ছিল। রাকিবের প্রশ্নটা তার মাথায় ঘুরছিল না ঠিক, তবে পরিচিতির তালিকায় বাবার নামটি চোখে পড়লেই সে থেমে যাচ্ছিল।
অন্য অনেক পুরোনো নম্বর সে মুছে দিয়েছে। যাদের সঙ্গে একসময় প্রতিদিন কথা হতো, এখন আর যোগাযোগ নেই, তাদের কারও কারও নামও তালিকায় নেই। ফোনের জায়গা খালি করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় নম্বরগুলো সরিয়ে ফেলেছিল সে।
শুধু বাবার নম্বরটি রয়ে গেছে।
কেন রেখেছে, তার কোনো উত্তর আরিফ কখনো খুঁজে দেখেনি।
রাতে ঘুমানোর আগে সে পরিচিতির তালিকা খুলল। ‘বাবা’ নামটি খুঁজে বের করে সম্পাদনার পাতায় ঢুকল। নামের নিচে নম্বরটি লেখা। প্রতিটি অঙ্ক ঠিক আছে কি না, একবার দেখে নিল।
তারপর আবার নামের দিকে তাকাল।
বাবার নম্বরটি সে বহুবার নতুন ফোনে লিখেছে। প্রতিবারই নামের ঘরে একই শব্দ বসিয়েছে। ‘আব্বা’ নয়, পুরো নাম নয়, অন্য কোনো পরিচয়ও নয়। শুধু ‘বাবা’।
নম্বরটির কোনো পরিবর্তন দরকার ছিল না। নামের বানানও ঠিক ছিল।
আরিফ সম্পাদনার পাতা থেকে বেরিয়ে যেতে পারত। কিন্তু সে তা করল না। কোনো অঙ্ক না বদলে, কোনো অক্ষর না সরিয়ে, নিচের ‘সংরক্ষণ’ বোতামটি চাপল।
পর্দায় লেখা উঠল—
‘পরিচিতি হালনাগাদ হয়েছে।’
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।