শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
পর্ব–৬ : একা বাবার সংসার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
"নিজের কষ্ট লুকিয়ে সন্তানকে হাসানোই হয়তো বাবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।"
বিচ্ছেদের পর প্রথম সকালটা অন্যরকম নীরব।
অ্যালার্ম বাজল ঠিক ছ’টায়। জানালার বাইরে শালিক ডাকছে, রাস্তায় রিকশার টুংটাং। সব আগের মতো। শুধু ঘরের ভেতরটা ফাঁকা। নিশির চুড়ির শব্দ নেই, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গুনগুন নেই।
অভিক চোখ খুলেই টের পেল—আজ থেকে অ্যালার্মটা শুধু তার একার জন্য বাজে।
রান্নাঘরে ঢুকে সে থমকে দাঁড়াল। গ্যাসের চুলা, ফ্রিজ, মশলার কৌটা—সব চেনা। তবু কোনটা আগে ধরবে বুঝতে পারছে না। আগে এই সময়টা নিশির ছিল। অভিক শুধু চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে পেপার মেলে ধরত।
আজ কেটলিতে পানি বসাতে গিয়ে মনে হলো, সংসার মানে আসলে হাজারটা ছোট কাজের সমষ্টি। যে কাজগুলো চোখে পড়ে না, যতদিন অন্য কেউ করে দেয়।
“বাবা, তুমি এখানে?” মেঘলা দরজায় দাঁড়িয়ে। চোখে ঘুম লেগে আছে, চুল এলোমেলো।
অভিক হাসার চেষ্টা করল। “ভাবছি আজ আমি নাস্তা বানাই। চলবে?”
মেঘলা এগিয়ে এল। ওড়নাটা ঠিক করতে করতে বলল, “আমি আলু কাটি?”
এইটুকু মেয়ে কবে এত বড় হয়ে গেল? অভিকের গলা ধরে এল। “আয়।”
ডিম ভাজতে গিয়ে পুড়ে গেল। টোস্ট কালো হয়ে গেল একপাশে। প্লেটে সাজিয়ে টেবিলে রাখতেই মিশি নাক কুঁচকাল। “এটা কী? মা তো এমন বানায় না।”
ঘরে এক মুহূর্তের জন্য বাতাস বন্ধ হয়ে গেল।
অভিক চামচটা নামিয়ে রাখল। বুকের ভেতর কেউ যেন হাতুড়ি মারল। তবু ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, “মা তো এক্সপার্ট। বাবা নতুন শিখছে। কাল আরও ভালো হবে, দেখিস।”
মিশি ভাতের সাথে ডিম মেখে মুখে দিল। “আচ্ছা। কাল কিন্তু পুড়াবে না।”
অভিক মাথা নাড়ল। চোখের কোণটা জ্বালা করছে। সে তাড়াতাড়ি পানি খাওয়ার ভান করল।
অফিসে গিয়েও মন টেকে না। প্রতি আধঘণ্টায় ঘড়ি দেখে। মেয়েরা স্কুল থেকে ফিরল? দরজা ঠিকমতো লাগিয়েছে তো? মেঘলা কি মিশির টিফিন খেয়াল করেছে?
কলিগ রিফাত ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলল, “কিরে, আজ এত অন্যমনস্ক?”
“না, কিছু না। মাথা ধরেছে একটু।”
অফিস শেষে বাজার, তারপর বাসা। ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে যখন ঢোকে, মিশি দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। “বাবা, তুমি এত দেরি করো কেন? আমি ভয় পাই।”
এই ‘ভয় পাই’ শব্দটা সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষে মুছে দেয়। আবার নতুন ভয় ঢুকিয়ে দেয়—এই ভয়টা দূর করার দায়িত্ব এখন শুধু তার।
রাতে তিনজন মিলে পড়তে বসে। মিশি অঙ্কে পাঁচবার ভুল করে। ছয়বারের সময় খাতা ছুড়ে ফেলে। “আমি পারব না! মা থাকলে পারতাম!”
অভিক ধমক দেয় না। চেয়ার টেনে পাশে বসে। “আয়, আবার করি। আমি আছি তো।”
মেঘলা তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ বলে, “বাবা, তুমি ঘুমাও না, তাই না?”
অভিক কলম থামায়। “কেন রে মা?”
“তোমার চোখ লাল। তুমি রাতে বারান্দায় হাঁটো। আমি দেখেছি।”
অভিক উত্তর দেয় না। শুধু মেয়ের মাথায় হাত রাখে। “তুই ঘুমা। কাল স্কুল আছে।”
দিনগুলো একটা যুদ্ধ।
সকালে নাস্তা, টিফিন, স্কুলে নামিয়ে দেওয়া। অফিসে বসে মিটিংয়ের ফাঁকে ভাবে, মিশি টিফিন খেয়েছে তো? বিকেলে ফিরে বাজার, রান্না, কাপড় মেলা, মেঘলার প্রজেক্ট, মিশির আঁকার খাতা—লিস্ট শেষ হয় না।
ভুল হয়। মিশির রং পেন্সিল কিনতে ভুলে যায়। মেঘলার সায়েন্স প্রজেক্টের জন্য ক্লে আনতে মনে থাকে না শেষ রাতে। তখন নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছে করে।
তবু সে থামে না। কারণ এখন থামার উপায় নেই। এখন সে একা বাবা না, সে মা-ও।
একদিন লোডশেডিং। তিনজন বারান্দায় বসে। বাইরে ঝিঁঝি ডাকছে।
মিশি হঠাৎ বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। “বাবা, আমরা কি আর কখনো চারজন হবো না?”
প্রশ্নটা ছুরির মতো বুকের ভেতর ঢুকে যায়। অভিক আকাশের দিকে তাকায়। তারা নেই। “সব প্রশ্নের উত্তর এখনই হয় না মা। কিছু উত্তর সময় দেয়।”
মিশি বোঝে না। মেঘলা বোঝে। সে ছোট বোনের হাতটা শক্ত করে ধরে। বোনকে সাহস দেয়, নিজেকেও।
ধীরে ধীরে ঘরটা একটা নতুন নিয়মে চলতে শেখে।
শনিবার সকাল সাফ-সুতরো। তিনজন মিলে ঘর মোছে, জানালা মোছে। মিশি ফার্নিচার মুছতে গিয়ে নিজেই ধুলো মেখে ভূত হয়। হাসি ফোটে।
শুক্রবার বিকেলে পার্ক। আইসক্রিম। মেঘলা ছবি তোলে বাবার ফোনে। রাতে অভিক গল্প পড়
“ঠাকুরমার ঝুলি”। মিশি ঘুমিয়ে পড়ে বাবার বুকের ওপর।
হাসি ফিরেছে। কিন্তু সেই হাসির ঠিক মাঝখানে একটা শূন্য চেয়ার। কেউ সেটা নিয়ে কথা বলে না। কিন্তু সবাই জানে, চেয়ারটা কার।
রাতে মেয়েরা ঘুমিয়ে গেলে অভিক বারান্দায় আসে।
আজ আকাশে চাঁদ আছে। অর্ধেক ভাঙা। তার সংসারের মতো।
সে বুঝে গেছে, মানুষ ভাঙা নিয়েও বাঁচতে পারে। নতুন করে হাঁটতে শেখে। কিন্তু আগের মতো দৌড়াতে পারে না। কোথাও একটা খোঁড়া রয়ে যায়।
ফোনটা ভাইব্রেট করল।
অচেনা নম্বর। মেসেজ:
“অভিক ভাই, আমি সায়ান। নিশির ব্যাপারে আপনার সাথে কথা ছিল। আপনি চাইলে দেখা করতে পারি।”
স্ক্রিনের আলোয় অভিকের মুখটা সাদা হয়ে গেল।
হাত কাঁপছে। এই নামটা সে রাতের পর রাত গিলেছে। ঘৃণা করেছে। আজ সেই নামটাই স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে।
কী বলতে চায় ছেলেটা? ক্ষমা চাইবে? নাকি নতুন কোনো বোমা?
অন্যদিকে শহরের আরেক প্রান্তে নিশিও জেগে।
বিচ্ছেদের পর তার জীবনটাও সহজ না। একা ঘর, একা রাত, আর একটা প্রশ্ন—“আমি যা করেছি, তার দাম কি শুধু আমি দিচ্ছি? নাকি আমার মেয়েরাও?”
ফোনটা হাতে নিয়ে অভিকের নম্বরে ডায়াল করতে গিয়েও থেমে যায়। কী বলবে? “কেমন আছো?” শব্দটা এখন বড্ড নিষ্ঠুর।
অভিক বারান্দার রেলিং চেপে ধরে।
সে ভেবেছিল বিচ্ছেদটাই শেষ। এখন বুঝছে, বিচ্ছেদের পর শুরু হয় আসল যুদ্ধ—একা বাবা হওয়ার যুদ্ধ, মেয়েদের চোখের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার যুদ্ধ, আর নিজেকে রোজ আয়নায় দেখার যুদ্ধ।
আর এখন, এই মেসেজটা… এটা কীসের শুরু?
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।